শুল্কমুক্ত সুবিধার অপব্যবহার
নয়াবাজারে ১০ ট্রাক ডুপ্লেক্স বোর্ড আটক

সংগৃহীত ছবি
খুলনার বন্ডেড প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার কথা ছিল শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা ডুপ্লেক্স বোর্ড। কিন্তু নির্ধারিত গন্তব্যে না গিয়ে রাতের আঁধারে ট্রাকগুলো ঢুকে পড়ে পুরান ঢাকার নয়াবাজারে। সেখানে স্থানীয় আড়তে পণ্য খালাস করে খোলাবাজারে বিক্রির প্রস্তুতি চলছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৭৩ মেট্রিক টন ডুপ্লেক্স বোর্ডবোঝাই ৯টি ট্রাকসহ মোট ১০টি ট্রাক আটক করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।
আজ শনিবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
কর্মকর্তারা জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নয়াবাজার এলাকায় বন্ড সুবিধায় আমদানি করা পণ্য খালাস ও বিক্রির প্রস্তুতির খবর পাওয়া যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক-১-এর নেতৃত্বে একটি দল বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেয়। অভিযানে র্যাব-১০ ও পুলিশের লালবাগ বিভাগ সহযোগিতা করে। পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়।
অভিযানের সময় নয়াবাজারমুখী ১০টি ট্রাকের বহর কাস্টমস গোয়েন্দার উপস্থিতি টের পায়। এ সময় একটি ট্রাক দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। পরে নয়াবাজারে আগে থেকেই অবস্থানরত এবং পণ্য বিক্রির প্রস্তুতিতে থাকা আরও একটি ট্রাক শনাক্ত করে আটক করা হয়। সব মিলিয়ে ১০টি পণ্যবোঝাই ট্রাক কাস্টমস গোয়েন্দার নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সম্ভব হয়। পালিয়ে যাওয়া ট্রাকটি শনাক্ত ও আটকের চেষ্টা চলছে।
প্রাথমিক আমদানি ও পরিবহন নথি অনুযায়ী, ভারতের মেহালি পেপার্স প্রাইভেট লিমিটেড থেকে ডুপ্লেক্স বোর্ডগুলো খুলনার শ্রী ফ্লেক্সোপ্যাক লিমিটেডের নামে আমদানি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা তেলিগাতি, কুয়েট, আড়ংঘাটা, খুলনা।
পণ্যগুলোর শুল্কায়ন হয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে। পণ্য খালাসের দায়িত্বে ছিল এম এ আজাদ অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড এবং পরিবহনের দায়িত্বে ছিল ডেল্টা ট্রান্সপোর্ট সার্ভিস।
কাস্টমস গোয়েন্দার তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম থেকে খুলনাগামী পণ্যবাহী ট্রাকের প্রচলিত বাইপাস রুট হলো কাঁচপুর, সাইনবোর্ড, পোস্তগোলা, মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে, পদ্মা সেতু হয়ে খুলনা। অথচ নয়াবাজার, রায়সাহেব বাজার ও তাঁতীবাজার এ রুটের বাইরে এবং খুলনাগামী স্বাভাবিক পথের বিপরীত দিকে অবস্থিত। ফলে নির্ধারিত রুট ছেড়ে নয়াবাজারে ট্রাকগুলোর প্রবেশকে গোপন সংবাদের প্রাথমিক সত্যতার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে দেখছে কাস্টমস গোয়েন্দা।
বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা কাঁচামাল সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত কারখানা বা গুদামে নিয়ে উৎপাদন কাজে ব্যবহারের বিধান রয়েছে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া এসব পণ্য অন্য গুদাম বা আড়তে স্থানান্তর, খোলাবাজারে বিক্রি কিংবা অনুমোদিত উৎপাদনের বাইরে ব্যবহার করা হলে তা বন্ড সুবিধার শর্ত লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
কাস্টমস গোয়েন্দা সূত্র জানায়, নয়াবাজারের একটি আড়তে আটক পণ্যগুলো খালাস করে বিক্রির প্রস্তুতি চলছিল—এমন প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট আড়ত ও ব্যক্তির নাম প্রকাশ করা হয়নি।
আটক ট্রাকগুলোর মালিকানা ও নিবন্ধন, ট্রাকপ্রতি পণ্যের পরিমাণ, প্যাকেজ সংখ্যা, পরিবহন সিলের অখণ্ডতা এবং আমদানিসংক্রান্ত নথি যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি আমদানি ঘোষণা, চালানপত্র, প্যাকিং তালিকা, বন্ড লাইসেন্স ও পণ্য ব্যবহারের অনুমতিপত্রও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম থেকে ট্রাকগুলো কখন ছেড়েছে, কখন ঢাকায় প্রবেশ করেছে, নয়াবাজারের কোন আড়তে পণ্য নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল এবং আমদানিকারক, পণ্য খালাসকারী প্রতিষ্ঠান ও পরিবহনকারীর ভূমিকা কী ছিল—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
একই সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া ট্রাকটির অবস্থান শনাক্ত, সম্ভাব্য ক্রেতা ও আড়তদারদের চিহ্নিত এবং এর আগে একই পদ্ধতিতে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি হয়েছে কি না, তা অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
কাস্টমস গোয়েন্দা জানিয়েছে, তদন্তে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার, নির্ধারিত গন্তব্য পরিবর্তন, অবৈধভাবে পণ্য খালাস কিংবা খোলাবাজারে বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রচলিত কাস্টমস ও বন্ডসংক্রান্ত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে এ ঘটনায় সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণও নিরূপণ করা হবে।







