গ্যাস দুর্যোগ
গাড়ি চলছে না, চুলাও জ্বলছে না
- ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের অভাবে সৃষ্টি হয়েছে শত শত গাড়ির দীর্ঘ সারি
- অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে খাবার কিনে এনেছে বাইরে থেকে

রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নিতে দীর্ঘ লাইন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেট কারসহ অন্যান্য যানবাহনের চালকরা। ছবিটি গতকাল কল্যাণপুর থেকে তোলা। ছবি: শামীম-উস-সালেহীন
রাজধানীতে গ্যাসের সংকট এখন আর শুধু সিএনজি ফিলিং স্টেশনেই সীমাবদ্ধ নেই; এর তীব্র প্রভাব পড়েছে বাসাবাড়িতেও। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা আগুন জ্বলছে না চুলায়, কোথাও আবার গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে, রান্না করতে সময় লাগছে স্বাভাবিক তুলনার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। একই সময়ে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের অভাবে সৃষ্টি হয়েছে শত শত গাড়ির দীর্ঘ সারি, কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে স্টেশন। সব মিলিয়ে গ্যাস সংকটে রাজধানীর জনজীবনে নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, রামপুরা, বাড্ডা, খিলগাঁও, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, উত্তরা ও মহাখালী এলাকার বিভিন্ন বাসাবাড়ি এবং কয়েকটি সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র।
সকালের নাশতা থেকে শুরু করে দুপুর ও রাতের খাবার— সবক্ষেত্রেই গ্যাসের অভাবে বিপাকে পড়েছেন নগরবাসী। অনেক পরিবারের সদস্যকে নির্ধারিত সময়ের পর খেতে হয়েছে খাবার। কেউ বাধ্য হয়ে খাবার কিনে এনেছেন বাইরে থেকে, আবার অনেকে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করলেও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচ নিয়ে প্রকাশ করেছেন উদ্বেগ।
মিরপুর-১১ নম্বরের বাসিন্দা শারমিন আক্তার জানালেন, ভোরে উঠে নাশতা বানাতে গিয়ে দেখেন চুলায় গ্যাসই নেই। প্রায় ২ ঘণ্টা অপেক্ষার পরও গ্যাস না এলে শেষে বাচ্চাদের বিস্কুট খাইয়ে পাঠাতে হয়েছে স্কুলে। রামপুরার বনশ্রী এলাকার গৃহিণী নাজমা বেগমের আক্ষেপ, গ্যাসের চাপ এত কম যে এক হাঁড়ি ভাত রান্না করতে দেড় ঘণ্টা লাগে। রান্না শেষ করতেই গড়িয়ে যায় দুপুর। এ ঘটনা এখন নিত্যদিনের। একই অভিযোগ গৃহকর্মী রহিমা বেগমের। তার ভাষ্য, ‘একটি বাসার রান্না শেষ করতেই অনেক সময় লেগে যাচ্ছে। এরপর অন্য বাসায় দেরি হয়ে যাচ্ছে। কথা শুনতে হচ্ছে সব জায়গা থেকেই।
এদিকে মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মাহবুব হোসেন ক্ষোভ নিয়ে বললেন, ‘মাস শেষে গ্যাস বিল ঠিকই দিতে হচ্ছে; কিন্তু যখন প্রয়োজন তখন গ্যাস পাওয়া যায় না। এটা তো কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়।’
অন্যদিকে একই সংকটের চিত্র দেখা গেছে রাজধানীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও। মহাখালী, তেজগাঁও, মিরপুর ও যাত্রাবাড়ীর কয়েকটি স্টেশনে সকাল থেকেই দেখা যায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও পিকআপের দীর্ঘ সারি। কোথাও গ্যাসের চাপ কম, কোথাও আবার সরবরাহ বন্ধ থাকায় সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে স্টেশন।
মহাখালীতে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অটোরিকশাচালক মো. জয়নাল মিয়া জানালেন, দু-তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পাচ্ছেন না গ্যাস । রাস্তায় বের হতে দেরি হচ্ছে, ফলে কমে যাচ্ছে আয়ও। ‘দুটি স্টেশন ঘুরে এখানে এসেছি। কোথাও গ্যাস নেই, কোথাও আবার এত কম চাপ যে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে’— দীর্ঘশ্বাস ফেলে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করলেন প্রাইভেট কারচালক রফিকুল ইসলাম।
ফিলিং স্টেশনগুলোর সামনে গাড়ির দীর্ঘ সারির কারণে গতকাল ছুটির দিনেও রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে সৃষ্টি হয় যানজটের। কর্মদিবস হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত বলে মনে করছেন অনেকে। বিশেষ করে মহাখালী, তেজগাঁও, মিরপুর ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় একটি লেনজুড়ে গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকায় চলাচল ব্যাহত হয়েছে অন্য যানবাহনের।
রাজধানীর কয়েকটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা জানালেন, সরবরাহ কম থাকায় চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কোনো কোনো সময় গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকে যে, স্বাভাবিক গতিতে গাড়িতে ভরা যায় না গ্যাস।
নগরবাসীর অভিযোগ, কয়েক দিন ধরে গ্যাস সংকট হয়েছে আরও তীব্র। বাসাবাড়িতে রান্নার সমস্যা, ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ অপেক্ষা এবং এর প্রভাবে সড়কে বাড়তি যানজট— সব মিলিয়ে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা হয়ে পড়ছে দুর্বিষহ। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবিও জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।




