পুলিশ ভয় পেলে মানুষকে অভয় দেবে কে
- ২১ মাসে হামলায় আহত এক হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য
- জনআস্থা ফেরানোই বড় চ্যালেঞ্জ— বলছেন বিশেষজ্ঞরা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
খুলনায় দায়িত্ব শেষে ফেরার পথে পুলিশ পরিদর্শককে চাপাতি দিয়ে কোপানো, নোয়াখালীতে তদন্তে গিয়ে পাঁচ পুলিশ সদস্যের আহত হওয়া, বরিশালে থানায় ঢুকে পুলিশকে মারধর কিংবা সাভারে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) উপপরিদর্শক আলতাফ হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। খোদ পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন হামলায় আহত হয়েছেন ৪০০ পুলিশ সদস্য।
২০২৫ সালে আহত হয়েছিলেন ৬০১ জন। সব মিলিয়ে ২১ মাসে হামলায় আহত পুলিশের সংখ্যা এক হাজারের বেশি। সদর দপ্তর থেকে পুলিশ সদস্যদের নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়ে রেঞ্জ, মহানগর এবং ইউনিটপ্রধানদের কাছে বিশেষ বার্তা পাঠানোর পরও এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে নানা প্রশ্ন উঠছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে— যাদের হাতে মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্ব, তারাই যদি হামলার শিকার হন, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণও হারান, রাতে একা চলাচল না করতে নির্দেশনা পান— তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?
অপরাধবিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। পুলিশের প্রতি আস্থার সংকট, ভাবমূর্তির অবনতি, কাঠামোগত দুর্বলতা, আইনপ্রয়োগে অসংগতিসহ নানা বিষয় পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে। সংকটের কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হতে পারে। একই সঙ্গে পুলিশের অভ্যন্তরীণ কোনো সংকট, ক্ষোভ কিংবা হতাশার বিষয় থাকলে তাও আমলে নিতে হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মো. সায়েদুর রহমান আগামীর সময়কে বলেছেন, অস্ত্রসহ পুলিশ সদস্যদের একা চলাফেরায় সবসময়ই নিষেধ করা হয়। খুলনার কয়েকটি উপজেলায় বিশেষ অভিযান চলছে। খুলনার পুলিশ সুপারও তার রুটিন দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে পুলিশ আগের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয়। আত্মরক্ষার্থে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে আইনই পুলিশকে বলপ্রয়োগের ক্ষমতা দিয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী তা প্রয়োগ করার বিষয়ে পুলিশ সদস্যদের বলা আছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেছেন, আত্মরক্ষার্থে পুলিশকে আইন অনুযায়ী বলপ্রয়োগের কথা বলা আছে। তবে কোনো সদস্যদের দায়িত্ব তার ঊর্ধ্বতনরা নিচ্ছেন না। কোনো ঘটনায় তদন্ত হলে ঊর্ধ্বতনরা অভিযুক্ত কিংবা আক্রান্ত সদস্যের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন। এর বাইরে নিজেদের স্বার্থ হাসিল না হলেই নানা কায়দায় ট্যাগিংয়ের শিকার হচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা।
তাদের কেউ কেউ বলছেন, বর্তমান শীর্ষ নেতৃত্ব নিজেদের স্বার্থের দিকে বেশি নজর রাখায় অধস্তনদের হতাশার বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে চলছেন। পুলিশ ঘুরে না দাঁড়ানোর পেছনে এটিও বড় ভূমিকা পালন করছে বলে মন্তব্য তাদের।
গত ৬ সেপ্টেম্বর বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় হামলার ঘটনা পুলিশের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। একাধিক মামলার আসামি রিয়াজ ফকিরকে চুরির মামলায় গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তার মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে দুই থেকে তিন শতাধিক মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে থানা ঘেরাও করে এবং ভাঙচুর চালায়। হামলাকারীদের একাংশ থানায় ঢুকে ডিউটি অফিসার এএসআই আব্দুল হালিমকে বেধড়ক মারধর করে। এতে আহত হন কনস্টেবল লিমন মিয়া, ফরহাদ হোসেন, মনির হোসেন, আল আমিন হোসেন ও মেহেদী হাসান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিপেটা করলে দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এতে আসামির স্বজন ও স্থানীয় কয়েকজন আহত হন।
ঘটনার দিন এক পুলিশ সদস্য কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘আমাদের নিরাপত্তা কোথায়? একটা মিথ্যা ঘটনায় যেভাবে আমাদের ওপর আক্রমণ করা হলো, আমরা যাব কোথায়?’
র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক এবং অতিরিক্ত আইজিপি কে এম শহীদুর রহমান বলেছেন, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য পুলিশের নিজেদের নিরাপত্তা আগে নিশ্চিত করতে হবে। আত্মরক্ষার প্রয়োজনে পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি প্রচলিত আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হলেও পুলিশ সদস্যরা তা প্রয়োগ করতে ভয় পাচ্ছেন। এই জড়তা কাটানোর দায়িত্ব ইউনিট কমান্ডারদের নিতে হবে। এজন্য নিয়মিত থানা, ফাঁড়ি এবং ক্যাম্প ভিজিট করে তাদের অনুপ্রেরণা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
গত ১১ আগস্ট নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বসুরহাট পৌরসভা এলাকায় একটি মামলার তদন্তে গিয়ে হামলার শিকার হন পাঁচ পুলিশ সদস্য। পরে তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এর বাইরে গত ২১ মে নরসিংদী সদর উপজেলার চরাঞ্চল আলোকবালী ইউনিয়নে আসামি ধরতে গিয়ে পুলিশের ছয় সদস্য হামলার শিকার হন।
সাভারের আমিনবাজারে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) উপপরিদর্শক আলতাফ হোসেনকে গত ৫ সেপ্টেম্বর পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একজন পুলিশ কর্মকর্তার এভাবে প্রাণ হারানোর ঘটনা শুধু বাহিনীর সদস্যদের নিরাপত্তা নয়, আইনপ্রয়োগে কর্তৃত্ব ও সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অপরাধবিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল ইসলাম আগামীর সময়কে বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে পারস্পরিক দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং সংকট স্বীকার করে এর সমাধান করতে হবে। খুলনার মতো বড় বাণিজ্যিক শহর যখন অনিরাপদ হয়ে পড়ে, তখন বুঝতে হবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে একেক এলাকায় অপরাধের ধরন ও পরিস্থিতি একেক রকম। তাই এলাকাভিত্তিক প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।




