তাহসিফের বন্ধু দীপ ৪ দিনের রিমান্ডে

ছবি: আগামীর সময়
বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় উত্তরখান থানায় করা হত্যা মামলায় ব্যবসায়িক অংশীদার ও বন্ধু শাহরিয়ার রেজা দীপের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
আজ শনিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. হাসিব উল্লাহ পিয়াস শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।
এদিন আসামি দীপকে আদালতে হাজির করা হয়। এরপর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গাজীপুরের টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন আসামিকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন।
ওই আবেদনে বলা হয়, প্রাথমিক তদন্তে সন্দেহভাজন আসামি আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে রাখা জরুরি। আসামি জামিনে মুক্তি পেলে পালিয়ে তদন্তে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে মূল রহস্য উদঘাটনসহ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আসামিদের গ্রেপ্তার করাসহ পাঁচ কারণ দেখিয়ে সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়।
এসব কারণে বলা হয়, মামলার ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটন; অজ্ঞাতনামা অপর আসামিদের গ্রেপ্তার ও শনাক্ত; আলামত উদ্ধার; মৃত তাহসিফ সাউরির ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধার ও হত্যাকাণ্ডের স্থান নির্ধারণ করার জন্য রিমান্ড প্রয়োজন।
শুনানির সময় বিকাল ৩টা ২৫ মিনিটের দিকে দীপকে এজলাসে তোলা হয়। এসময় মাথায় হেলমেট, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হাতকড়া ছিল। এরপর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুল হক দিদার রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি বলেছেন, ফ্যাসিস্ট হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার মুহুর্তের ভিডিও এই ভিকটিম প্রকাশ করেছিলেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাকে হত্যা করা হয়েছে কি না সেটা উদঘাটন প্রয়োজন। এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে আসামির সর্বোচ্চ রিমান্ড প্রার্থনা করছি।
আসামিপক্ষে আইনজীবী মনিরুল ইসলাম ও আইনজীবী মুতাসিম বিল্লাহ রিমান্ড বাতিল চেয়ে শুনানি করেন। তারা শুনানিতে জানান, দীপের সঙ্গে নিহতের ছয় বছরের সম্পর্ক। ইতোমধ্যে দুই দিন ধরে পুলিশের হেফাজতে আছেন তিনি। মামলার রহস্য উদঘাটনের জন্য তাকে রিমান্ড নেওয়ার প্রয়োজন হলে দুইদিন নেওয়া হোক। তবে সেটা সতর্কতার সঙ্গে যেন হয়। আমরা মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার। উভয় পক্ষের শুনানি নিয়ে আদালত তার চার দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন। তবে আসামিপক্ষে জামিন আবেদন করা হয়নি। পরে পুলিশ পাহারায় তাকে আদালত থেকে বের হয়। এসময় তার উদ্দেশ্যে এক স্বজন চিৎকার দিতে বললেন, স্ট্রং। তখন দীপ জবাবে বললেন, ফুললি স্ট্রং।
গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় বাসা থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হন তাহসিফ সাউরি। পরদিন বুধবার তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয় তার মরদেহ।
এরপর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে মরদেহ নিতে এসে তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিম বললেন, ‘তার ছেলে আত্মহত্যা করার মতো মানুষ না। তাহসিফকে হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলা হয়েছে।’
এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাহসিফ সাউরির বন্ধু শাহরিয়ার রেজা দীপকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। পিবিআইয়ের পরিদর্শক সৈয়দ সাজেদুর রহমান জানিয়েছিলেন, তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় নৌপুলিশের পাশাপাশি পিবিআইও ছায়া তদন্ত করছে। তদন্তের অংশ হিসেবে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়।
তবে জিজ্ঞাসাবাদে দীপ একেক সময় একেক কথা বলছেন বলে জানিয়েছেন তদন্তকারীরা। দীপ কখনো বলছেন, ‘আমাকে বাসার সামনে রেখে তাহসিফ বাসায় চলে গেছে, রাত ১২টার দিকে হাউজ বিল্ডিং এলাকা থেকে তারা আলাদা হয়ে যান।’ পরে আবার বলেছেন, ‘টঙ্গী মাজার বস্তি এলাকা থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যান।’ এরপর বলেছেন, ‘একদল লোকের ধাওয়া খেয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিল তাহসিফ।’
পিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান বলেছেন, ‘দীপের দেওয়া সব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সে বলছে, পুলিশের পোশাক পরা কেউ তাদের ধাওয়া দিয়েছিল। কারা ধাওয়া দিয়েছিল, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তারা মাদকাসক্ত ছিল কি না, তা ময়নাতদন্তের পর জানা যাবে। অনেক কিছুই সে বলেছে, তবে সবকিছু যাচাই করা হচ্ছে।’
এ ঘটনায় শুক্রবার তাহসিফের বাবা এ কে এম এনায়েতুল করিম মামলা করেন। পরে সন্দিগ্ধ হিসেবে দীপকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
শেখ হাসিনার দেশ ছেড়ে বিমানে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি ছিল বিশ্ব জুড়ে আলোচিত। তবে ওই ঘটনার কেবল একটি ভিডিও পাওয়া যায়, যেখানে তাকে একটি হেলিকপ্টারে চড়তে দেখা যাচ্ছিল। ওই হেলিকপ্টারে করে কুর্মিটোলায় যাওয়ার পর সামরিক বাহিনীর একটি বিমানে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাকে।
তখন কেউ কেউ দাবি করেছিলেন, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফই সেই ভিডিওটি করেছিলেন। আবার তিনি করেননি, তবে তিনি প্রকাশ করেন, এমন দাবিও করেন কেউ কেউ।
তবে এ বছরের ২১ জুলাই এক পডকাস্টে অংশ নিয়ে তাহসিফ এসবকে অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, ‘আমি জানি না, তাদের উদ্দেশ্য কী? প্রতিবেদনে ক্লিয়ারলি লিখেছে যে, আমি ভিডিওটা ছড়িয়েছি। আমি যে শুট করেছি, এটাও কিন্তু তারা বলেনি। বলেছে, যে … ভিডিওটি করেছে এবং আমি ভিডিওটি নাকি ছড়িয়ে দিয়েছি। ‘
‘আমি যদি ভিডিওটা করেও থাকি বা ছড়িয়েও থাকি, হোয়াট ইজ দা প্রুফ দে হ্যাভিং—আমি এটা জিজ্ঞেস করতে চাই। আর এটাও হতে পারে যে, এজন্যই আমি আজকে হয়তো এয়ারফোর্সে নেই।’
শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বিমানবাহিনী থেকে অব্যাহতি নিতে হয়েছে কি না- এমন প্রশ্নে তিনি বলেছিলেন, ‘হতে পারে। কারণ যেই ঘটনাগুলো ওই সময় ঘটেছিল, আমি সবকিছু বলব না বা আমার কিছু অপারগতা আছে। আমার মনে হয় যে এই এলিগেশনের (অভিযোগের) কারণে তারা এই জিনিসটা করেছে।’
তাহসিফ দাবি করেছিলেন, পরবর্তীকালে হেনস্তা করা হবে না এই শর্তে অব্যাহতিপত্র দিয়েছিলেন তিনি। তবে চাকরি ছাড়ার পর সামাজিক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে তাকে।
বুধবার তার লাশ উদ্ধারের পর তাহসিফের পরিবারের সদস্যরাও দাবি করেছেন, চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পর থেকে নানামুখী চাপের মধ্যে ছিলেন এই যুবক। তাকে অনুসরণ করা হতো।




