তেল কেড়েছে নাওয়া-খাওয়া-ঘুম

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
শেষ কবে ঠিকমতো ঘুমিয়েছেন, মনে করতে পারেন না আল আমিন। কাজের ব্যস্ততা এত বেশি যে, ঘুম তো দূরের কথা— আরাম করে কবে ভাত খেতে পারবেন, সেটাই বুঝতে পারছেন না তিনি।
ব্যস্ততা দেখে ভেবে নেবেন না যে আল আমিন রাষ্ট্রের খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজে নিয়োজিত। আবার তিনি যে কাজ করেন, তাকে অতিগুরুত্বপূর্ণ না ভাবারও উপায় নেই। কারণ তিনি কাজ করেন ঢাকার একটি ফিলিং স্টেশনে, যা এখন সবচেয়ে ব্যস্ততম পরিষেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি।
আল আমিন একা নন, দেশের প্রায় সব ফিলিং স্টেশনে কর্মরতদের অবস্থাই এখন এক। কাজের চাপে ৪০ দিনেরও বেশি সময় ধরে তারা ভুলেছেন নাওয়া-খাওয়া-ঘুম।
‘তেলের জন্য চালকদের অপেক্ষা আর কষ্ট দেখে নিজে বিশ্রাম নিতেও অস্বস্তি হয়’— পরিতাপ প্রকাশ করেছেন মওলানা ভাসানী রোডের রমনা পেট্রল পাম্প অ্যান্ড সার্ভিস স্টেশনের জ্বালানি বিতরণকর্মী সুলতান মিয়া।
এই পাম্পটিতে সকাল ৭টায় শুরু হয় জ্বালানি বিতরণ। চলে টানা সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত।
সুলতান মিয়া বলছিলেন, ‘প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত টানা দিয়ে যেতে হয় তেল। শিফট থাকলেও পাম্পে অতিরিক্ত চাপের কারণে করতে হচ্ছে নিয়মিত ওভারটাইম। অনেক সময় বিরতি পাই না দুপুরের খাবারের জন্যও, সেখানে বিশ্রাম তো দূরের কথা।’
‘ক্লান্ত লাগলেও যেতে হয় কাজ করে। কারণ যারা তেল নিতে আসেন, তারাও তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে দাঁড়িয়েই থাকেন।’
রাতভর লাইনে থাকা, গাড়ি আর মোটরসাইকেল চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার দৃশ্য প্রচার হচ্ছে প্রায় সব গণমাধ্যমেই। স্যোশাল মিডিয়া খুললেই চোখে পড়ছে চালকদের তিক্ত অভিজ্ঞতা আর কষ্ট নিয়ে তৈরি রিল-ভিডিও। কিন্তু সংকটের মুখে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছেন পাম্পকর্মীরা, সেসব কথা জানছি আমরা খুব কমই।
শনিবার রাতে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করেছে সরকার। এরপর তেলের দাম বাড়লেও ঢাকার পেট্রল পাম্পগুলোয় এখনো সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে মোটরসাইকেল ও গাড়ির দীর্ঘ সারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত পরিমাণের জ্বালানি।
এই পরিস্থিতিতে ভীষণ চাপে রয়েছেন ফিলিং স্টেশন কর্মীরা। নাওয়া-খাওয়া-ঘুম ভুলে একটানা কাজ করে যেতে হচ্ছে তাদের।
ফিলিং স্টেশন কর্মী রফিক বলছিলেন, ‘সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একটানা কাজ করতে হচ্ছে। বসার সময় নেই, ঠিকমতো খাওয়ারও সুযোগ পাই না। এত চাপ যে এক মুহূর্তও পাওয়া যায় না ফাঁকা।’
জ্বালানি সংকটের মধ্যে টানা সেবা দিতে গিয়ে পাম্পকর্মীদের দুঃসহ অবস্থার কথা স্বীকার করলেন বাংলাদেশ পেট্রল পাম্প মালিক সমিতির সদস্যসচিব মীর আহসান উদ্দিন পারভেজ।
