পিইডিপি-৫ কর্মসূচি
চাপের মুখে কমল ৯৫০০ কোটি
- প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে পিইডিপি-৫ কর্মসূচি
- প্রস্তাব করা হয়েছিল ৪৯ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা
- পরিকল্পনা কমিশনের চাপে ব্যয় কমে ঠেকেছে ৪১ হাজার ৯০ কোটি ৪৮ লাখে
- ঋণ ও অনুদান দেবে বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ ৬ বিদেশি সংস্থা
- বদলে যাবে শিক্ষাদান পদ্ধতি ও শিক্ষার মান
- উন্নত হবে বিদ্যালয়ের পরিবেশ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েও ব্যাপক চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত ব্যয়ে কাটছাঁট করতে হচ্ছে। দুই দফায় এই অর্থ কমাতে সক্ষম হয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) বাস্তবায়নে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত ব্যয় ছিল প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। তবে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রশ্ন ওঠার পর প্রথম দফায় প্রায় ৮ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকা কমানো হয়। পরে পর্যালোচনা সভায় আরও ৬৭০ কোটি ৫১ লাখ টাকা কমানোর সিদ্ধান্ত হয়। দুই দফায় কাটছাঁটের পর কর্মসূচিটির মোট প্রস্তাবিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪১ হাজার ৯০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, নতুন এই কর্মসূচি অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে শুরু করে ২০৩১ সালের মধ্যে কর্মসূচিটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এর দায়িত্বে থাকবে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে পিইডিপি-৫-এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪৯ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ৩৪ হাজার ৯৫০ কোটি এবং বৈদেশিক ঋণ বা অনুদান থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা জোগানের পরিকল্পনা ছিল। পিইসি সভার পর ব্যয় কমিয়ে ৪১ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। পরে আরও কাটছাঁটের সিদ্ধান্তে চূড়ান্ত প্রস্তাবিত ব্যয় প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা কমে যায়।
সর্বশেষ প্রস্তাব অনুযায়ী, কর্মসূচিতে সরকারি তহবিল থেকে ৩৩ হাজার ২০৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা, বৈদেশিক ঋণ থেকে ৭ হাজার ৬১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং বিদেশি অনুদান থেকে ২৭৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। অর্থায়নে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউনিসেফ, ইউনেস্কো এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন সূত্র।
প্রস্তাবিত কর্মসূচির ব্যয় পরিকল্পনায় অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা, শিক্ষা উপকরণসহ বিভিন্ন খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে স্কুল ড্রেস তৈরিতে ১০ হাজার ৩৫২ কোটি ৫১ লাখ এবং অনাবাসিক ভবন নির্মাণে ১০ হাজার ৮৮১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি কেনায় ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ২৩৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।
এ ছাড়া ৬৬ হাজার ৭৩৭টি বিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে ২ হাজার ৩৯৭ কোটি ৯০ লাখ, প্রশিক্ষণে ৩ হাজার ১২৫ কোটি ৭৫ লাখ এবং অফিস ও বিদ্যালয় মেরামতে ৩ হাজার ৫২০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। পরামর্শক খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৩৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এখন একনেকে উপস্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছে পিইডিপি-৫।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, দেশে প্রাথমিক শিক্ষা খাতের উন্নয়নে ২০০৪ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। সর্বশেষ পিইডিপি-৪-এর মাধ্যমে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিতে অগ্রগতি হয়েছে।
তবে এসব অগ্রগতির পরও শিক্ষার্থীদের ভিত্তিমূলক সাক্ষরতা ও গণিতের দক্ষতা প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। শেখার ফলাফল উন্নয়নে আরও লক্ষ্যভিত্তিক ও প্রমাণনির্ভর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছে অধিদপ্তর। একই সঙ্গে ডিজিটাল শিক্ষা সম্প্রসারণ, প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর শিক্ষায় অংশগ্রহণ এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে পিইডিপি-৫-এ ভিত্তিমূলক শেখার দক্ষতা বাড়ানো, শিক্ষার ফলাফল উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর ও উদ্ভাবনী শিক্ষণপদ্ধতি সম্প্রসারণ, শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোও কর্মসূচিটির অন্যতম লক্ষ্য।
প্রস্তাবিত কর্মসূচিটি বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত সবার জন্য মানসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্য বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি জাতীয় শিক্ষানীতি ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি-৪) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও দক্ষ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী করার লক্ষ্য রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, গত ১৯ মে কর্মসূচিটির প্রস্তাব নিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সভায় কিছু শর্তসাপেক্ষে কর্মসূচিটি অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়। তবে সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পুনর্গঠন না করায় পরবর্তী সময়ে পর্যালোচনা সভার আয়োজন করা হয়। শেষ পর্যন্ত এসব সভার সুপারিশের ভিত্তিতে ডিপিপি পুনর্গঠন করা হয়েছে।
কর্মসূচিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) মো. এহছানুল হক কমিশনের মতামতে বলেছেন, কর্মসূচিটি বাস্তবায়িত হলে গুণগত, অন্তর্ভুক্তিমূলক, প্রযুক্তিনির্ভর ও ফলাফলমুখী মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করার উদ্যোগ এগিয়ে যাবে। গুরুত্ব বিবেচনায় কর্মসূচিটি অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে।



