হাইকোর্টে তদন্ত প্রতিবেদন
কারাগারে নিরপরাধ আলমাস, দণ্ডিত আলমাছ কানাডায়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘নামে নামে যমে টানে’— সমাজে বহুল প্রচলিত এ বচন বাস্তবতা হয়ে এসেছে ঢাকার দোহার উপজেলার কুসুমহাটি ইউনিয়ন পরিষদের সুন্দরীপাড়া গ্রামের আলমাসের জীবনে। কেবল নামের মিল থাকায় দুই যুগ আগের একটি অস্ত্র মামলায় গত এক বছর ধরে কারাগারে আছেন তিনি।
মামলায় দণ্ডিত প্রকৃত আসামির নামও মো. আলমাছ। ঘটনার পরপরই তিনি পাড়ি জমান কানাডায়। তার স্থায়ী ঠিকানা দোহার উপজেলার নয়াবাড়ি ইউনিয়নের দক্ষিণ বাহ্রা ডাকঘরের অধীন পূর্ব ধোয়াইর গ্রামে। হাইকোর্টে জমা হওয়া এক তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে এমন তথ্য।
নামের মিলে প্রকৃত অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিবর্তে কারাগারে থাকা আলমাসকে গ্রেপ্তার করা হলে উচ্চ আদালতে রিট করেন তিনি। রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত ৬ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট রুল জারি করে কারাগারে থাকা আলমাস ও দণ্ডিত ব্যক্তির পরিচয় যাচাইয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন।
ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে তার তত্ত্বাবধানে একজন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে তদন্ত পরিচালনা করতে বলা হয়। আদেশ পাওয়ার তারিখ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়। সেই আদেশ প্রতিপালন করে আজ বৃহস্পতিবার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।
ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহফুজুর রহমান দাখিল করা প্রতিবেদনে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়— গ্রেপ্তার মো. আলমাস এবং মিরপুর থানায় ২০০২ সালের ১০ এপ্রিল দায়ের হওয়া ৩২ নম্বর মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত মো. আলমাছ সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই ব্যক্তি।
এতে বলা হয়, গ্রেপ্তার মো. আলমাসের বাবা শেখ খলিল ও মাতা রশনারা বেগম। তিনি মিরপুর থানায় ২০০২ সালের ১০ এপ্রিল দায়ের হওয়া ৩২ নম্বর মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি নন। আর পলাতক মো. আলমাছের বাবা পিতা খলিলুর রহমান বা মো. আবুল খায়ের খলিল ও মাতা সালমা আক্তার। তিনি মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি এবং বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করছেন।
এতে আরো বলা হয়, ২০০২ সালে সাজাপ্রাপ্ত মো. আলমাছের বয়স ছিলো ২৪। সেই হিসাবে ২০২৬ সালে তার বয়স হওয়ার কথা প্রায় ৪৮। অথচ গ্রেপ্তার মো. আলমাসের জন্ম তারিখ ১০ ডিসেম্বর ১৯৮৫। সেই হিসাবে তার বর্তমান বয়স ৪১ বছর। অর্থাৎ ২০০২ সালে তিনি ছিলেন ১৭ বছরের। বয়সের ব্যবধান প্রায় ৭ বছরের। এটি উপেক্ষা করার মতো নয়।
ভুল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পেছনে তিনটি কারণ উল্লেখ করা হয় তদন্ত প্রতিবেদনে। এক. গ্রেপ্তার মো. আলমাস সপরিবারে ২০০৭ সালের আগে দক্ষিণ বাহ্রা ডাকঘরের অধীন বাহ্রা গ্রামে বসবাস করতেন। অপরদিকে প্রকৃত আসামির গ্রাম পূর্ব ধোয়াইরও একই ডাকঘরের অধীন। ফলে ডাকঘরের নামে পরিচয় দেওয়ার প্রচলনের কারণে দুজনের ঠিকানা এক হয়ে যায়।
দুই. উভয়ের পিতার নামে অনেকাংশে মিল ছিলো। প্রকৃত আসামির পিতার নাম খলিলুর রহমান বা খলিল আহম্মেদ বা মো. আবুল খায়ের খলিল। আর গ্রেপ্তার মো. আলমাসের বাবার নাম শেখ খলিল। নামের এই সাদৃশ্য পরিচয় নির্ধারণে বিভ্রান্তি বাড়িয়েছে।
তিন. ২০০২ সালে দায়ের করা অস্ত্র মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মো. আলমাছের ঠিকানা ভুলক্রমে ‘পূর্ব ধোয়াইর’ এর স্থলে ‘দক্ষিণ বাহ্রা’ লেখা হয়, যা পরবর্তীতে নথিতেও বহাল থাকে। মামলার রায় শেষে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাতেও আসামি মো. আলমাছের ঠিকানা পূর্ব ধোয়াইরের পরিবর্তে দক্ষিণ বাহ্রা হয়ে যায়।
রিট আবেদনটি শুনানি হয় বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমেদ ভূঞার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে। শুনানি শেষে আদালত আগামী রবিবার আদেশের জন্য দিন ধার্য করেন। সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মহিউদ্দিন মো. হানিফ বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
মামলার নথি থেকে জানা যায়, মো. আলমাছ (২৪) ও মো. নাজমুল আলম মামুনের (২২) বিরুদ্ধে মিরপুর থানায় ২০০২ সালের ১০ এপ্রিল অস্ত্র আইনে মামলা করে পুলিশ। ওই মামলায় ২০০৪ সালের ১৯ জুন ঢাকা মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১১ রায় দেন। রায়ে মো. আলমাছকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অপর আসামি নাজমুল খালাস পানরায় ঘোষণার সময় আলমাছ পলাতক ছিলেন। তার নামে সাজা পরোয়ানা ইস্যু করা হয়। ২০২৪ সালের ২০ মার্চের পরোয়ানার পরিপ্রেক্ষিতে আলমাসকে সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে গত বছরের ৫ নভেম্বর আদালতে হাজির করে পুলিশ। আদালত তাকে কারাগারে পাঠান। সেই থেকে কারাগারে আছেন তিনি।



