সাইকেলের লেন অন্য যানের দখলে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউ সড়ক। আছে সাইকেলের জন্য নির্ধারিত লেন। সেখানে সাইকেল থাকার কথা থাকলেও রিকশা, প্রাইভেট কার, সিএনজি ও মোটরসাইকেল পার্ক করা হচ্ছে। ফলে লেনটি ব্যবহার করতে পারছেন না সাইকেলচালকরা। বাধ্য হয়ে তাদের নামতে হচ্ছে মূল সড়কে। সেখানে চলছে বাস, ট্রাকসহ নানা ধরনের ভারী যানবাহন। এতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে দুঘর্টনার ঝুঁকি।
ছয় বছর আগে বিপুল উৎসাহে মানিক মিয়া এভিনিউয়ে প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ সাইকেল লেন তৈরি করা হয়। বর্তমানে লেনটির নীল-সাদা রঙের চিহ্নও অনেকটা ঝাপসা হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও রঙের আস্তরণ উঠে গেছে। ফলে লেনটি সাইকেলের জন্য নির্ধারিত কি না, তা বোঝাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সোমবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুরো সাইকেল লেনজুড়ে রিকশা, প্রাইভেট কার, সিএনজি ও মোটরসাইকেল পার্ক করা আছে। কোনো গাড়ি চলে গেলে মুহূর্তেই অন্য একটি গাড়ি এসে দখল করছে সেই জায়গা।
এই সাইকেল লেন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক। পরে সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলামের মেয়াদে এটি বাস্তবায়ন করা হয়।
তখন তৎকালীন মেয়র আতিকুল বলেছিলেন, ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ‘জো বাইক’ চালু করা হচ্ছে। ধীরে ধীরে এই সেবা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।
‘রাজধানীর পরিবেশ ও স্বাস্থ্য ভালো রাখতে হলে সাইকেল ব্যবহারে অভ্যস্ত হতে হবে। রাস্তা হকারদের জন্য নয়। সাইকেল লেনকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে’— যোগ করেন তৎকালীন মেয়র।
সাইকেল লেন তৈরির আগে এই জায়গায় বিভিন্ন ধরনের হকার ও ফাস্টফুডের দোকান বসত। সেগুলো উচ্ছেদ করেই তৈরি করা হয় সাইকেল লেন। বর্তমানে খাবারের দোকান নেই ঠিকই, কিন্তু সাইকেলচালকরাও লেনটি ব্যবহার করতে পারছেন না। বদলেছে শুধু দখলের ধরন। এখন লেনের দখলদার অন্যান্য যানবাহন।
লেনের ভেতর রিকশা নিয়ে বসে ছিলেন চালক হাফিজউদ্দীন। এটি সাইকেল চলাচলের পথ কি না— জানতে চাইলে তিনি তা জানেন না বলে জানান। তার ভাষ্য, রাস্তার পাশে যানবাহনের চাপ কম এবং গাছের ছায়া থাকায় তারা এখানে এসে বিশ্রাম নেন।
‘অনেক দিন ধরেই তো এখানে রিকশা রাখি, কেউ তো কখনো মানা করেনি। তা ছাড়া অন্য গাড়িগুলোও তো এখানেই রাখা হয়’— বলছিলেন রিকশা চালক।
সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিলেন আব্বাস আলী। চাকরির কারণে প্রতিদিন তাকে পিলখানা এলাকায় যেতে হয় এবং তিনি সাইকেলেই যাতায়াত করেন। কিন্তু সাইকেল লেনের কোনো সুবিধা পান না।
তার ভাষ্য, ‘অন্য গাড়িগুলো সাইকেলের তুলনায় অনেক বড় ও ভারী, তাদের গতিও বেশি। তারা যখন দ্রুত গতিতে ওভারটেক করতে যায়, তখন আমাদের জীবনের চরম ঝুঁকিতে পড়তে হয়। যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’
একই সড়কে সাইকেল চালাচ্ছিলেন হাসিব আলী। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘মাত্র এক কিলোমিটার লেন আছে, তাহলে কি বাকি পথ সাইকেল কাঁধে নিয়ে হেঁটে যাব? আর সাইকেল লেন থেকে কোনো গাড়িকে সরতে বললে চালকেরা উল্টো তেড়ে আসে। আবার যানজট লাগলে অন্য সব গাড়ি সাইকেল লেনে ঢুকে পড়ে। এটি শুধু নামেই সাইকেল লেন, আমরা বাস্তবে কিছুই ব্যবহার করতে পারি না।’
শুধু মানিক মিয়া এভিনিউ নয়, রাজধানীর আগারগাঁওয়ের সাইকেল লেনের চিত্রও প্রায় একই। সেখানে লেনজুড়ে রয়েছে অবৈধভাবে রাখা যানবাহন ও অস্থায়ী দোকানপাট। অনেক জায়গায় লেনের সীমানা ছাড়িয়ে মূল সড়কের অংশও দখল করেছে অবৈধ দোকান। ফলে সেখানেও নির্ধারিত লেনে স্বাভাবিকভাবে সাইকেল চালাতে পারছেন না রাইডাররা।
বাংলাদেশ সাইকেল লেন বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি আমিনুল ইসলাম টুববুস মনে করেন, সাইকেল সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো লেন রক্ষা ও সচেতনতা তৈরিতে আরও সক্রিয় হলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
