বৈদ্যুতিক গাড়ি আনার আগে চাই চার্জিং স্টেশন

বাংলাদেশে ইলেকট্রিক ভেহিকল: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা শীর্ষক সেমিনার
দেশে পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক ভেহিকল (ইভি) খাতের বিপুল সম্ভাবনা দেখছেন অনেকে। কিন্তু কাঠামোগত বাধা মন্থর করে দিতে পারে এর প্রসার। এর মধ্যে অন্যতম বিদ্যুৎ, চার্জিং স্টেশন, জ্বালানি ও ডিপো সংকট। ইভি আনার আগেই জোর দিতে হবে চার্জিং স্টেশন বানানোয়।
আজ শনিবার ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) এবং বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে ইলেকট্রিক ভেহিকল: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদ।
তিনি বলছিলেন, ‘বর্তমানে দেশের পরিবহন খাত একাই মোট আমদানি করা পেট্রোলিয়ামের ৬৩.৪১ শতাংশ ব্যবহার করে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় এবং পরিবেশ রক্ষায় ইভি প্রযুক্তির দিকে যাওয়া সময়ের দাবি। বর্তমানে প্রায় ৬৭ লাখ ২৪ হাজার নিবন্ধিত যানবাহনের মধ্যে ৪ চাকার নিবন্ধিত ইভি মাত্র ৬৬৯টি। যদিও চলাচল করছে ৬০ লাখের মতো অনিয়ন্ত্রিত ও কাঠামোহীন ই-রিকশা। বৈদ্যুতিক যানবাহনগুলোর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ বেআইনিভাবে রাস্তায় চলাচল করছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত খাতে ৩০ শতাংশ ইভি অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যমাত্রা।’
ডিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে ইভি প্রসারের ক্ষেত্রে ৬টি বাধা চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো, দেশে বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াট হলেও তীব্র গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বর্তমানে অনেক শিল্পকারখানা তাদের উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র অর্ধেক ব্যবহার করতে পারছে। এই অবস্থায় ইভি চার্জিংয়ের বাড়তি চাপ সামলানো বড় চ্যালেঞ্জ।’
তাসকিন আহমেদ বলছেন, ‘রাজধানীতে প্রায় ৮ হাজার এবং সারাদেশে ৫৩ হাজারেরও বেশি বাস সচল থাকলেও সরকারি মালিকানাধীন বাস ডিপোর সংখ্যা দেশজুড়ে ৩০টিরও কম, যা বড় আকারের ই-বাস নামানোর ক্ষেত্রে প্রধান বাধা। দেশের মহাসড়ক ও গ্রামাঞ্চলে থ্রি-হুইলার, কার কিংবা বাণিজ্যিক ইভির জন্য প্রয়োজনীয় চার্জিং নেটওয়ার্ক এখনও গড়ে ওঠেনি। সাধারণ জ্বালানিচালিত গাড়ির তুলনায় ইভি কিনতে প্রাথমিকভাবে অনেক বেশি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। ব্যাটারির নিরাপত্তা মানদণ্ড যাচাই, টেস্টিং সেন্টার এবং পুরনো ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের জন্য দেশে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা নেই। বর্তমান সরকার স্থানীয় ইভি শিল্পকে উৎসাহিত করতে বড় ধরনের কর ছাড় ও প্রণোদনা দিচ্ছে। ইভি ও ই-বাইক সংযোজনে ২০৩১ সাল পর্যন্ত ভ্যাট ও শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে এবং হাইব্রিড গাড়ির ক্ষেত্রে এই সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত মিলবে।’
বৈদ্যুতিক যানবাহনগুলোর চার্জিং ফ্যাসিলিটি তৈরি করার জন্য জোর দিয়েছেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদ। বলেছেন, ‘কেউ যদি এই গাড়ি ব্যবহার করে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে চান তাহলে তার প্রথম চিন্তা আসবে চার্জ কোথায় দিবেন। তাই সবার আগে চার্জিং ফ্যাসিলিটি ঠিক করতে হবে। নয়তো উপকার হওয়ার পরিবর্তে দুর্ভোগ বাড়বে।’
সেমিনারে বাংলাদেশ অটোমোবাইলস অ্যাসেম্বলারস অ্যান্ড ম্যান্যফ্যাকচারারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএএএমএ) সভাপতি হাফিজুর রহমান খান মন্তব্য করেন, ‘ব্যবসায়ীদের কি করতে হবে, না করতে হবে— সেটা যদি রাষ্ট্র ঠিক করে দেয় তাহলে সবার জন্যই ভালো হবে এবং জনগণের জন্যেও ভালো হবে।’
বাংলাদেশ প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. এহসান বলেছেন, ‘আমাদের দেশে মোবাইল টাওয়ার হলে যেমন আশপাশের সবাই সুবিধা পান তেমন ইলেক্ট্রিক চার্জিং পয়েন্ট হলেও মানুষ সুবিধা পাবেন। আর এটাও মাথায় রাখা দরকার যে ইভি হয়ে গেলেই জ্বলানির ব্যবহার কমে যাবে এমন চিন্তা করা যাবে না।’
সেমিনারে বক্তব্য দিয়েছেন বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের চিফ ইঞ্জিনিয়ার মো. মোফিজুল ইসলাম। ‘৫ বছর আগেও আমাদের দেশে রাত ১১টার পর বিদ্যুতের ব্যবহার কমে যেত। কিন্তু বর্তমানে দিনে যেমন ব্যবহার হয় তেমনি রাতেও হয়। যার কারণে প্রতিনিয়তই বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছেই।’
সেমিনারে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান বলেছেন, ‘ইবির সম্ভাবনা আমাদের আছে। এই সম্ভাবনা কিভাবে কাজে লাগাব সেটা নিয়ে আমরা কাজ করছি। একটা ইভি শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। এই নীতিমালাটার মূল লক্ষ্য, আমদানি করা পেট্রোলিয়ামজাত জ্বালানি চালিত মোটরযানের সংখ্যা কমিয়ে আনা। এটা আমাদের এনার্জি সিকিউরিটির ক্ষেত্রে রিলেটেড। ইভি ব্যাটারি চার্জিং অবকাঠামো এবং সংযুক্ত প্রযুক্তি স্থানীয় উৎপাদনের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নকে উৎসাহিত করা। আমাদের আরেকটি বিষয় প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, গবেষক এবং দক্ষ কর্মীদের মধ্যে মানসম্মত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।’





