বিভাগীয় শহরে হাইকোর্ট বেঞ্চ এখনো স্বপ্ন
- ঢাকাকেন্দ্রিক বিচারব্যবস্থায় ভোগান্তিতে মানুষ আছে আর্থিক চাপ
- সংবিধানে অস্থায়ী বা সার্কিট বেঞ্চ স্থাপনের অনুমোদন আছে
- সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবে স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব
- ঢাকাকেন্দ্রিক আইনজীবীদের আগ্রহ কম

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
হাবিবুর রহমানের (৫০) বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায়। একটি হত্যা মামলার আসামি তিনি। গ্রেপ্তার এড়াতে আইনি সুরক্ষা পেতে সম্প্রতি ছুটে আসেন হাইকোর্টে। কিন্তু আগাম জামিনের জন্য এসে ঢাকায় পা রাখার পর থেকেই যেন শুরু হয়েছে আরেক দফা ভোগান্তি। তার সঙ্গে এসেছেন আরও ১১৪ জন আসামি। তাদের কারও হাতে মামলার নথি, কারও চোখে গ্রেপ্তারের আতঙ্ক, কারও মনে পরিবারের কাছে নিরাপদে ফিরে যাওয়ার আকুতি।
হাবিবুর রহমান জানালেন, তাদের মধ্যে দুজন আগের দিনই ঢাকায় এসেছেন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলতে। রাজধানীর ফকিরাপুল এলাকার একটি সাদামাটা হোটেলে রাত্রিযাপন করেছেন তারা। অন্য সবাই তিনটি বাস ভাড়া করে নাসিরনগর থেকে রওনা হয়েছেন ভোরবেলায়। সকাল সাড়ে ১০টায় আদালতের সামনে হাজির হন তারা। উদ্দেশ্য একটাই— আগাম জামিনের মাধ্যমে আইনি সুরক্ষা পাওয়া।
কিন্তু আদালতে হাজির হওয়ার আগেই তাদের লড়তে হচ্ছে অন্য এক বাস্তবতার সঙ্গে। ঢাকায় এসে কোথায় একটু বিশ্রাম নেবেন, কোথায় গোসল বা শৌচাগারের প্রয়োজন মেটাবেন, কোথায় বসে সকালের নাশতা করবেন— তার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেই। তাদের অনেকেরই রাজধানীতে একটি হোটেলে কক্ষ ভাড়া নেওয়ার সামর্থ্য নেই। ফলে ক্লান্তি আর দীর্ঘযাত্রার অবসাদ নিয়েই আদালতের বারান্দায় অপেক্ষা করতে হয় তাদের।
কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ মেঝেতে বসে, কেউবা দেয়ালে হেলান দিয়ে সময় গুনছেন। কখন শুরু হবে মামলার শুনানি, কখন মিলবে আদালতের আদেশ— সেই অপেক্ষা। এজলাসের সামনের বারান্দায় একসঙ্গে এত মানুষের ভিড়ে পরিবেশ হয়ে উঠেছে হাট-বাজারের মতো।
শুনানি শেষে কারও জামিন মিলবে, কারও মিলবে না। কিন্তু আদেশ যা-ই হোক, একই বাসে তাদের ফিরতে হবে নিজ এলাকায়। ঢাকায় আসা-যাওয়ার খরচ, বাসভাড়া, আইনজীবীর ফি— সবকিছুর চাপ সামলে আদালতে আসাটাই অনেকের জন্য বড় আর্থিক বোঝা। তার ওপর দিনের পর দিন অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা আর মৌলিক সুবিধার অভাব। এমন ভোগান্তি যেন তাদের জন্য বাড়তি এক শাস্তি।
সুনির্দিষ্ট মামলার আপিল-সংক্রান্ত বিষয় ছাড়াও এমন কিছু আইনি প্রতিকার রয়েছে, যেগুলোর জন্য বিচারপ্রার্থীদের সরাসরি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হতে হয়। এর মধ্যে অন্যতম আগাম জামিন। দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিনই মামলা হচ্ছে। এসব মামলার সব যে হয়রানিমূলক, তা নয়। তবে কোনো কোনো মামলায় হয়রানির অভিযোগ ওঠে; আবার কাউকে কাউকে হয়রানির উদ্দেশ্যেই আসামি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্টরা।
এমন পরিস্থিতিতে গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কায় থাকা ব্যক্তিরা আগাম জামিনের আবেদন করেন। কিন্তু দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে একজন ব্যক্তিকে এই প্রতিকার চাইতে হলে প্রায়ই পাড়ি দিতে হয় শত শত কিলোমিটার পথ। ভাড়া করতে হয় গাড়ি, বহন করতে হয় থাকা-খাওয়ার খরচ, নিতে হয় আইনজীবীর সহায়তা।
আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগাম জামিনের ক্ষেত্রে জেলা পর্যায়ে থাকা দায়রা আদালতেরও এখতিয়ার রয়েছে। কিন্তু দায়রা আদালতে এই এখতিয়ারের ব্যবহারিক প্রয়োগ নেই বললেই চলে; আগাম জামিনের শুনানির জন্য বিচারপ্রার্থীদের কার্যত হতে হচ্ছে হাইকোর্টমুখী।
এর বাইরে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে মৌলিক অধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা যায়। কিন্তু এ ধরনের প্রতিকার পেতেও দেশের দূরবর্তী এলাকার বিচারপ্রার্থীদের ঢাকায় আসতে হয়। অর্থাৎ, অধিকারের সাংবিধানিক সুযোগ কাজে লাগানোর ব্যয় ও ভোগান্তি অনেকের জন্য বড় বাধা। আইনজ্ঞরা বলছেন, যদি স্থানীয় পর্যায়ে অর্থাৎ, অন্তত বিভাগীয় শহর পর্যন্ত এসে আইনসম্মতভাবে এই প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ কার্যকর করা যায়, তাহলে অনেক বিচারপ্রার্থীর ঢাকায় যাতায়াতের ব্যয়, সময়ের অপচয় কমতে পারে।
