‘গত ১৫ বছর ঢাকায় এমন গ্যাসসংকট দেখিনি’
- ‘গ্যাসসংকটে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলে না’
- গ্যাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে চালকরা
- বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে যাত্রীদের

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানীসহ সারা দেশে সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন চালকরা। প্রয়োজনীয় গ্যাসের জন্য দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে তাদের। এরপরও অনেক ক্ষেত্রে চাহিদার তুলনায় কম গ্যাস নিয়ে ফিরতে হচ্ছে। এতে একদিকে কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়ে আয় কমছে চালকদের, অন্যদিকে বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে যাত্রীদের।
রাজধানীর একটি সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকা চালক মো. আইবর হোসেন বললেন, ‘দুই-তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে গ্যাস পাই মাত্র ১০০ টাকার। এটুকুতে কী-ই বা হয়। ১০০ টাকার গ্যাসে মাত্র ৩০-৪০ কিলোমিটার যায়। আবার গ্যাসের জন্য ২-৩ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হয়। প্রেসার না থাকলে পাম্প ওয়ালারাও কীভাবে দেবে?’
আমি গত ১৫ বছরের বেশি সময় ঢাকায় সিএনজি চালাই। কখনো এই ধরনের সংকট দেখিনি। এসব সমস্যা সমাধান করা তো সরকারের দায়িত্ব
গ্যাসের জন্য প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকায় তাদের আয় করার সময় কমে যাচ্ছে। গাড়ির দৈনিক জমা, জ্বালানি খরচ ও সংসারের ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেকেই পড়ছেন আর্থিক চাপে। অন্যদিকে অভিযোগ উঠছে সংকটের সুযোগে যাত্রীদের কাছ থেকেও বাড়তি ভাড়া নেওয়ার।
কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসে গত ছয় বছর ধরে সিএনজি চালাচ্ছেন মো. হানিফ। তিনি জানিয়েছেন, গ্যাসসংকটে তার আয়-ব্যয়ের হিসাবও এলোমেলো হয়ে গেছে। তিনি বললেন, ‘প্রেসার না থাকায় আমাদেরও কিছু করার নেই। আমি তো গাড়ির মালিক না। দিনে ১২০০ টাকা জমা দিয়ে গাড়ি নিতে হয়। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় দুই-তিন ঘণ্টা। আমি জমা দেবো কী আর বাড়ি নিব কী?’
কোনো কোনো স্টেশনে তুলনামূলক গ্যাসের চাপ বেশি থাকলেও সেখানে দীর্ঘ লাইনের কারণে যেতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন হানিফ। তার ভাষ্য, ‘যেসব পাম্পে প্রেসার বেশি, সেগুলোতে সিরিয়ালও বেশি। সিরিয়াল কম দেখে এই পাম্পে এলাম। এখানে এসে দেখি প্রেসারই নেই।’
সংকটের কারণে প্রায় গত এক মাস ধরে ১৬০-১৮০ টাকার ভাড়া দিতে হচ্ছে ৩২০ টাকা
দীর্ঘদিন ধরে সিএনজি চালানো আসাদ মিয়া বলছেন, এমন পরিস্থিতি আগে দেখেননি তিনি। তার ভাষায়, ‘আমি গত ১৫ বছরের বেশি সময় ঢাকায় সিএনজি চালাই। কখনো এ ধরনের সংকট দেখিনি। এসব সমস্যা সমাধান করা তো সরকারের দায়িত্ব।’
গ্যাসের লাইনে দাঁড়িয়ে কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বললেন, ‘আমার দিনে প্রায় তিন-চার ঘণ্টা গ্যাসের লাইনে দাঁড়িয়ে নষ্ট হয়। এই সময় যে ইনকাম করতে পারতাম, সেটা কে দেবে? এসব দায়িত্ব তো সরকারের। তারা কী করছে?’
গ্যাসের চাপ কম থাকায় সিএনজি স্টেশন চালাতেও সমস্যা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সিটিজেন সিএনজি অ্যান্ড পেট্রোলিয়াম ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার মো. রাকিবুল ইসলাম রাকিব বললেন, ‘আমরা প্রেসারের ওপর নির্ভর করে গ্যাস দিয়ে থাকি। আজ সকাল ১০টা থেকে প্রেসার নেই। তাই বন্ধ রেখেছি।’
দীর্ঘ সময় স্টেশন বন্ধ রাখার বিষয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমরা তো আর গ্যাস মজুদ করে রাখতে পারি না। যখন প্রেসার আসবে তখনই গ্যাস দিতে হবে। আমরা তিতাস কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। এ ছাড়া কী-ই বা করতে পারি।’
মক্কা সিএনজি রিফিউলিং স্টেশনের অ্যাডমিন অফিসার এবং চিফ অ্যাকাউন্টেন্ট সজিব খান জানিয়েছেন, আমাদের যদি পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ থাকে তাহলে আমাদের তো দিতে সমস্যা নেই। গ্যাস মজুদ রাখার উপায় নেই। যে চালকরা রেগুলার গ্যাস নেয় তারা জানে প্রেসার না থাকায় পর্যাপ্ত গ্যাস দিতে পারছি না।
তিনি জানালেন, গ্যাস সাপ্লাই করে তিতাস। সংকটের কারণে তাদের একাধিকবার জানিয়েছি। সরকার যতদিন এই সমস্যার সমাধান না করবে ততদিন গাড়ির লাইনও শেষ হবে না।
বেসরকারি চাকরিজীবী মো. আব্দুল বাসেত বললেন, ‘দেশের সিএনজি সংকটে অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হচ্ছে আমাদের মতো সাধারণ যাত্রীদের। আমাদের বেতন তো আগের মতোই আছে। কিন্তু এখন সিএনজিতে দিতে হচ্ছে আগের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া। এসব সংকট মোকাবিলা করা তো সরকারের দায়িত্ব। অথচ টাকা যাচ্ছে আমার পকেট থেকে।’
আরেক সিএনজি যাত্রী নাজমা বেগম বললেন, আমাদের তো নিয়মিত অফিস যেতে সিএনজি ব্যবহার করতে হয়। সংকটের কারণে প্রায় গত ১ মাস ধরে অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হচ্ছে। মিরপুর ১০ থেকে ফার্মগেটের ভাড়া দিতে হলো ৩২০ টাকা। অন্যান্য সময় ছিল ১৬০-১৮০ টাকা।
দ্রুত গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে স্টেশনগুলোতে পর্যাপ্ত চাপ নিশ্চিত করা না গেলে সংকট আরও তীব্র হতে পারে। একই সঙ্গে গ্যাসের লাইনে চালকদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া এবং এর প্রভাব যাত্রীভাড়ায় পড়ার বিষয়টিও দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়েছেন সিএনজিচালকরা।







