নবমীর উৎসব শেষে পূজায় বিদায়ের সুর

মহানবমীতে পূজামণ্ডপে ধূপের ধোঁয়ায় ছড়িয়ে পড়ে ভক্তের আরতি। ছবিটি গতকাল রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের -শামীম-উস-সালেহীন
নবমী পূজা, আর সন্ধ্যা আরতি শেষে শারদীয় উৎসবে বাজল বিদায়ের সুর। আজ বিজয়া দশমীতে মর্ত্য ছেড়ে কৈলাশে ফিরে যাবেন দেবী দুর্গা। শারদীয় দুর্গোৎসবের মহানবমী তিথিতে বিহিত পূজা এবং যজ্ঞের মাধ্যমে রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী কালী মণ্ডপে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা; তবে বিসর্জনের ক্ষণ এগিয়ে আসায় আনন্দের মাঝেও বাজে বিদায়ের সুর। নীলকণ্ঠ ফুল ও যজ্ঞের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয় নবমী বিহিত পূজা।
হিন্দু সনাতন শাস্ত্রমতে, নবমী তিথিতে রাবণ বধের পর রাজা শ্রী রামচন্দ্র এই পূজা করেছিলেন।
গতকাল মঙ্গলবার সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির পরিষদের পুরোহিত শ্রী চন্দন চক্রবর্তী বললেন, ‘বিজয়া দশমীতেই শেষ হচ্ছে দুর্গাপূজা। ফলে নবমীতেই হয় পূর্ণপূজা। এই কলিযুগে শত্রু বাইরে নয়, আসল শত্রু হলো মানুষের ভেতরের কু-রিপু।
অশুভ শক্তিকে বিনাশ করে অন্তরের শুভ শক্তিকে জাগিয়ে তোলার প্রার্থনা করা হয়েছে নবমীতে।’
শালগ্রাম শিলা ও দেবীর মহাস্নানের মধ্য দিয়ে সকালে মন্দিরে মহানবমীর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর ষোড়শ উপাচার ও বিহিত পূজার মাধ্যমে দেবী দুর্গার নবম রূপ মা সিদ্ধিদাত্রীর আরাধনা করা হয়। সকাল থেকেই ভক্তরা উপবাস রেখে দেবীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদন করেন।
হিন্দু আচার অনুযায়ী, মহালয়া, বোধন আর সন্ধিপূজা— এই তিন পর্ব মিলে দুর্গোৎসব। সপ্তমীতে পূজা দিলে সপ্তজনমের, মানে সাত জনমের পাপ মোচন হয়ে যায়। আর অষ্টমীতে ‘অষ্টমঙ্গল লাভ’ করা হয়। নবমীতে ‘পূর্ণপূজা’র পর দশমীতে দেবী ‘অপরাজিতা’ হন। দশমীতে দেবীকে বিদায় জানানোর বেদনাও জেগে ওঠে। ঢাকের কাঠি, ধূপের ধোঁয়া আর বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণে চারদিকের এই উৎসবমুখর পরিবেশের অন্তিম পর্ব অনুষ্ঠিত হয় মহানবমীতে। নবমীতে মণ্ডপে আসা দর্শনার্থীদের মধ্যেও দেখা গেছে উৎসবের আনন্দ আর বিদায়ের সুর। সন্ধ্যায় মন্দির প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় ঐতিহ্যবাহী ধুনুচি নাচের। কাঁসা ও ঢাকের তালে তালে ধূপদানিতে ধুনোর ধোঁয়ায় মেতে ওঠেন সব বয়সের ভক্তরা।
সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির কমিটির যুগ্ম সম্পাদক দিব্যেন্দু শেখর অর্ঘ্য বললেন, ‘আজ মহানবমীর সকালে নবমী বিহিত পূজা ও যজ্ঞ অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ভোগ নিবেদন শেষে ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা ও সার্বিক পরিস্থিতিতে এ বছরের পূজা খুব সুন্দর ও নিরবচ্ছিন্নভাবে কেটেছে। দশমীতে আমরা প্রতিমা নিয়ে রওনা হব এবং ওয়াইজঘাটে বিসর্জনের মাধ্যমে আমাদের ছয় দিনের এই পূজার আনুষ্ঠানিকতা সমাপ্ত হবে।’
দশমীতে বিহিত পূজার সঙ্গে আরও কিছু সংযুক্তি রয়েছে, যেমন সিঁদুর খেলা, মাকে মিষ্টি দান, শোভাযাত্রা এবং প্রতিমা বিসর্জন। বিজয়া দশমীতে একদিকে ‘আনন্দময়ী মাকে’ বিদায় জানানোর পালা, আবার আসন্ন বছর ‘মা’ আবার আসবেন সেই অপেক্ষারও শুরু। দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব।
সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন, দশভূজা দেবী দুর্গা অসুর বধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ধরায় আসেন। সন্তানদের নিয়ে কয়েকটি দিন পিতার গৃহে কাটিয়ে আবার ফিরে যান দেবালয়ে। ত্রেতাযুগে ভগবান রাম তার স্ত্রী সীতাকে উদ্ধার করতে দেবী দুর্গার অকালবোধন করেন। ব্রহ্মার নির্দেশ অনুযায়ী দুর্গার সাহায্যে রাবণ বধ করে সীতাকে উদ্ধার করেন তিনি। দেবীর সেই আগমনের সময়ই দুর্গোৎসব। রাম শরৎকালে দেবীকে আহ্বান করেছিলেন বলে এ পূজা শারদীয় দুর্গা পূজা নামেও পরিচিত।



