ঐকমত্য কমিশনে গণতন্ত্র কোথায় ছিল, প্রশ্ন সারা হোসেনের

সংগৃহীত ছবি
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনকে কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বলা যায় না, মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত ও বহুল আলোচিত এই কমিশনে কোথায় গণতন্ত্র ছিল, সে প্রশ্নও তুললেন তিনি।
আজ মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) জাতীয় প্রেস ক্লাবে একটি গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করেছিল সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। যার শিরোনাম ছিল, ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংস্কার: সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, আদালতের নির্দেশনা ও জনআকাঙ্ক্ষা’।
সেই আলোচনায় সারা হোসেন তুললেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রসঙ্গ, কমিশন গঠনে বা কাজ-কর্মে গণতন্ত্র না থাকার অভিযোগ। ওই কমিশনে কোনো নারী সদস্য না রাখার বিষয়টিও উঠে এলো তার কথায়।
সারা হোসেন বললেন, ‘এটা সিলেক্টিভ প্রসেস। কয়েকজনকে নিয়ে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেখানে গণতন্ত্র কোথায় ছিল? কীসের নির্বাচন, কে এসেছে? বাইরে থেকে কেউ কথা বলতে পেরেছে? কেউ না।’
শুধু ঐকমত্য কমিশন নয়, বিচারব্যবস্থা সংস্কার কমিশনেও কেন কোনো নারী আইনজীবী বা বিচারপতিকে সম্পৃক্ত করা হয়নি, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
গোলটেবিল আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিচারপতি এম এ মতিন।
তার কথায় উঠে এলো সংশোধনের নামে সংস্কার প্রক্রিয়া ব্যর্থ করে দেওয়ার চক্রান্তের কথা। তিনি বলছিলেন, ‘যারা সংস্কারকে সংশোধনের নামে ব্যর্থ করে দিতে চান, তাদের চক্রান্ত জাতি মেনে নেবে না।’
বিচার বিভাগকে স্বাধীন করার ব্যাপারে সংবিধানের বিধান থাকলেও ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত কোনো সরকার কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেয়নি উল্লেখ করে এম এ মতিন বললেন, ‘১৯৯৫ সালে মাসদার হোসেন বনাম বাংলাদেশ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ একটি যুগান্তকারী রায়ের মাধ্যমে একটি নির্দেশ জারি করেন। সেই রায়ের বিরুদ্ধে সরকার আপিল বিভাগে চ্যালেঞ্জ করে। সেই মামলায় আপিল বিভাগ ১২টি নির্দেশনা দিয়ে বিচার বিভাগকে স্বাধীন করার মানসে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখেন। ওই রায়ের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকার নির্দেশ দেয় একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিচারপতিদের নিয়োগ এবং অন্য একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে আলাদা সচিবালয় করার।’
কিন্তু বিএনপি সরকার গঠনের পর এই দুটি অধ্যাদেশকে অ্যাক্ট অব পার্লামেন্ট না করায় আইন দুটি বাতিল হয়ে যাওয়ার কথা টেনে তিনি বললেন, ‘এই জাতীয় অর্জনকে এভাবে বর্জন করায় গোটা জাতি হতবাক ও মর্মাহত।’
বৈঠক শেষে গণমাধ্যমে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে সুজনও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রসঙ্গ টেনেছে।
সেখানে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তি মজবুত করতে এবং আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে আলাদা করার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে এখনো নানা আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা রয়েছে। বিশেষ করে, নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের হাতে থাকা বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতার পথে বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে।
বিচার বিভাগের এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় নীতিনির্ধারক, আইনজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের বিষয়ে মত দিয়েছে সুজন।
কয়েকজন বক্তার কণ্ঠে উঠে আসে হতাশাও। মাসদার হোসেন মামলার রায় ঘোষণার পর দুই যুগের বেশি সময় পার হলেও বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠা না হওয়াকে রাষ্ট্রের সদিচ্ছার অভাব হিসেবে দেখছেন তারা। বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে তাই আলোচনায় বারবারই উঠে এলো বিচার বিভাগকে পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার বিষয়টি।



