রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের অবসান ও জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি

ছবি: আগামীর সময়
রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের অবসান, ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে নির্যাতন ও সীমান্তে প্রাণহানির মতো অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিচারের আওতায় এনে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
শনিবার রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ইসফানদিয়ার জাহান হাসান চৌধুরী মিলনায়তনে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) আয়োজিত ১২তম জাতীয় মানবাধিকার সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা জানান।
যুবদের ক্ষমতায়ন, অধিকার সুরক্ষা প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ সম্মেলনে মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, গবেষক, সাংবাদিক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধি এবং নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন।
সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম স্বাগত বক্তব্য দেন। পরে সংগঠনের ২০২৫ সালের কার্যক্রম, বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ বিষয়ক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন উত্থাপন করা হয়।
সম্মেলনের বিশেষ অধিবেশনে ‘রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন: ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা, ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহিতার প্রশ্ন’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন ব্যারিস্টার সারা হোসেন, মো. নূর খান, সানজিদা ইসলাম এবং মোহাম্মদ শিশির মনির।
রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার নিহত ইশতিয়াক হোসেন জনির ভাই ইমতিয়াজ হোসেন রকি এবং পুলিশের গুলিতে পা হারানো সাতক্ষীরার রুহুল আমিন নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম।
অধিবেশনে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, বিচারহীনতা শুধু একটি আইনি সংকট নয়; এটি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক দুর্ভোগের কারণ। তারা সত্য উদ্ঘাটন, স্বাধীন তদন্ত, ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং দায়ীদের বিচারের মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।
আলোচনায় বক্তারা জানিয়েছেন, নির্যাতনবিরোধী জাতিসংঘ কনভেনশনসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত না হলে টেকসই মানবাধিকার সুরক্ষা সম্ভব নয়।
পরবর্তী অধিবেশনে ‘সীমান্তে নিরাপত্তা ও মানবাধিকার’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে মানবাধিকারকর্মী সাজ্জাদ হোসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমেদ বক্তব্য দেন। এ ছাড়া সীমান্তে নিহত ফেলানী খাতুনের বাবা নুর ইসলাম এবং নিহত মুরসালিনের বড় ভাই ইয়াসিন মিয়া তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানবিক নীতিমালার আলোকে পরিচালিত হওয়া উচিত। অনিয়মিত অভিবাসন বা সীমান্ত অতিক্রমের অভিযোগে কাউকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা কিংবা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া সীমান্তে ফেরত পাঠানো মানবাধিকারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সীমান্তে প্রাণহানি রোধে কার্যকর দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং মানবাধিকারভিত্তিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ওপর তারা গুরুত্বারোপ করেন।
সম্মেলনে অতিথি বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের বাংলাদেশ অফিসের মানবাধিকার কর্মকর্তা মো. জাহিদ হোসেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর পরিচালক (যুগ্ম সচিব) ব্যারিস্টার মো. খলিলুর রহমান খান এবং হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ও গুম তদন্ত কমিশনের সাবেক সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী।
তারা জানিয়েছেন, মানবাধিকার রক্ষা কোনো রাজনৈতিক বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্য উদ্ঘাটন, দায়ীদের বিচারের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত এবং ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা, পুনর্বাসন ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কার্যকর জাতীয় কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।
সম্মেলনে সীমান্ত হত্যা, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ, কারাগারে মৃত্যু, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার, শ্রম অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নাগরিক পরিসর নিয়ে আলোচনা হয়। সমাপনী অনুষ্ঠানে দ্বিতীয় জাতীয় মানবাধিকার অলিম্পিয়াড-২০২৬-এর বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।




