জাতিসংঘের প্রতিবেদন
বহুমাত্রিক দারিদ্র্যে দেশের আড়াই কোটি মানুষ
- ঝুঁকিতে আরও প্রায় ৪ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ
- বিশ্বে তীব্র বহুমাত্রিক দারিদ্র্যে ১২০ কোটি মানুষ
- বাংলাদেশের পেছনে ভারত, পাকিস্তান। নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ এগিয়ে

সংগৃহীত ছবি
দেশের ২ কোটি ৫৯ লাখের বেশি মানুষ রয়েছেন বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে। এর মধ্যে চরম দারিদ্র্যের শিকার প্রায় ৬৮ লাখ। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) প্রকাশিত বৈশ্বিক বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক (এমপিআই)-২০২৬ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন চিত্র। ইউএনডিপি ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সংস্থা অক্সফোর্ড পোভার্টি অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ প্রতিবেদনটি যৌথভাবে প্রকাশ করেছে গত ১২ অক্টোবর।
প্রতিবেদনে ব্যবহার করা হয়েছে বাংলাদেশের ২০২২ সালের জনসংখ্যা ও স্বাস্থ্য জরিপের তথ্য। তবে এই প্রতিবেদনে বহুমাত্রিক দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ধরা হয়েছে ২০২৪ সালের জনসংখ্যার প্রক্ষেপণ অনুযায়ী।
বৈশ্বিক এমপিআই স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার মান— এই তিন খাতের ১০টি সূচকে পরিমাপ করে বঞ্চনা। স্বাস্থ্যে পুষ্টি ও শিশুমৃত্যু; শিক্ষায় শিক্ষাবর্ষ ও স্কুলে উপস্থিতি; আর জীবনযাত্রার মানে রান্নার জ্বালানি, স্যানিটেশন, পানি, বিদ্যুৎ, আবাসন ও সম্পদ দেখা হয়। একজন ব্যক্তিকে বহুমাত্রিক দরিদ্র হিসেবে গণ্য করা হয়, যখন তার বঞ্চনার স্কোর অন্তত ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ হয়। এমপিআই হলো দারিদ্র্যের হার ও বঞ্চনার তীব্রতার গুণফল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ২০২২ সালের জরিপভিত্তিক বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং এমপিআই মান শূন্য দশমিক ০৬৭। একই প্রতিবেদনে প্রায় ৪ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছেন বলা হয়েছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রায়ত্ত গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী আগামীর সময়কে বললেন, ‘বাংলাদেশ দ্রুতগতিতে অগ্রগতি করছিল। কিন্তু মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে গতি খুব ধীরে হচ্ছে। যার ফলে উন্নয়নের উন্নতির যে ধারা, তা অনেক ক্ষেত্রে বিপরীতমুখী হয়েছে।’
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ধীর প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের চাপ একসঙ্গে থাকায় দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়ছে। এই অর্থনীতিবিদের মতে, এই পরিস্থিতিতে চরম দারিদ্র্যের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে থাকা মানুষও যেকোনো সময় দারিদ্র্যে নেমে যেতে পারেন।
অগ্রগতির ধারা
বাংলাদেশ বহুমাত্রিক দারিদ্র্য কমাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। সমন্বিত সময়রেখার হিসাবে ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশের এমপিআই মান শূন্য দশমিক ১৪৫ থেকে কমে শূন্য দশমিক ০৫০ হয়েছে। দারিদ্র্যের হার ৩০ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে।
২০১৪ সালে বাংলাদেশে বহুমাত্রিক দরিদ্র ছিল প্রায় ৪ কোটি ৮২ লাখ। ২০১৯ সালে তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ২ কোটি ৭১ লাখে। ২০২২ সালে সংখ্যাটি আরও কমে প্রায় ১ কোটি ৯৫ লাখে নামে। অর্থাৎ আট বছরে প্রায় ২ কোটি ৮৭ লাখ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের সীমা পার করেছে। এই অগ্রগতির কারণে বাংলাদেশ ১৫ বছরেরও কম সময়ে এমপিআই অর্ধেকে নামিয়ে আনা ৩৩টি দেশের তালিকায় রয়েছে।
বৈশ্বিক চিত্র
বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক অনুযায়ী ১০৮টি উন্নয়নশীল দেশের ১২০ কোটি মানুষ তীব্র বহুমাত্রিক দারিদ্র্যে আছে। এর মধ্যে বিশ্বের দরিদ্রদের ৯৯ দশমিক ৮ কোটি মানুষ গ্রামে বাস করে। শহরে আছে ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ বা ২০ কোটি মানুষ। দরিদ্রদের মধ্যে ৫১ দশমিক ৫ শতাংশ বা ৬১ কোটি ৭০ লাখ শিশু; অর্থাৎ প্রতি তিন শিশুর মধ্যে একজন বহুমাত্রিক দরিদ্র।
সবচেয়ে কম বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার রয়েছে সার্বিয়ায়, যেখানে হার শূন্য দশমিক ১ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্যের হার রয়েছে শাদে, যেখানে হার ৮৪ দশমিক ২ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ায় ৩৯ কোটির বেশি মানুষ তীব্র বহুমাত্রিক দারিদ্র্যে আছে। সবচেয়ে বেশি আফগানিস্তানে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার ৬৪ দশমিক ৯ শতাংশ।
বাংলাদেশের বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ। নেপালের হার ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ, ভুটানে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ এবং মালদ্বীপে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। বাংলাদেশের চেয়ে বেশি হার রয়েছে ভারতে ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ, পাকিস্তানে ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ এবং আফগানিস্তানে ৬৪ দশমিক ৯ শতাংশ।
বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ
অগ্রগতি থাকলেও বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দেশের মোট জনসংখ্যার ৪৪ দশমিক ৫ শতাংশ, (প্রায় ৪ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ) বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছেন। এই জনগোষ্ঠী এখন বহুমাত্রিক দরিদ্র নয়, তবে এক বা একাধিক বঞ্চনায় আছেন। যেকোনো অর্থনৈতিক ধাক্কা, রোগব্যাধি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে তারা দারিদ্র্যে পড়তে পারেন।
দেশের বহুমাত্রিক দারিদ্র্যে সবচেয়ে বেশি নির্ণায়কের কাজ করেছে শিক্ষা খাতের বঞ্চনা, যার অবদান ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ। এর মধ্যে শিক্ষাবর্ষের ঘাটতি ৮দশমিক ৪ শতাংশ মানুষকে প্রভাবিত করেছে এবং ৪ দশমিক ৪ শতাংশ ক্ষেত্রে স্কুলে উপস্থিতির ঘাটতি রয়েছে।
জীবনযাত্রার মানের ক্ষেত্রে দেশের ৯ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ আবাসনের বঞ্চনায় আছেন। ৮ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ স্যানিটেশনের ঘাটতিতে ভুগছেন। ৭ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ মৌলিক গৃহস্থালি সম্পদ থেকে বঞ্চিত। স্বাস্থ্য খাতে পুষ্টির বঞ্চনা ৫ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষকে প্রভাবিত করেছে। বাংলাদেশে বহুমাত্রিক দরিদ্রদের বঞ্চনার তীব্রতা গড়ে ৪৪ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ তারা গড়ে নির্ধারিত ১০টি সূচকের প্রায় ৪ দশমিক ৪৫টি সূচকে বঞ্চিত।
অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী বললেন, ‘বহুমাত্রিক দারিদ্র্য কমাতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মৌলিক পরিকাঠামো, জ্বালানি ও সামাজিক-অর্থনৈতিক সহায়তা একসঙ্গে শক্তিশালী করতে হবে।’



