হইচই সার, ফুটপাত যেমন ছিল তেমনই
- ১ এপ্রিল অভিযান শুরু করে ডিএমপি

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
বেশ হইচই করে ঢাকার সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে শুরু করেছিল ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। অবশ্য এই হইচই-ই সার, কারণ পুলিশ আর প্রশাসনের সদস্যরা চলে যাওয়ার পরপরই আগের রূপে ফিরে যাচ্ছে এসব জায়গা। সকালে উচ্ছেদ করে যাওয়া ফুটপাত, বিকেল হতে না হতেই ফের দখল হয়ে যাচ্ছে। বরং উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে পুলিশ ও হকারদের মধ্যে চলছে এক ধরনের চোর-পুলিশ খেলা।
ফলে পথচারীরা স্বস্তি তো পাচ্ছেনই না, উল্টো কিছুক্ষণের জন্য এলাকা জুড়ে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের ভোগান্তি আর ভীতিকর পরিবেশ। এই ধরনের উচ্ছেদ অভিযান ঢাকাবাসীর জন্য নতুন নয়। মাঝে মাঝেই পুলিশ-প্রশাসন অভিযান চালায়। আর তা শেষ হতেই হকাররা ফের বসে যান আগের মতোই। সবশেষ গত ১ এপ্রিল এই অভিযান শুরু করেছিল ডিএমপি, চলেছে পাঁচ দিন।
এই কদিন ঢাকার রমনা, লালবাগ, মতিঝিল, ওয়ারী, তেজগাঁও, মিরপুর ও উত্তরা বিভাগের গুলিস্তান, কাপ্তানবাজার, ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড, বকশীবাজার, চানখাঁরপুল, ঢাকা মেডিকেল, বংশাল, মতিঝিল, নিউ মার্কেট, সায়েন্স ল্যাব, পান্থপথ, গ্রিন রোড, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ভাষানটেক, উত্তরা, গুলশান-১, মহাখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় চলে অভিযান। যার উদ্দেশ্য ছিল পথচারীদের চলাচল নির্বিঘ্ন করা এবং যানজট কমানো।
অভিযানে সড়ক ও ফুটপাত অবৈধভাবে দখল করে রাখায় একাধিক প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক জরিমানা, এমনকি কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বেশ কয়েকটি স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে হকারদের বাগবিতণ্ডাও হয়। যার জের ধরে সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে আটক করা হয় বেশ কয়েকজনকে।
কাগজে-কলমে অভিযান শেষ হয়েছে রবিবার। এরপর বুধবার গ্রিন রোড, পান্থপথ, বসুন্ধরা কারওয়ান বাজার, মিরপুর ১০, পল্লবীসহ বেশ কিছু এলাকা ঘুরে দেখা গেল, উচ্ছেদের কোনো চিহ্নই নেই। আগের মতোই সড়ক আর চলার পথ দখল করে দোকান বসিয়েছেন হকাররা। পুরোদমে চলছে বিকিকিনি।
গ্রিন রোডের ফুটপাতে ফল বিক্রি করছিলেন মো. আব্দুর রহমান। আগের মতোই বিক্রিবাট্টা শুরু করলেও কিছুটা ভয়ে রয়েছেন বলে জানালেন তিনি। আগামীর সময়কে বললেন, ‘৪ এপ্রিলের অভিযানে দোকান উচ্ছেদ করা হয়েছিল। কিন্তু পেটের দায়ে আবারও বসেছি। এখন ভয় লাগে। ভয়ে ভালোভাবে দোকানও করতে পারছি না।’
শুধু গ্রিন রোড নয়, পান্থপথ থেকে শুরু করে সেন্ট্রাল রোড পর্যন্ত সড়কটির দুপাশেই দেখা মিলল আগের মতোই দৃশ্য। দুই ধারে ফলের দোকান, ভাসমান খাবারের হোটেল, চায়ের দোকানসহ নানা সামগ্রীর পসরা নিয়ে বসেছেন ক্ষুদ্র ও ভাসমান ব্যবসায়ীরা।
চোখেমুখে বিরক্তি নিয়ে ফুটপাত ধরে হাঁটছিলেন দ্বীন ইসলাম নামে এক পথচারী। কথা বলি তার সঙ্গে, জানতে চাই বিরক্তির কারণ। এই পথচারীর মতে, এসব অভিযান লোক দেখানো।
বিরক্তির সঙ্গেই তিনি বললেন, ‘উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েও স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে হাঁটতে হচ্ছে সড়কে। ফুটপাত দখল করে রেখেছেন হকাররা এবং রাস্তা দিয়ে যে হাঁটব সেটার উপায় নেই। সড়কে রয়েছে অটোরিকশার অবাধ বিচরণ। ফলে যেকোনো সময় একটা দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।’ আর দুর্ঘটনা ঘটলে তার দায় কে নেবে, সে প্রশ্নও রাখেন তিনি।