বিচারপ্রার্থীদের এ দুর্ভোগ নিরসনে বহু আলোচনা হয়েছে। হাইকোর্টকে বিকেন্দ্রীকরণের দাবি উঠেছে। সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনেও হাইকোর্টকে বিকেন্দ্রীকরণের প্রস্তাব করা হয়। এতে বলা হয়, রাজধানীতে সুপ্রিম কোর্টের স্থায়ী আসন থাকবে এবং রাজধানীর বাইরে প্রতিটি বিভাগীয় সদরে হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বেঞ্চ থাকবে। অর্থাৎ সবসময় কার্যকর থাকবে।
আবার সংবিধান সংস্কার কমিশনও করেছে একই সুপারিশ। পরে আবার যখন এসব সুপারিশের ভিত্তিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠিত হলো, সেখানেও বিষয়টি ছিল। বলা হয়েছে, হাইকোর্টকে বিভাগীয় পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। প্রস্তাব করা হয়, বিভাগীয় শহরে এক বা একাধিক স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার। বিএনপি তাতে একমত পোষণ করেছে।
কিন্তু এত আলোচনার পরও বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ অবসানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। বিদ্যমান সংবিধানে সার্কিট বেঞ্চ বা অস্থায়ী বেঞ্চ স্থাপনের অনুমোদন আছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রধান বিচারপতিকে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে।
বিচারপ্রার্থীদের এ দুর্ভোগ অবসানে সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ হাইকোর্টকে বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ১৯৮২ সালে সামরিক শাসন জারির পর ওই বছরের ৮ জুন ঢাকা, কুমিল্লা, রংপুর ও যশোরে হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ গঠন করা হয় এবং পরে আরও তিনটি বেঞ্চ এই তালিকায় যুক্ত হয়। একপর্যায়ে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে রাজধানীর বাইরে ছয়টি জেলা সদরে (এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম ছিল বিভাগীয় সদর দপ্তর) স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার বিধান সন্নিবেশ করে ১০০ অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপিত হয়।
কিন্তু বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আপত্তি ওঠে, বিশেষ করে আইনজীবীদের মধ্য থেকে। একপর্যায়ে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে মামলা হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারক সংবিধানের ১০০ অনুচ্ছেদের সংশোধনীকে সংবিধানের মূল কাঠামোর পরিপন্থী ও বাতিল ঘোষণা করেন।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন আগামীর সময়কে বলেছেন, এরশাদ হাইকোর্টকে বিকেন্দ্রীকরণের জন্য যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তা ছিল দেশের জন্য এক বিশাল পদক্ষেপ এবং বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনার ফসল। তার মতে, এরশাদের ক্ষমতায় আসা এবং তার শাসনব্যবস্থার বিরোধিতা করতে গিয়ে গড়পড়তা তার প্রায় সব সিদ্ধান্তেরই বিরোধিতা করে তখনকার আইনজীবী সমাজ। হাইকোর্ট বিকেন্দ্রীকরণের বিরোধিতা করা ছিল জনস্বার্থ বিরোধী কাজ।
এই আইনজীবী জানালেন, একটা আগাম জামিন করার জন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকায় আসতে হয় এবং জামিন আবেদন শুনানির জন্য তালিকায় আনতেই তাকে মাসের পর মাস ঢাকা শহরে হোটেলে থাকতে হয়, খেতে হয়। এতে লাখ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে একজন বিচারপ্রার্থীর। তার মতে, ‘বর্তমান বাংলাদেশে প্রায় ২০ কোটি লোক। ২০ কোটি লোকের জন্য তো একটা হাইকোর্ট হতে পারে না।’
অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী সার্কিট বেঞ্চ গঠনের ক্ষমতা প্রধান বিচারপতির হাতে। তিনি প্রয়োজন মনে করলে এ ধরনের বেঞ্চ গঠন করতে পারেন। বিষয়টি পুরোপুরি তার বিবেচনা ও সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
তবে রাষ্ট্রের প্রধান এই আইন কর্মকর্তার মতে, এক্ষেত্রে আইনজীবীদেরও স্বার্থ-সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এবং ঢাকাকেন্দ্রিক আদালত ব্যবস্থার বাইরে সার্কিট বেঞ্চ স্থাপনের বিষয়ে তাদের মধ্যে মতভিন্নতা রয়েছে। মামলার সংখ্যা ও বিচারপ্রার্থীদের প্রয়োজন বিবেচনায় প্রধান বিচারপতি বিষয়টি কতটা জরুরি মনে করছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে সংবিধানে সার্কিট বেঞ্চ গঠনের সুযোগ রয়েছে বলে জানালেন তিনি।





