ঢাবির ফ্ল্যাটে ২৮ বছর বিনা ভাড়ায় ব্যবসা

অনিয়মের শুরুটা প্রায় তিন দশক আগে। ১৯৮৩ সালের কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উত্তর নীলক্ষেত আবাসিক এলাকার ২৮ নম্বর ভবনে ছিল রেশন শপ। পরে সেটি বন্ধ হয়ে যায় সরকারি সিদ্ধান্তে, ভাঙা পড়ে ভবনটিও। এরপর তৎকালীন উপাচার্যের মৌখিক অনুমতিতে ১৯৯৬ সালের দিকে সমবায় স্টোরকে সরিয়ে নেওয়া হয় ৮১/এ নম্বর ফ্ল্যাটে। সেই থেকে শুরু। এরপর কেটে গেছে ২৮ বছরেরও বেশি সময়। অথচ এক টাকাও ভাড়া দেয়নি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমবায় সমিতি। অথচ সেখানে চলেছে মুদি দোকান, লন্ড্রি ব্যবসা ও নিজস্ব অফিস। অনিয়ম শুধু সীমাবদ্ধ থাকেনি ভাড়াতেই। নিয়ম ভেঙে তৃতীয়পক্ষের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে জায়গা। এমনকি নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের এক নেতাকেও স্পেস বরাদ্দের অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নথিতে উঠে এসেছে এমন সব তথ্য।
২০১১ সালের পর সমিতিতে হয়নি কোনো নির্বাচন। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়েই চলেছে সব কর্মকাণ্ড। অডিট রিপোর্টে বারবার অনিয়ম ও আইনি ঝুঁকির সতর্কতা তুলে ধরা হলেও প্রশাসন ছিল নীরব। ২০২৪ সালের জুনে ফ্ল্যাটটি খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সম্প্রতি জায়গাটি দখলমুক্ত করেছে স্টেট অফিস। কিন্তু হারানো অর্থ আদায় নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। স্টেট অফিসের কর্তারা বলছেন, বকেয়া টাকা আর তোলা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, অভিযুক্তের অনেকেই এখন নেই।
ঢাবির প্রশাসনিক নথির তথ্য বলছে, দীর্ঘ ২৮ বছর ছয় মাস ফ্ল্যাটটি ব্যবহার করলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাগারে ভাড়া হিসেবে কোনো অর্থ পরিশোধ করেনি সমবায় সমিতি। অথচ একই এলাকায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত ভাড়া কাঠামো অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাওয়ার কথা ছিল বড় অঙ্কের রাজস্ব। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেট অফিসের মতে, ন্যূনতম হিসাবেও দীর্ঘ এই সময়ে প্রায় ৭৫ লাখ ৫৬ হাজার টাকা ভাড়ার অর্থ বিশ্ববিদ্যালয় পায়নি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই সমবায় সমিতি ভাড়াটিয়ার মাধ্যমে দোকান ও লন্ড্রি পরিচালনা করেছে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি ছাড়াই সমিতির ব্যবহৃত স্থান ছাত্রলীগ নেতা মো. মাহবুব রাসেলের কাছে ভাড়া দেওয়া, পরিচালনা পরিষদের সিদ্ধান্তে শেয়ার বিক্রি ও হস্তান্তর এবং দোকানের মুনাফা সদস্যদের মধ্যে বণ্টনের অভিযোগও উঠে আসে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া তথ্যে।
২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরের অডিট রিপোর্টে সমবায় সমিতির কার্যক্রমে নানা অনিয়মের তথ্য উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সমিতির কার্যক্রমে স্বচ্ছতার অভাব ছিল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছাড়াই ব্যবহার করা হয়েছে ফ্ল্যাটটি। অডিটে সতর্ক করা হয়, এসব অনিয়ম ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
দোকানের পণ্য বিক্রি থেকে অর্জিত মুনাফা সমবায় সমিতির সদস্যদের মধ্যে বণ্টন করা হলেও বিশ্ববিদ্যালয়কে কোনো আর্থিক অংশ দেওয়া হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি ভাড়া থেকে প্রাপ্ত অর্থ নির্ধারিত হিসাব নম্বরে জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, প্রায় দুই লাখ টাকা জামানতসহ সব আর্থিক লেনদেন সমবায় সমিতি তাদের নিজস্ব ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে পরিচালনা করেছে।
