পাহারাদার নিয়ে রোগীরা ওয়াশরুমে যায়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানীর কয়েকটি সরকারি হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, জরুরি বিভাগের ওয়াশরুমগুলোর শোচনীয় দশা। কোনো কোনোটির দরজা নেই। আবার দরজা থাকলেও ছিটকিনি লাগে না ঠিকমতো। করা হয় না নিয়মিত পরিষ্কার। অপরিচ্ছন্ন থাকার কারণে ব্যবহার করতে চান না অনেকেই। প্রয়োজনে দূরে যান বা খুঁজতে থাকেন হাসপাতালের অন্য বিভাগের ওয়াশরুম।
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল
‘ওয়াশরুম তো ব্যবহারের যোগ্যই না। এতগুলো রোগীর জন্য ওয়াশরুম মাত্র চারটা। তার মধ্যে একটা রুমের দরজা ভাঙা, বাকি তিনটার মধ্যে প্রায়ই ভিড় লেগে থাকে’— এ কথা বলছিলেন চাঁদপুর থেকে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে পায়ের সমস্যা নিয়ে আসা শাহ আলম।
‘আমরা জোর দিয়ে পরিষ্কার করার কথা বললে কেবল তখনই পরিষ্কার করে’— তিনি যোগ করেন।
ওয়াশরুমের ভাঙা দরজা বিষয়ে আগামীর সময়ের প্রতিবেদক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত এক ব্যক্তির কাছে জানতে চাইলে তার জবাব, ‘আমরা দরজা ঠিক করার জন্য কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। তারা বলেছেন অতি শিগগিরই ঠিক করে দেবেন।’
অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে আসা মনোয়ারা বেগম জানান, তার ছেলে রঙের কাজ করার সময় দোতলা থেকে পড়ে পা ভেঙে গেছে। এ হাসপাতালে আছেন প্রায় দুই মাস। ছেলে একা ওয়াশরুমে যেতে পারে না। সঙ্গে কারও যাওয়া লাগে। তার কথায়, ‘অনেক সময় আমি যাই, নইলে পোলার বউ যায়। এই ওয়াশরুমের যে অবস্থা! প্রায় সময় ময়লা থাকে। এখন আমি যদি এ ময়লার মধ্যে পোলারে নিয়া পইড়া যাই তাইলে আবার খারাপ অবস্থা হইবো। তার জন্যে এই ওয়াশরুমে যাই-ই না।’
মনোয়ারা বাধ্য হয়ে ছেলেকে দূরের ওয়াশরুমে নিয়ে যান। তিনি বলছিলেন, ‘ওরে নিয়া দূরের ওয়াশরুমে যাওয়া আমগো জন্য কষ্ট হইয়া যায়।’
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ওয়াশরুমের অবস্থা তুলনামূলক ভালো থাকলেও পরিষ্কার করা হয় না নিয়মিত। ওয়াশরুমে ঢোকার দরজার সামনেই পড়ে আছে আবর্জনা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে অনেক দিন আগের। ট্যাপের নিচে জমে আছে পানি।
এ অবস্থা নিয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের দায়িত্বে থাকা এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলে তারও উত্তর, ‘আমরা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।’ তিনি যোগ করেন, ‘আমরা যথেষ্ট চেষ্টা করি পরিষ্কার রাখার। কিন্তু এখানে আসা রোগী এবং রোগীর সঙ্গে আসা লোকজন একটু সময়ের মধ্যেই তা আবার ময়লা করে ফেলে।’
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরি বিভাগের চিত্র যেন আরও করুণ। সড়ক দুর্ঘটনায় হাত ও পায়ে আঘাত পান রাসেল। পরিবার নিয়ে থাকেন কামরাঙ্গীরচরে। তাকে স্ট্রেচারে নিয়ে পরিবার অপেক্ষা করছিল এক্স-রে রুমের সামনে। ডাক পড়ছে না এক্স-রে রুম থেকে।
এমন সময় তার সঙ্গে আসা ভাই খুঁজতে থাকেন ওয়াশরুম। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করলেন ওয়াশরুমটি কোথায়, তারা উত্তর দিলেন নিচতলায় কোনো ওয়াশরুম নেই, দোতলায় ওয়ার্ডগুলোর পাশে আছে। আর জরুরি ওয়ার্ডের বাইরে আছে একটি পাবলিক টয়লেট। তবে ওপরের ওয়াশরুমের ‘পরিবেশ খারাপ’ হওয়ায় বাইরেরটি ব্যবহার করার পরামর্শ দিলেন তারা।
বাইরেরটি পাবলিক টয়লেট হওয়ায় ব্যবহার করতে দিতে হয় টাকা। রাসেলের ভাই চিন্তায় পড়ে গেলেন। তিনি দোতলায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ফিরে এসে আগামীর সময়কে বর্ণনা করেন তার তিক্ত অভিজ্ঞতা, ‘ওপরে ওঠার সিঁড়ির সামনে বিছানা পেতে শুয়ে আছেন রোগীরা। তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে-বসে আছেন স্বজনরা। চলাচলের রাস্তা খুবই সরু। সামনে এগিয়ে দেখলাম একই সারিতে পাঁচটি ওয়াশরুম। রোগী নিয়ে নাক চেপে রুমগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন অন্যজনের বের হওয়ার অপেক্ষায়। ছেলে ও মেয়েদের জন্য নেই আলাদা ব্যবস্থা। পাঁচটির মধ্যে একটিতে নেই দরজা। দরজার জায়গায় লাগানো রয়েছে সাদা কাপড়ের পর্দা। তবে সেটিও চার ফুটের বেশি নয়।’
জানা গেছে, বাকি যে চারটিতে দরজা আছে, সেগুলোর একটিরও ছিটকিনি ঠিক নেই। কেউ ভেতরে গেলে দরজার সামনে পাহারা দিতে হয় অন্যজনকে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল
মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আসছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের রোগীরা। তবে এখানে ভিড় ঢাকা মেডিকেলের চেয়ে কম। কাউন্টারের পাশেই রয়েছে দুটি ওয়াশরুম। ১৬ মে বিকালে গিয়ে দেখা গেল, দুটির মধ্যে একটি তালাবদ্ধ। পরিবেশ ঠিক থাকলেও সচল মাত্র একটি। এতে চাপ পড়ছে রোগীদের ওপর।
জ্বরে আক্রান্ত ছেলেকে (১৫ বছর) নিয়ে এসেছেন স্বর্ণা বেগম। জানালেন, আসার পর থেকেই দেখছেন একটি ওয়াশরুমে তালা ঝোলানো। মাঝেমধ্যেই অন্যটির সামনে লাইন পড়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ আবার বাইরে থেকে দরজায় কড়া নেড়ে যাচ্ছেন। স্বর্ণা বলছিলেন, ‘এত নামকরা একটি হসপিটাল, সেখানে জরুরি বিভাগে মাত্র দুটি ওয়াশরুম। আর তার মধ্যে একটি তালাবদ্ধ। একসঙ্গে কয়েকজন রোগী এলেই পড়তে হবে ভোগান্তিতে।’






