ডিএনসিসির ডাস্টবিন রক্ষায় তালাচাবি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গয়নার বাক্স নয়, ব্যাংকের ভল্ট নয়, এমনকি কোনো মহামূল্যবান সম্পদও নয়। আসলে ময়লার আস্তাকুঁড়, যা পরিচিত ডাস্টবিন নামে। তবুও এর বাইরে ঝুলছে শিকল-তালা। না, ময়লা চুরি হয় না। চুরি যায় এসব ময়লার বাক্সের ঢাকনা। আবার কখনো কখনো পুরো ডাস্টবিনটাই হয়ে যায় হাওয়া। রাস্তার টোকাই বা মাদকসেবীরা নিয়ে যায় বর্জ্য ফেলার এসব বাক্স। আর তা আটকাতেই এমন উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। সংস্থাটি সাম্প্রতিককালে বসানো তাদের সব প্লাস্টিকের ডাস্টবিনেই আজকাল দিয়ে রাখছে তালা। তবে এতে ডাস্টবিন চুরি কমলেও মানুষের ময়লা ফেলার আগ্রহ কমেছে।
রাজধানীর রামপুরার মহানগর প্রজেক্ট আবাসিক এলাকা। হাতিরঝিল থেকে ঢুকতেই ৭ নম্বর রোডের মুখে চোখে পড়ে হলুদ রঙের একটি ডাস্টবিন, যেটির সঙ্গে ঝুলছে তালা-শিকল। ঢাকনা ওল্টানোর পর দেখা গেল তলায় জমে আছে কিঞ্চিৎ ময়লা। বর্জ্য সংগ্রহকারী পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাও জানালেন, হলুদ বা সবুজ রঙের এসব ডাস্টবিনে ময়লা জমা পড়ে কম। কেন?
কারণ হিসেবে পথচারী আফরোজা খানম বললেন, ‘এই বাক্সগুলো ঢাকনা দিয়ে ঢাকা থাকে। ঢাকনা হাত দিয়ে তুলে ময়লা ফেলতে হয়। এ কারণে অনেকেই উদ্বুদ্ধ হয় না ময়লা ফেলতে। অন্যসব জায়গায় দেখি ডাস্টবিনের ওপরে বা পাশে কিছুটা ফাঁকা থাকে, যেখান দিয়ে ফেলা হয় ময়লা। এ ডাস্টবিনে তেমন সুযোগ নেই।’
এলাকার আরেক বাসিন্দা রাকিব তুলে ধরলেন একই অসুবিধার চিত্র। আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘সাধারণত দোকানিরা তাদের কিছু ভারী বর্জ্য বা জিনিসপত্র এখানে ফেলে। পথচারী বা সাধারণ মানুষ তেমন ময়লা ফেলে না বোধ হয়। আমি নিজেও ফেলি না ঢাকনা ওঠানোর হ্যাসেলের (ঝামেলা) জন্য।’
আবার এসব ডাস্টবিন বসানোর জন্য সাধারণত এমন জায়গা বেছে নেওয়া হয়, যেখানে আশপাশে থাকে কোনো স্থাপনা বা শিকল আটকানোর জন্য সহায়ক বস্তু। এমন সমীকরণের কারণে নির্দিষ্ট দূরত্বে ডাস্টবিন বসাতে পারছে না ডিএনসিসি। ফলে একদিকে মানুষের আগ্রহের অভাবে এসব ডাস্টবিনে যেমন ময়লা কম জমা হচ্ছে, অন্যদিকে নির্দিষ্ট দূরত্বে ডাস্টবিনের অভাবে মানুষ যত্রতত্র ময়লা ফেলছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, তালা-শিকল ব্যবহার করা হয় এমন সবুজ ও হলুদ রঙের ডাস্টবিনের সংখ্যা ডিএনসিসিতে পাঁচশর বেশি। এক থেকে দেড় মাস আগে এসব ডাস্টবিন বসায় সংস্থাটি। পরে ঢাকনা এবং ডাস্টবিন চুরি ঠেকাতে তালা-শিকলের আশ্রয় নেয় ঢাকা উত্তর। রাজধানীর বেশ কিছু দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ডাস্টবিনে ব্যবহৃত এসব তালা এবং এক থেকে দেড় ফুট দৈর্ঘ্যের শিকলের বাজারদর ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার মতো। ফলে এসব ডাস্টবিনে একদিকে যেমন বর্জ্য ফেলার আগ্রহ কমেছে মানুষের, আবার এর সুরক্ষায় খরচও বেড়েছে সংস্থাটির। বর্তমান বাজারদরে এসব ডাস্টবিনের পেছনে তালা-শিকল বাবদ ডিএনসিসির খরচ ধরা যেতে পারে ৩ লাখ টাকার মতো। তবে বর্জ্য বিভাগের এক কর্মকর্তার ভাষ্য, আরও বেশি টাকার তালা-শিকল ব্যবহার করে সংস্থাটি।
যদিও ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী মনে করেন, চুরি ঠেকাতে যথেষ্ট নয় এসব তালা-শিকল। কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন ডাস্টবিনে আরও উন্নতমানের তালা-শিকল লাগাতে। আগামীর সময়কে ডিএনসিসির এ কর্মকর্তা বললেন, ‘তালা-শিকল না দিলে একরাতেই সব ডাস্টবিন চুরি হয়ে যাবে। বাধ্য হয়ে এ ব্যবস্থা।’ তবে এসব ডাস্টবিনে পথচারীরা বর্জ্য কম ফেলছে— এমন তথ্য মানতে নারাজ তিনি।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, কম খরচে কীভাবে নাগরিকদের ভালো সেবা দেওয়া যায় সেই চিন্তা করতে হবে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানকে। কিন্তু এখানে হচ্ছে উল্টোটা, খরচ বেশি হচ্ছে। অন্যদিকে মানুষও সেই সেবায় মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আকতার মাহমুদ আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘এমন উদ্যোগ আগেও নিয়েছে সিটি করপোরেশন। কিন্তু এটায় একদমই কাজ হয়নি। এবার তারা চুরি ঠেকাতে ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু এখন তো তালা-শিকলসহ চুরি হয়ে যাবে।’
এ সমস্যা সমাধানে ডাস্টবিনের দায়িত্ব কাছের কোনো দোকানি বা ব্যক্তিকে দিতে হবে বলে মত এ নগর পরিকল্পনাবিদের। বললেন, পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিকভাবে স্কুল এবং বাসা থেকে ডাস্টবিনে ময়লা ফেলার অভ্যাস গড়ে তোলার শিক্ষা দিতে হবে শিশুদের।