এমন প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ৬ জুন অনুষ্ঠিত প্রশাসনিক সভায় ফ্ল্যাটটি খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয় সমবায় সমিতিকে। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মালামাল সরিয়ে নিতে বলা হয় এবং নির্দেশনা অমান্য করলে ক্ষয়ক্ষতির দায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নেবে না বলেও জানানো হয়।
নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১১ সালের পর থেকে সমবায় সমিতির কোনো নিয়মিত নির্বাচন হয়নি। তৎকালীন উপাচার্যের অনুমোদন ছাড়াই দীর্ঘদিন কার্যক্রম পরিচালনা করেছে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি, যা চিহ্নিত হয়েছে প্রশাসনিক অনিয়ম হিসেবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি দীর্ঘদিন বিনা ভাড়ায় ব্যবহার, অনুমোদনহীন ব্যবসা পরিচালনা, আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতার অভাব এবং জবাবদিহির সংকট— সব মিলিয়ে সমবায় সমিতির ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের তদারকির ঘাটতি ও প্রশাসনিক দুর্বলতার প্রতিফলন।
কারা ছিলেন সমিতি পরিচালনায়: সমবায় সমিতির পরিচালনা কমিটিতে মোট পদ ছিল ১২টি। এর মধ্যে সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ দীর্ঘদিন শূন্য ছিল। সভাপতি হিসেবে ছিলেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক নাজমুল আহসান মো. কলিমুল্লাহ। যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন মাহবুবুল হক, কোষাধ্যক্ষ মো. আবু তাহের। সদস্য হিসেবে ছিলেন মাসুদ, হারুনুর রশীদ তুষার, মনির বিশ্বাস, আলী আকবর, শামসুর রহিম, বনাই চন্দ্র দাস ও মো. মুজিবুর রহমান।
তাদের মধ্যে দুদকের করা দুর্নীতির অভিযোগের মামলায় অধ্যাপক কলিমুল্লাহ কারাগারে থাকায় তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয় সমবায় সমিতির কোষাধ্যক্ষ আবু তাহেরের সঙ্গে। তিনি এই প্রতিবেদকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের কথা জানান। অবশ্য পরে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী আগামীর সময়কে বললেন, ‘কেউ অনিয়ম করে থাকলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।’ এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
পরে চেষ্টা করেও অধ্যাপক জাহাঙ্গীরের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সমবায় সমিতির অর্থ লোপাটের বিষয়টি নিশ্চিত করলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেট ম্যানেজার ফাতেমা বিনতে মুস্তাফা। তিনি বলছিলেন, ‘এতদিন ভাড়া না দিয়ে সমবায় সমিতি অর্থ নিজেরা কুক্ষিগত করেছে। আমি দায়িত্বে আসার পর এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিই। তাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে।’
অবশ্য ভাড়ার টাকা তুলতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অপারগতার কথা তুলে ধরে স্টেট ম্যানেজার বললেন, ‘তারা (সমবায় সমিতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা) এই টাকা লোপাট করায় এটি এখন আর তোলা যাচ্ছে না। আর যারা টাকা লোপাট করেছে, তাদের অনেকেই এখন নেই।’
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ বিষয়ে আগে কেন ব্যবস্থা নেয়নি— এমন প্রশ্নের উত্তরে ফাতেমা বিনতে মুস্তাফার ভাষ্য, ‘আমার আগে আরও অনেকেই ম্যানেজারের দায়িত্বে ছিলেন। তারা কেন এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেননি, তা আমার জানা নেই।’
বিষয়টি নিয়ে আগামীর সময়ের কথা হয় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে স্টেট ম্যানেজারের দায়িত্বে থাকা সুপ্রিয়া দাসের সঙ্গে। তার ভাষ্য, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ বিষয়ে জানত। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই যেহেতু এই সমবায় সমিতি চালানোর সঙ্গে জড়িত ছিলেন, সেহেতু আমরাও সেভাবে কিছু বলিনি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী এটি অবৈধ উল্লেখ করা হলে তিনি এর স্পষ্ট কোনো জবাব দিতে পারেননি। বললেন, ‘সেটি জানা নেই, তবে বিশ্ববিদ্যালয়েরই (সমবায় সমিতি সংশ্লিষ্টরা) তো তারা।’






