একশনএইডের সংলাপ
রাজনৈতিক দলের নীতি নির্ধারণে এখনো দৃশ্যমান নয় নারী

ছবি: আগামীর সময়
সব ধরনের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতের বিধান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো। ২০৩০ সালের মধ্যে তা নিশ্চিতে আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এর প্রতিফলন এখনো সীমিত। ফলে দলের নীতি নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীদের গুণগত ও অর্থবহ প্রভাব এখনো দৃশ্যমান নয়।
সোমবার (৮ জুন) ঢাকার একটি হোটেলে আয়োজিত এক সংলাপে এসব কথা উঠে আসে। সেখানে উপস্থাপন করা হয় ‘রাজনৈতিক দলগুলোর গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সম্পর্কিত অবস্থান’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল। ওয়েভ ফাউন্ডেশন এবং একশনএইড বাংলাদেশ যৌথভাবে এই সংলাপের আয়োজন করে।
জরিপে অংশ নেওয়া ৭২ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দলগুলোতে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্বের এই বিধান কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না
জাতিসংঘের নির্বাচনী সহায়তা প্রকল্পের অধীনে বাস্তবায়িত বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সংস্কারের জন্য জেন্ডার-সংবেদনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সিদ্ধান্তগ্রহণ কাঠামো শক্তিশালীকরণ ‘গ্রিপ’ প্রকল্পের আওতায় এই গবেষণাটি পরিচালনা করেন সানাইয়া ফাহিম আনসারি। সংলাপে এর সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করেন মানসুরা আখতার। দেশের ছয় বিভাগের ১১ জেলার মোট ১৯১ জন অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে গবেষণাটি তৈরি করা হয়েছে।
সংলাপের আলোচনায় উঠে এলো, নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকে শুধু সংরক্ষিত আসন বা কোটার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সকল স্তরে তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিতের দাবি।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ৮৭ দশমিক ৩ শতাংশ উত্তরদাতা রাজনৈতিক দলগুলোতে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্বের বিধান সম্পর্কে সচেতন। কিন্তু এর বড় অংশই মনে করেন, দলগুলো এই শর্ত পূরণে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সক্রিয় নয়। জরিপে অংশ নেওয়া ৭২ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দলগুলোতে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্বের এই বিধান কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। একই সঙ্গে আরপিও পর্যবেক্ষণ ও বাস্তবায়নে দেশের নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভূমিকা ও কাঠামোগত সক্ষমতা নিয়েও অংশীজনদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন— এই আইন বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশনের যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে এবং ৯ দশমিক ৯ শতাংশ মনে করেন কমিশনের আংশিক সক্ষমতা রয়েছে।
গবেষণায় রাজনৈতিক দল ও পরিবার পর্যায়ে নারীদের সক্রিয় রাজনীতি ও নেতৃত্বে আসার পেছনে বেশ কিছু প্রধান প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬০ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা পিতৃতান্ত্রিক দলীয় সংস্কৃতি এবং ৫৬ দশমিক ৩ শতাংশ উত্তরদাতা রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবকে প্রধান বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক চাপকে ৪৯ দশমিক ৩ শতাংশ এবং দলগুলোর ভেতরে সুনির্দিষ্ট গণতান্ত্রিক চর্চা না থাকাকে ৪৫ দশমিক ১ শতাংশ উত্তরদাতা অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন। নির্বাচন কমিশনের তদারকির সীমাবদ্ধতাকে কারণ মনে করেন ৩৯ দশমিক ৪ শতাংশ উত্তরদাতা।
তরুণ নারীদের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাগুলো আরও চ্যালেঞ্জিং। জরিপ বলছে, তরুণীদের রাজনীতিতে আসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা নিরাপত্তা ও অনলাইন সহিংসতার ভয়, এছাড়া পুরুষ-প্রধান রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সামাজিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, দলীয় সুযোগের অভাব এবং অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা।
গবেষণার তথ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সংলাপে জেন্ডার-সংবেদনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক সংস্কার জোরদার করতে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও কাঠামোগত সুপারিশ তুলে ধরা হয়। প্রথমত, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নিয়মিত অডিটের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর জেন্ডার-সংক্রান্ত বিধান বাস্তবায়ন যাচাই করা এবং জেন্ডার-ভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণসহ নারী প্রতিনিধিত্ব ও প্রার্থী মনোনয়ন বিষয়ে বাধ্যতামূলক বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, কেবল সাধারণ কমিটিতে পদ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, দলের মূল প্রার্থী মনোনয়ন কমিটিসহ নীতি-নির্ধারণী ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল পদে নারীদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক মনোনয়ন প্রক্রিয়া গড়ে তোলার পাশাপাশি যে দলগুলো সরাসরি আসনে অধিক সংখ্যায় নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেবে, তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে বিশেষ প্রণোদনা প্রবর্তন এবং নারী প্রার্থীদের জন্য মনোনয়ন ফি কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া, দলের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা এবং নতুন নারী নেতৃত্ব বিকাশের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে দলগুলোর ভেতরেই বিশেষ রাজনৈতিক মেন্টরশিপ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বললেন, ‘বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন কেবল নির্বাচন আয়োজন ও পরিচালনার দায়িত্বই পালন করে না; বরং জনগণের ইচ্ছা ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।’
তিনি বিশেষভাবে নারী অধিকার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে কাজ করা সংগঠন ও ব্যক্তিদের হতাশ না হওয়ার আহ্বান জানান এবং একটি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে সকলকে যৌথভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।
স্বাগত বক্তব্যে একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলছিলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য কেবল নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল বা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ত্রুটি বা সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা নয়, বরং সামনের দিনগুলোতে কীভাবে সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে, সে বিষয়ে একটি টেকসই কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা।’
উন্মুক্ত আলোচনায় বিএনপি, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও এবি পার্টির প্রতিনিধিসহ নির্বাচন কমিশন, জাতিসংঘ সংস্থা, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, আইনজীবী, গবেষক ও যুব প্রতিনিধিরা অংশ নেন।




