সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের ওপর ১০ বছরের শুল্ক-কর ছাড়ের দাবি

সংগৃহীত ছবি
দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণে সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের ওপর শুল্ক-কর আগামী ১০ বছরের জন্য বাতিল করে সবার জন্য এ সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো।
আজ রবিবার রাজধানীর বাংলামোটরে একটি রেস্টুরেন্টে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেটে জ্বালানি খাত: নাগরিক সমাজের প্রতিক্রিয়া’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন) এবং বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি) যৌথভাবে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। এতে সহ-আয়োজক ছিল বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা), ইথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশ এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন।
সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের ওপর থেকে সব ধরনের আমদানি শুল্ক, ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহারের ঘোষণাকে স্বাগত জানান বক্তারা। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে বলেন, বাজেট ঘোষণার মাত্র তিন দিন আগে জারি করা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একটি এসআরও সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের লক্ষ্যকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির প্রধান নির্বাহী ও সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, ‘পাশের দেশের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ আছে, আমাদের দেশের ছাদেও আছে। পার্থক্য হলো—তাদেরটা কার্যকর, আর আমাদেরটা অকার্যকর।’
তিনি বলেছেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর পাশাপাশি বাজেট ও নীতিতে তার প্রতিফলন থাকতে হবে। এজন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা।’
রাজধানীর বাইরে চলমান লোডশেডিং ও জ্বালানি বৈষম্য দূর করতেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন ক্লিনের প্রধান নির্বাহী ও বিডব্লিউজিইডির সদস্যসচিব হাসান মেহেদী। তিনি বলেছেন, ‘কর ও শুল্ক প্রত্যাহারের ফলে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও উৎপাদন ব্যয় ৩০ থেকে ৩৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসবে। এর ফলে জ্বালানি আমদানির ওপর দেশের নির্ভরতা কমবে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জাতীয় লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে।’
তবে গত ৮ জুন জারি করা এনবিআরের এসআরওতে এমন কিছু শর্ত আরোপ করা হয়েছে, যা সাধারণ গ্রাহক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কৃষকদের জন্য সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনকে প্রায় অসম্ভব করে তুলবে। এসআরও অনুযায়ী, মূলত বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও পিপিএভিত্তিক সৌর প্রকল্পগুলোই কর-সুবিধা পাবে। অথচ কোটি কোটি আবাসিক গ্রাহক, কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা এর বাইরে থেকে যাবেন।
হাসান মেহেদী বলেছেন, ‘সরকার যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তারে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেখানে এনবিআরের এই এসআরও সেই অগ্রযাত্রার পথেই কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি অবিলম্বে বাতিল করে কর-সুবিধা সব নাগরিক ও উদ্যোক্তার জন্য উন্মুক্ত করতে হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, একদিকে সরকার এলএনজি আমদানিকে বড় অর্থনৈতিক সংকট হিসেবে চিহ্নিত করছে, অন্যদিকে এলএনজি আমদানির ওপর বিদ্যমান কর-সুবিধা বহাল রেখেছে। পাশাপাশি কয়লা আমদানিতে কর ছাড় বৃদ্ধি, নতুন রিফাইনারি স্থাপন এবং জীবাশ্ম জ্বালানি অবকাঠামো সম্প্রসারণের উদ্যোগ দেশের সবুজ রূপান্তরকে ধীর করে দিতে পারে।
এবার জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ১৭ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য বরাদ্দ মাত্র ৩৭৯ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ২ দশমিক ২ শতাংশ। অথচ ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য বছরে কমপক্ষে ২১ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন।
নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকার একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি তহবিল গঠন, আবাসিক সৌরবিদ্যুতের জন্য সরাসরি ভর্তুকি প্রদান, করপোরেট বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি দ্রুত কার্যকর করা, ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর প্রগতিশীল নির্গমন কর আরোপের দাবি জানানো হয়।
ক্লিনের নেটওয়ার্কিং অ্যাডভাইজার মনোয়ার মোস্তফা বলেছেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত অগ্রসর হওয়া বাংলাদেশের জাতীয় অগ্রাধিকার। যত দ্রুত আমরা এগোব, অর্থনীতি তত লাভবান হবে। তাই এই খাতে বিদ্যমান বৈষম্যমূলক নীতিগুলো পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।’
ইটিআই বাংলাদেশের পরিচালক মুনীর উদ্দিন শামীম বলেছেন, ‘বৈষম্য রেখে সবুজ জ্বালানিতে রূপান্তর সম্ভব নয়। কার্বন নির্গমন কমানোর লক্ষ্যে সরকারকে কার্যকর প্রণোদনা দিতে হবে। একই সঙ্গে ২০২৭ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার চাহিদা পূরণে বাজেট ও নীতির যথাযথ সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।’
জিসিসির কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ আনজুম বলেছেন, ‘বাজেটে মোট বরাদ্দের প্রায় ৯৮ শতাংশই জীবাশ্ম জ্বালানিতে যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, আমাদের নীতিগত অবস্থান ও বাস্তব বিনিয়োগের মধ্যে কি কোনো সামঞ্জস্য রয়েছে?’