তার কাছেই জানা গেল, সবশেষ সংবাদ সম্মেলনে লিখিতভাবে পাম্পকর্মীদের দায়িত্ব পালনের সময় নির্ধারণ করে দেওয়ার প্রস্তাব উঠেছিল। মূলত কর্মীদের স্বস্তি দিতেই এ উদ্যোগের কথা ভাবা হচ্ছে।
‘আমাদের স্টাফরাও তো মানুষ। তারা গত মাসের ৫ তারিখ থেকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন টানা। কতদিন যে চলবে এই পরিস্থিতি, তাও জানি না আমরা’, কর্মীদের বিরতিহীন সেবা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন পাম্প মালিক সমিতির এই নেতা।
অতিরিক্ত চাপের কারণে অনেক কর্মী চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন বলেও জানালেন পারভেজ। ফলে অন্য কর্মীদের ওপর আরও বেড়েছে চাপ।
এ ক্ষেত্রে কর্মীরা অতিরিক্ত সময় কাজের জন্য আর্থিক প্রণোদনা বা ওভারটাইম পাচ্ছেন কি না, সে প্রশ্নও ছিল এই নেতার কাছে।
জবাবে তিনি জানালেন, বিষয়টি পাম্পভিত্তিক আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। যেমন আমি নিজে চারটি পাম্পের মালিক। আমরা স্টাফদের সঙ্গে বসে আলোচনা করে এসেছি একটি সিদ্ধান্তে। তারা যেহেতু অতিরিক্ত পরিশ্রম করছেন, তাই অবশ্যই পাবেন বাড়তি কিছু সুবিধা।
‘সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একটানা কাজ করতে হচ্ছে। বসার সময় নেই, ঠিকমতো পাই না খাওয়ারও সুযোগ। এত চাপ যে এক মুহূর্তও পাওয়া যায় না ফাঁকা।’
শুধু আর্থিক সুবিধা দিলেই এ সংকট কমবে না বলে মনে করেন পারভেজ। তার মতে, এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে বিশ্রামের বিষয়টি। এ কারণেই নির্দিষ্ট সময়সূচি নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছিল।
নির্দিষ্ট সময়সূচির বিষয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো সিদ্ধান্ত না এলেও কিছু এলাকায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও) নিজ উদ্যোগে নির্ধারণ করে দিয়েছেন নির্দিষ্ট সময়সূচি। এতে সেসব এলাকার কর্মীরা সন্তোষজনকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন বলেও জানালেন।
পাম্পগুলোয় কেন এত চাপ, তা জানতে কথা হয় বেশ কয়েকটি ফিলিং স্টেশন কর্মীদের সঙ্গে। দেখা গেল, কর্মীদের একটি বড় অংশ মোটরসাইকেল চালকদের ওপর বিরক্ত।
তাদের অভিযোগ, মোটরসাইকেল চালকদের একটি অংশের অতিরিক্ত জ্বালানি নেওয়ার প্রবণতা বাড়ায় পাম্পে ভিড়। তারা তেলের ট্যাংক খালি করে রেখে এসে ফের দাঁড়াচ্ছেন লাইনে। আর এতে লাইন হচ্ছে বড়, হয়রানি বাড়ছে কর্মীদের।
আবার অনেকে ভিআইপি পরিচয় দিয়ে বা জরুরি কাজের কথা বলে আগে তেল নেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ করেছেন একটি পাম্পের শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত এক পুলিশ সদস্য।
রঞ্জন দাস নামে ওই কনস্টেবলের ভাষ্য, ‘অনেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে বিরক্ত হয়ে চেষ্টা করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির। আমরা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করি পরিস্থিতি। কিন্তু তারাও এত সময় ধরে অপেক্ষা করেন যে সব সময় হতেও পারি না কঠোর।’