দিন দিন ঢাকা ঘনবসতিপূর্ণ হচ্ছে, অথচ সে তুলনায় সড়ক বাড়ছে না। তার ভাষ্য, ‘এই শহরে আমাদের যাতায়াতের একমাত্র স্বাধীন ও পরিবেশবান্ধব মাধ্যম সাইকেল। লেনের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে গণপরিবহনের চেয়ে কম সময়ে যাতায়াত করা সম্ভব হতো। এ ছাড়া পথচলতি মানুষ প্রতিনিয়ত বিষাক্ত ধোঁয়ার শিকার হচ্ছে। তাই কর্তৃপক্ষের উচিত লেন বাড়ানো ও সুরক্ষার দিকে নজর দেওয়া।’
সাইকেল ব্যবহারে মানুষের আগ্রহ থাকলেও সঠিক পার্কিং ব্যবস্থা না থাকাকে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘অন্যান্য গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা থাকলেও সাইকেলের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেই, বরং নানাভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়।’
চলতি অর্থবছরে সাইকেলের যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক বাড়ানোর বিষয়টিও সাইকেল ব্যবহারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বাইসাইকেলের যন্ত্রাংশ ‘ফ্রি হুইল’ আমদানিতে শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক।
‘দেশে যারা নিয়মিত সাইকেল চালান, তাদের বড় অংশই মধ্যবিত্ত। আর কিছু শৌখিন মানুষ শখে সাইকেল চালান। তাই এই পরিবেশবান্ধব যানটিতে শুল্ক বাড়ানো মোটেও উচিত হয়নি। তা ছাড়া অন্যান্য পণ্যের নির্দিষ্ট বাজারমূল্য নির্ধারিত থাকলেও সাইকেলের ক্ষেত্রে তা নেই, যার সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো দামে সাইকেল বিক্রি করছেন’— যোগ করেন আমিনুল ইসলাম।
সাইকেল লেনগুলো কার্যকর রাখতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রাকিবুল হাসান। তিনি জানান, ডিএমপিকে কঠোর নজরদারির মাধ্যমে সাইকেল লেনে অবৈধ পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে জরিমানা করতে হবে। পাশাপাশি চালকদেরও সড়ক ব্যবহারে সংবেদনশীল হতে হবে।
পরিবহন ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং বুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান মনে করেন, বিচ্ছিন্নভাবে সাইকেল লেন তৈরি করে এর সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। তার মতে, দেশের পরিবহন পরিকল্পনায় ‘অ্যাক্টিভ ট্রান্সপোর্ট মোড’, অর্থাৎ সাইকেল ও হাঁটার মতো পরিবহনব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘যানবাহনকেন্দ্রিক পরিকল্পনা ও নীতিতেই আমাদের পুরো মনোযোগ। পথচারী কিংবা একটি সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থার মধ্যে যে ‘অ্যাক্টিভ ট্রান্সপোর্ট মোড’ আনা প্রয়োজন, সেটি আমাদের পরিকল্পনায় আসছে না। ব্যক্তিগত বা সাময়িক উদ্যোগে মাঝে মাঝে সাইকেল লেন করার চেষ্টা দেখা গেলেও তা সফল করতে হলে সমন্বিত ‘মাস্টার প্ল্যান’-এ অ্যাক্টিভ ট্রান্সপোর্ট মোডকে যুক্ত করতে হবে। আমরা গাড়ির গতি বাড়াতে ও ম্যাস ট্রানজিট নিয়ে অনেক কাজ করলেও অ্যাক্টিভ ট্রান্সপোর্ট মোড এখনো দুর্বল অবস্থায়ই রয়ে গেছে।’
ঢাকার মিশ্র ট্রাফিক ব্যবস্থায় সাইকেলচালকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন বলেও উল্লেখ করেন অধ্যাপক হাদিউজ্জামান।
তার ভাষ্য, ‘ঢাকা শহরে মূলত মিশ্র ট্রাফিক ব্যবস্থা বিদ্যমান। এখানে সব ধরনের যানবাহন একই রাস্তায় চলাচল করে। এই সরু রাস্তায় সাইকেল লেন করা সম্ভব নয়। প্রশস্ত রাস্তার বাইরে গিয়ে সাইকেলে যাতায়াত চালকদের জন্য খুব বেশি আরামদায়ক বা নিরাপদ হবে না। সাইক্লিস্টরা অনেকটা ঝুঁকি নিয়েই সাইকেল চালাচ্ছে।’
‘এর জন্য আলাদা সাইকেল লেনের সঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ নেটওয়ার্ক প্রয়োজন। কেবল মানিক মিয়া এভিনিউ পার হয়ে সাইকেল চালককে ফের সেই মিশ্র ট্রাফিকের ঝুঁকিতেই পড়তে হচ্ছে। ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থা মূলত সাইকেলবান্ধব নয়। তাই কেবল বিক্ষিপ্তভাবে সাইকেল লেন চালু করলে তা কখনোই টেকসই হবে না। এজন্য একটি সম্পূর্ণ মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন জরুরি’— যোগ করেন অধ্যাপক হাদিউজ্জামান।






