হবিগঞ্জে একের পর এক বিতর্ক
চার মাসে পুলিশের ১১ সদস্য প্রত্যাহার
- এবার ভাইরাল ঘুষ নেওয়ার ভিডিও
- চুরি, মাদক দিয়ে ফাঁসানোর অভিযোগ
- তদন্তই সার, মামলা হয়নি কারও বিরুদ্ধে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
হবিগঞ্জে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে উঠছে একের পর এক অভিযোগ। মাদক দিয়ে ফাঁসানো, মোবাইল ফোন চুরিসহ নানা বিতর্কের পর এবার ভাইরাল ঘুষ নেওয়ার ভিডিও। গত মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফুটেজটি ছড়িয়ে পড়ার পর অভিযুক্ত সদস্যকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে পুলিশ লাইনসে। এর আগে চার মাসে জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ১১ জনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলেও ব্যবস্থার নামে করা হয়েছে শুধু প্রত্যাহার।
মঙ্গলবারের ঘটনাসহ আগের দুদিনে দুজন পুকুরঘাটে বসে ঘুষগ্রহণ এবং ঘুষ নেওয়া নিয়ে ‘বেফাঁস’ মন্তব্য করে প্রত্যাহার হন। এ ছাড়া ১০ দিনে সংযুক্ত করা হয়েছে চার পুলিশ সদস্যকে। অন্যরা প্রত্যাহার হয়েছেন দোকান থেকে মোবাইল ফোন চুরিসহ বিভিন্ন অভিযোগে।
গত ১৫ জুন থেকে চলতি ৬ অক্টোবর পর্যন্ত চার মাসে পাঁচ ঘটনায় আলোচনায় আসা ১১ পুলিশ সদস্যের মধ্যে রয়েছেন— জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এসআই সাইফুল ইসলাম, কনস্টেবল সাজ্জাদ হোসেন, ইয়াকুব মিয়া ও আলমগীর কবির; সদর মডেল থানার কনস্টেবল শরীফুল ইসলাম খান ও সোহাগ মিয়া; চুনারুঘাট থানার এসআই মাসুম আল মামুন, এএসআই মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসাইন, কনস্টেবল রুহুল আমীন, এএসআই অতনু বণিক এবং আজমিরীগঞ্জ থানার এসআই রাসেল আহমেদ।
ঘাটে বসে ঘুষগ্রহণ
চুনারুঘাট থানার এএসআই অতনু বণিকের পুকুরপাড়ে বসে ঘুষ নেওয়ার ঘটনার ভিডিও মঙ্গলবার ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এতে এক ব্যক্তির সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডার পর তার কাছ থেকে ১২ হাজার টাকা নিতে দেখা যায় অতনুকে। ভিডিওটি কয়েক মাস আগের এবং গতকালই তাকে পুলিশ লাইনসে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
‘ঘুষ খাওয়ার জন্যই পোশাক লাগিয়েছি’
‘আমি পোশাক লাগিয়েছি ঘুষের টাকা দিয়ে, ঘুষ খাওয়ার জন্যই’— চুনারুঘাট থানার এএসআই ইলিয়াসের এমন বক্তব্যের একটি ভিডিও সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে ইলিয়াসকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি যদি বলি, আমি পুলিশের দারোগা, আমি ঘুষ খাই না... আমি পোশাক লাগিয়েছি ঘুষের টাকা দিয়ে, ঘুষ খাওয়ার জন্যই।’ এ ঘটনায় গতকাল তাকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় পুলিশ লাইনসে।
বাবা-মেয়েকে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসানোর অভিযোগ
গত ২৭ সেপ্টেম্বর একটি মামলায় হাজিরা দিতে চুনারুঘাটের ছায়েদ মিয়া, তার মেয়ে জেসমিন ও ছোট
ভাই ইউনুস ইজিবাইকে যাচ্ছিলেন আদালতে। পথে এসআই মাসুম ও কনস্টেবল রুহুল আমীন তাদের ইজিবাইকের গতিরোধ করেন।
তাদের অভিযোগ, তল্লাশির নামে পকেটে ইয়াবা ঢুকিয়ে মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। পরে তিনজনকে পুলিশের গাড়িতে করে থানায় নেওয়া হয়। সন্ধ্যায় অবশ্য ছাড়া পান তারা। পরদিন ওই দুই পুলিশ সদস্যকে পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়েছে।
ফলের দোকানির ফোন চুরি
গত ৯ আগস্ট রাতে আজমিরীগঞ্জ বাজারের রাজিব আহমেদের ফলের দোকানে যান পুলিশের এসআই রাসেল আহমেদ। পেয়ারা ও লটকন কেনেন। একপর্যায়ে দোকানির মোবাইল ফোন নিয়ে যান। সিসিটিভির ফুটেজ ছড়িয়ে পড়লে গভীর রাতে ফোনটি ফেরত না দিয়ে রাজিবকে ১৫ হাজার টাকা দেন তিনি। পরদিন রাসেলকে হবিগঞ্জ পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়।
হাতকড়া পরা আসামির পলায়ন
গত ১৫ জুন বিকালে মাধবপুরের ধর্মঘর ইউনিয়নের দেবনগর এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে যায় ডিবি। পুলিশ সদস্যরা দেবনগর গ্রামের মৃত কালা মিয়ার ছেলে ও সন্দেহভাজন মাদক কারবারি জুয়েল মিয়াকে আটক করেন। একপর্যায়ে তাদের সঙ্গে ধস্তাধস্তির পর আসামি পালিয়ে যায় বলে দাবি করে ডিবি। এ ঘটনায় এসআই সাইফুল, কনস্টেবল সাজ্জাদ, ইয়াকুব ও আলমগীর এবং সদর থানার কনস্টেবল শরীফুল ও সোহাগকে হবিগঞ্জ পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়।
কবে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা
চুরি ও নিরপরাধ ব্যক্তিকে মাদক দিয়ে ফাঁসানোর অভিযোগসহ বিভিন্ন ঘটনায় ১১ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর ১০ জনকে পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করে জেলা পুলিশ। অধিকাংশ ঘটনায় গঠন করা হয়েছে তদন্ত কমিটি। তবে প্রশ্ন উঠেছে, অভিযোগের পর পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করাই যদি শেষ ব্যবস্থা হয়, তাহলে অপরাধে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তি কবে হবে?
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) হবিগঞ্জের সহসভাপতি বাহার উদ্দিন বললেন, অতীতেও অনেক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযোগের পরপরই তাদের শাস্তির নজির কম। আগে প্রত্যাহারও করা হতো না, এক্ষেত্রে বর্তমান পুলিশ সুপার প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু প্রত্যাহারের মধ্যেই ব্যবস্থা সীমাবদ্ধ থাকলে পুলিশকে স্বচ্ছ করা সম্ভব নয়। অভিযোগের সত্যতা মিললে আরও কঠোর ব্যবস্থা জরুরি।
অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না— এ বিষয়ে জানতে হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার তারেক মাহমুদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেননি তিনি। তবে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাশেদুল হক চৌধুরী বললেন, প্রতিটি ঘটনার পরই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে অপরাধের সত্যতা মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অবশ্যই নেওয়া হবে বিভাগীয় ব্যবস্থা।



