রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বিজিএমইএ প্রতিনিধি দলের বৈঠক

সংগৃহীত ছবি
তীব্র গ্যাস সংকট, অস্বাভাবিক উৎপাদন ব্যয়, রপ্তানি ও বিনিয়োগে মন্দা এবং একের পর এক কারখানা বন্ধ— চতুর্মুখী সংকটে পড়েছে তৈরি পোশাক খাত। পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় অধিকাংশ পোশাক কারখানা সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন করছে। এতে রপ্তানি আদেশ হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। অন্যদিকে তিন বছরে জ্বালানি, ঋণের সুদ ও মজুরি বৃদ্ধির কারণে এ খাতের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
এমন সংকটের চিত্র তুলে ধরে জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে জরুরি নীতিগত সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। গতকাল বুধবার বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে এসব সংকট ও সুপারিশ তুলে ধরেন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের নেতৃত্বে সংগঠনটির পরিচালনা পর্ষদের প্রতিনিধিদল।
বৈঠকে বিজিএমইএ জানিয়েছে, গ্যাস সংকটের কারণে অনেক কারখানা তাদের স্বাভাবিক উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম ব্যবহার করতে পারছে। ফলে সময়মতো রপ্তানি আদেশ সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে তিন বছরে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার এবং মজুরি সমন্বয়ের কারণে পোশাক উৎপাদনের ব্যয় প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। বাড়তি এ ব্যয়ের বিপরীতে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়ানোর সুযোগ সীমিত থাকায় উদ্যোক্তাদের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
রপ্তানিতেও দেখা দিয়েছে নেতিবাচক প্রবণতা। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের পোশাক রপ্তানি ১.৬৪ শতাংশ কমেছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়েও পোশাক রপ্তানি কমেছে ১.৯২ শতাংশ। পাশাপাশি মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগও স্থবির হয়ে পড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে কারখানা বন্ধের ক্ষেত্রে। উচ্চ উৎপাদন ব্যয় ও রপ্তানি আদেশের সংকটের মধ্যে তিন বছরে প্রায় ৪০০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে বিজিএমইএ জানিয়েছে।
এ সংকট থেকে উত্তরণে দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। গ্যাসের সংকট মোকাবিলায় দ্রুত দুটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ স্থাপন, দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং এলএনজি আমদানির পর্যায়ে শুল্ক-কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়েছে বিজিএমইএ। একই সঙ্গে ১৫০ থেকে ৫০০ কেজি বয়লারের ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারে পোশাক কারখানাগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি স্বল্প সুদের বিশেষ ঋণ দেওয়ারও প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।
অর্থায়ন সংকট মোকাবিলায় চলতি মূলধন ও বাণিজ্য ঋণের সুদের হার কমানো, পোশাক খাতের জন্য বিশেষ পোস্ট-শিপমেন্ট ফাইন্যান্সিং স্কিম চালু এবং গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড ও টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট ফান্ডে অর্থ বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় ও সময় কমাতে কাস্টমসের বন্ড অডিট প্রক্রিয়া সহজ এবং প্রাতিষ্ঠানিক করার পাশাপাশি বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি ফের চালুর দাবি জানিয়েছে বিজিএমইএ। একই সঙ্গে বৈঠকে অবকাঠামোগত দুর্বলতাকে পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করা হয়। এ কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে দ্রুত বাস্তবায়ন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাময়িকভাবে অতিরিক্ত কার্গো শেড নির্মাণ এবং বে-টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ দ্রুত শেষ করার সুপারিশ করা হয়েছে। এলডিসি উত্তরণের পর বাজার সুবিধা হারানোর ঝুঁকিকেও বড় সংকট হিসেবে দেখছে বিজিএমইএ।
এই অবস্থায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দ্রুত মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে এফটিএ, পিটিএ ও ইপিএ সম্পাদনে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের দাবি জানানো হয়েছে।
বৈঠকে বিজিএমইএ নেতারা পোশাক খাতের বর্তমান পরিস্থিতির পাশাপাশি শিল্প সুরক্ষায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের প্রশংসা করেন। এলডিসি উত্তরণ বিলম্বিত করার উদ্যোগ, বন্ধ কারখানা ফের চালুর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ অর্থায়ন সুবিধা, নন-বন্ড কারখানার জন্য বন্ডেড কাঁচামাল সংগ্রহ ও সরাসরি রপ্তানির সুযোগ এবং কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করার সিদ্ধান্তের জন্য সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন তারা।
পোশাকশিল্পকে জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ‘মেরুদণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করে বললেন, সাময়িক প্রতিকূলতা কাটিয়ে বিশ্ববাজারে দেশের পোশাক খাতের শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখা জরুরি। শিল্পের টেকসই বিকাশ ও সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।





