প্রধানমন্ত্রীর ঈদ বোনাসের টাকা এখনো দেয়নি দক্ষিণ সিটি
- ডিএসসিসিকে বোনাস হিসেবে দেওয়া হয়েছে ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা
- ২৬ মে এর মধ্যে এ বোনাস দিয়েছে দেশের অন্য সব সিটি করপোরেশন
- বোনাসের অর্থ অন্য খাতে খরচ করেছে দক্ষিণ সিটি
- অর্থ খরচের কাজটি হয়েছে প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার পরামর্শে
- প্রশাসক জানতেন না যে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের বোনাস দেওয়া হয়নি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মঙ্গলবার ভোর ৪টা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বিভিন্ন এলাকা ঝাড়ু দিচ্ছেন পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা। রাত জেগে শহর পরিষ্কার করা এসব কর্মীদের আয় সামান্য। গত মাসের বেতন পেয়েছেন কয়েকদিন আগে। তবে এখনো পাননি প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ঈদ বোনাস।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পরিচ্ছন্নতা কর্মী জানিয়েছেন, ঢাকা উত্তর সিটি ১০ হাজার টাকা বোনাস দেয়। সেখানে ঢাকা দক্ষিণ দেয় মাত্র ৪ হাজার। এর বাইরে নতুন প্রধানমন্ত্রীর চালু করা বিশেষ বোনাসও হাতে পাননি তারা।
অথচ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের বোনাসের চেক হস্তান্তর করেছেন গত ২২ মে। ২৬ মের মধ্যেই এই বোনাস পেয়েছেন দেশের অন্যান্য সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা। এর মধ্যে সিলেট সিটি করপোরেশন বোনাস দিয়েছে ২৩ মে। ঢাকা উত্তর, চট্টগ্রাম, খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন বোনাস দিয়েছে ২৪ মে। রাজশাহী, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন দিয়েছে দিয়েছে ২৫ মে। পরের দিন রংপুর সিটি বোনাস দিয়েছে ৮৫৫ জনকে। এমতাবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই ডিএসসিসির কর্মীদের মনে প্রশ্ন জেগেছে তাদের বোনাসের টাকা গেল কোথায়?
ডিএসসিসির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অর্থ সংকটের কারণে বোনাসের টাকা অন্য খাতে খরচ করেছে দক্ষিণ সিটি। আর কাজটি হয়েছে প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. আলী মনসুরের পরামর্শে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সামনে হোল্ডিং ট্যাক্সের টাকা আদায় হলে সেখান থেকে দেওয়া হবে এ বোনাস। তবে সেই আদায় অনিশ্চিত। এবার বকেয়া হোল্ডিং ট্যাক্সে সারচার্জ মওকুফের ঘোষণা দিয়েছে ডিএসসিসি।
ডিএসসিসির বিভিন্ন বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. আলী মনসুরের সঙ্গে ফোনে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তবে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের বোনাসের বিষয়টি জানতে চাইলে তার জবাব, ‘কিছুই শুনতে পাচ্ছি না।’ এরপর আবারও ফোন করলে আর ফোনই তুললেন না এ কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বোনাসের টাকা দেওয়া হয়েছে অনেক আগেই।’
কিন্তু পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা টাকা পাননি জানাতেই তিনি বললেন, ‘আমি খোঁজ নিচ্ছি।’ তার এই কথার পর আবারও প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. আলী মনসুরকে ফোন করলে তার ফোন ওয়েটিং পাওয়া যায়। কিন্তু তারপর আর ফোন ধরেননি তিনি।
এর কিছুক্ষণ পর ডিএসসিসির প্রশাসক ফোন করে এ প্রতিবেদকে জিজ্ঞেসা করলেন, ‘আপনি কি অনুসন্ধানী সাংবাদিক?’ প্রতিবেদক আবারও বোনাসের টাকার প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি তড়িঘড়ি বললেন, ‘দিন তিনেকের মধ্যে দেওয়া হবে। অনুষ্ঠান করে দেওয়া হবে বলে দেরি হলো।’ অথচ কিছুক্ষণ আগেও প্রশাসক দাবি করছিলেন, ‘পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বোনাসের টাকা দেওয়া হয়েছে।’
জানা গেছে, ডিএসসিসির মোট পরিচ্ছন্নতা কর্মী ৪ হাজার ৯০৯ জন। প্রত্যেকের জন্য ৫ হাজার করে টাকা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। মোট বরাদ্দ ছিল ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকার বেশি। এই টাকা সিটি করপোরেশন অন্য খাতে ব্যয় করতে পারে কিনা জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, ‘এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরাসরি দুর্নীতি।’
তার ভাষ্য, উত্তর সিটির চেয়ে রুটিন বোনাস কম দিয়ে দক্ষিণ সিটি এমনিতেই পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের সঙ্গে বৈষম্য করছে। অন্যদিকে তাদের ন্যায্য পাওনা থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে। এটা ক্ষমতার অপব্যবহার।
প্রশাসকের দুই রকম মন্তব্যকে দায়িত্বজ্ঞানহীনতা বলে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর বরাদ্দ একটা বিশেষ উপহার। সেই অর্থের ব্যাপারে প্রশাসক জানেন না- এটা হতে পারে না।
এদিকে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের বোনাসের টাকা না দেওয়াকে অমানবিক বলে উল্লেখ করেছেন নগরপরিকল্পনাবিদরাও। অধ্যাপক আকতার মাহমুদ আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘এক খাতের টাকা অন্য খাতে ব্যয় করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তারপরেও যদি কেউ করে অন্য খাতে ব্যয় করে তার যথাযথ কারণ উল্লেখ করতে হবে।’
পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি না খেলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা সিটি করপোরেশনের সবচেয়ে দরিদ্র জনবল। তারা এই শহরকে পরিষ্কার রাখেন। ফলে তাদেরকে খুশি রাখা উচিত। তা না করে তাদের ঈদ বোনাস এখনো দেওয়া হয়নি, এটা দুঃখজনক।’