মিরপুর ১০ নম্বর মেট্রো স্টেশনের নিচ থেকে শুরু করে পল্লবী পর্যন্তও দেখা মিলেছে একই দৃশ্যের। সড়কটির দুপাশে কাঠের মাচা বসিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে কাপড়। দেখলে মনে হবে, ফুটপাত নয়, যেন কাপড়ের বাজার। শার্ট, গেঞ্জি, প্যান্ট থেকে শুরু করে কী নেই সেখানে! আরও আছে বাদামের দোকান, শরবতের দোকান, শসা-গাজরের দোকানসহ হরেক পণ্যের পসরা।
মিরপুর-১১-এর ফুটপাত ছেড়ে সড়ক দিয়ে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন রুবাইয়া হক নামের এক নারী। তার কাছে প্রশ্ন রাখি, সড়ক দিয়ে কেন হাঁটছেন? প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান তিনি। আগামীর সময়কে বললেন, ‘ওপর দিয়ে হাঁটার কোনো অবস্থা আছে? পুরোটা ফুটপাত দখল হয়ে আছে। তাই বাধ্য হয়েই ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটছি।’ ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করার বিষয়ে কথা বলতে চাইলে অধিকাংশ হকারই কথা বলতে রাজি হননি। তাদের ভাষ্য, এভাবে ব্যবসা করা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই। জীবিকার তাগিদে অনেকটা বাধ্য হয়েই দোকান বসিয়েছেন। তাদের জন্য যদি সরকারের পক্ষ থেকে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা করে দেওয়া হয় তাহলে তারা আর এ সড়কে বসবেন না।ভ্রাম্যমাণ এসব হকারদের পুনর্বাসনে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে চালু করা হয়েছিল হলিডে মার্কেট। সে সময় ঢাকার পাঁচটি নির্দিষ্ট স্থানে ছুটির দিনে হকারদের বসার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছিল। পরে অবশ্য তা আর চালু থাকেনি। এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০১৭ সালে চালু হয় হলিডে মার্কেট। মূলত হকারদের ব্যবসাকে সুনির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে ফেরাতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এরপর প্রতি সপ্তাহের শুক্র ও শনিবার কয়েকটি নির্দিষ্ট স্থানে এসব মার্কেট বসতে শুরু করে। যার মধ্যে, মতিঝিল ও আগারগাঁওয়ের মার্কেট এখনো চালু রয়েছে। ফুটপাতগুলো ফের দখল হয়ে যাওয়ার বিষয়ে কথা বলি ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপকমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিনের সঙ্গে। তার মতে, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একক প্রচেষ্টায় এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; এর জন্য সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।‘আমরা একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছি এবং নিয়মিত মনিটরিংও করছি। সড়ক ও ফুটপাত দখল করা একটি অপরাধ। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, একই অপরাধ বারবার ঘটছে। উচ্ছেদের পর কিছু সময়ের মধ্যেই আবারও দখল হয়ে যাচ্ছে ফুটপাত।’বিকল্প কোনো জায়গা না থাকায়, ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীরা জীবিকার তাগিদে ফের ফুটপাতে বসছেন বলে মনে করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। তাই শুধু উচ্ছেদ নয়, পুনর্বাসনের বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বললেন তিনি।‘সরকার যদি সরাসরি উচ্ছেদ করে দেয়, তাহলে তাদের জীবিকা কীভাবে চলবে— সেটাও ভাবতে হবে। নির্দিষ্ট জায়গা নির্ধারণ করে হকারদের সেখানে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা গেলে সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে’, এমন মত দেন এন এম নাসিরুদ্দিন।
















