একাকী চিকিৎসকের নিস্তব্ধ মৃত্যু
- পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, তিন দিন আগেই হয়েছিল মৃত্যু
- পাশেই ছিল চিপসের প্যাকেট ও মানিব্যাগ
- বন্ধ কক্ষেও চলছিল টেবিল ফ্যান

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
এলোমেলো কক্ষে শতাধিক বই, চলছিল টেবিল ফ্যান। খাটের ওপর মানিব্যাগ, চিপসের বক্স। মরদেহ খাটের ওপর বসা অবস্থায়। তবে মাথার অংশ ছিল চেয়ারের ওপর। মাথায় গামছা প্যাঁচানো, হাতে টিস্যু, পরনে মেক্সি। বিছানাও ছিল টানটান।
বলছিলাম আজিজ সুপার মার্কেট ভবনের ১৪ তলা থেকে উদ্ধার হওয়া অর্ধগলিত চিকিৎসক ফারা ফেরদৌসের (৩২) কথা। তিনি ৩৯তম বিসিএসের একজন চিকিৎসক। বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) কার্ডিওভাসকুলার বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ কোর্স করছিলেন।
গতকাল শুক্রবার দুপুরে স্বজনদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শাহবাগ থানা পুলিশ ৮/এম নম্বর ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে তার মরদেহ উদ্ধার করে। পরে আইনি প্রক্রিয়া শেষে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) একরামুল হক আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, দুপুরে স্থানীয় লোকজন ভবনের ওই তলার একটি কক্ষ থেকে দুর্গন্ধ বের হতে দেখে পুলিশকে খবর দেয়। পরে মৃত ওই চিকিৎসকের ছোট বোন নুঝুলা ফেরদৌসের উপস্থিতিতে কক্ষটির দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করা হয়।
‘কক্ষের ভেতরে খাটের ওপর বসা অবস্থায় টেবিলের ওপর মাথা রাখা অবস্থায় ফারা ফেরদৌসের মরদেহ পাওয়া যায়। দীর্ঘ সময় ধরে মরদেহ পড়ে থাকায় তা অর্ধগলিত অবস্থায় ছিল।’—যোগ করেন তিনি।
মরদেহ উদ্ধারের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে এসআই একরামুল হক বলছিলেন, ‘শরীর ফুলে ও পচে যাওয়ায় বাহ্যিকভাবে কোনো আঘাতের চিহ্ন বা অন্য কোনো আলামত শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এলোমেলো ঘরে শতাধিক বই ছড়িয়ে ছিল। খাটে ছিল মানিব্যাগ ও চিপসের বক্স, টেবিলে ছিল লাইটার ও সিগারেট। মরদেহের পরনে ছিল মেক্সি, মাথায় গামছা প্যাঁচানো। প্রাথমিকভাবে স্ট্রোক বা ঘুমের ওষুধ সেবনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের অপেক্ষা করতে হবে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গত ২৩ তারিখে ফারা ফেরদৌসের সঙ্গে তার ছোট বোনের সর্বশেষ কথা হয়েছিল। এরপর থেকে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। তার ছোট বোনও চিকিৎসা বিষয়ে উচ্চতর কোর্সে অধ্যয়নরত। কয়েক দিন ধরে কক্ষটি বন্ধ থাকলেও শুক্রবার বিকালে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নজরে আসে।
২০২২ সাল থেকে আজিজ সুপার মার্কেটের ১৪ তলার ওই ফ্ল্যাটে একাকী ভাড়া থাকতেন ফারা। তার গ্রামের বাড়ি খুলনা জেলার ফুলতলা উপজেলায়। বাবা অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক আব্দুর রশিদ। দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন বড়। উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণের কারণে তিনি রাজধানীতে একাই বসবাস করতেন। তিনি অবিবাহিত ছিলেন।
সুরতহালে যা উল্লেখ করা হয়
চিকিৎসকের মরদেহের প্রতিবেদন করেছে শাহবাগ থানার এসআই মারুফা। তিনি সুরতহালে উল্লেখ করেন, মরদেহর মাথার অংশ স্বাভাবিক। উভয় চোখ মৃত অবস্থায় খোলা, বাইরে দৃশ্যমান। নাক ও উভয় কান স্বাভাবিক। মুখ খোলা, জিহ্বা বাইরে। এ ছাড়া হাত-পা, বুক-পিঠসহ শরীরের সব অংশই স্বাভাবিক রয়েছে। মুখমন্ডলসহ সমস্ত শরীরের আশিংক পচন ধরেছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে থেকে চামড়া ওঠা দৃশ্যমান।
পরিবারের সঙ্গে এই চিকিৎসকের কোনো দূরত্ব ছিল কি না, তিনি কেন অবিবাহিত ছিলেন এবং তিন দিন ধরে যোগাযোগ না থাকলেও কেন তার খোঁজ নেওয়া হয়নি। এসব বিষয়ে জানতে তার ছোট বোন নুঝুলা ফেরদৌস ও বাবা আব্দুর রশিদকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাদের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
শাহবাগ থানার ওসি মনিরুজ্জামান আগামীর সময়কে বললেন, ‘ওই নারী চিকিৎসকের সঙ্গে তিন দিন ধরে তার পরিবারের যোগাযোগ ছিল না। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তিনি স্ট্রোক করে মারা যেতে পারেন। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে। এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।’





