সংরক্ষিত এমপিদের তদারকি মানতে নারাজ বিরোধী দল
- ৩৬ নারী এমপিকে বিরোধী দলের ৭৯ আসনের দায়িত্ব
- স্পিকারকে ৬৭ এমপির চিঠি
- বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্য বিরোধ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সরাসরি ভোটে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্য তার নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যস্ত। হঠাৎ সেই একই এলাকায় সরকারদলীয় সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যেরও দায়িত্ব— উন্নয়ন তদারকি, প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক সমন্বয়। কে এলাকার প্রকৃত প্রতিনিধি, কার কথায় প্রশাসন সাড়া দেবে, উন্নয়নের কৃতিত্বই বা কার— এসব প্রশ্ন ঘিরে জাতীয় সংসদের ভেতর-বাইরে সৃষ্টি হয়েছে নতুন করে বিতর্ক।
সরকারের এ সিদ্ধান্তকে সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক দাবি করে জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন বিরোধী দলের ৬৭ জন সংসদ সদস্য। তাদের অভিযোগ, জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত একজন এমপির ওপর অন্য একজন সংসদ সদস্যকে ‘তদারক’ বা ‘সমন্বয়কারী’ হিসেবে বসানোর কোনো সাংবিধানিক কিংবা আইনগত ভিত্তি নেই। এরই মধ্যে নীলফামারীতে দুই এমপির প্রকাশ্য বাগ্বিতণ্ডার ঘটনা সেই আশঙ্কাকে বাস্তব রূপ দিয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের মধ্যে সরকার এখন এ ব্যবস্থাকে আইনি কাঠামো দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ‘জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪’-এ নতুন ২৬ক ধারা যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। প্রস্তাবিত বিধানে রাজনৈতিক দলগুলো চাইলে তাদের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের এক বা একাধিক সাধারণ সংসদীয় এলাকায় উন্নয়ন কাজের দায়িত্ব দিতে পারবে। এ বিষয়ে স্পিকারকে অবহিত করতে হবে। বিরোধী দলের এমপিদের অভিযোগ, আগে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে যে ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, এখন আইন সংশোধন করে সেটিকেই বৈধতার কাঠামো দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
জানা গেছে, গত ৬ জুন বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় সংরক্ষিত আসনের দলীয় ৩৬ নারী এমপিকে বিরোধী দলের জেতা ৭৯টি আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কাউকে একটি, কাউকে দুটি, আবার কয়েকজনকে সর্বোচ্চ চারটি আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কয়েকজন নারী এমপিকে দেওয়া হয়েছে পুরো জেলার দায়িত্বও।
বিএনপির দলীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দায়িত্ব পাওয়া নারী এমপিরা এসব এলাকায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে ডিও লেটার বা আধা সরকারি পত্র দিতে পারবেন। প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি রাজনৈতিক সমন্বয়েও তাদের সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। আর এখানেই মূল আপত্তি বিরোধী দলের নির্বাচিত এমপিদের।
তাদের যুক্তি, একজন এমপি জনগণের সরাসরি ভোটে একটি নির্দিষ্ট এলাকার প্রতিনিধি হন। এলাকার মানুষের কাছে তার রাজনৈতিক জবাবদিহি থাকে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের তদারকি, প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ এবং জনগণের দাবি-দাওয়া সংসদে তুলে ধরাও তার দায়িত্ব। সেই একই এলাকায় সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নন— এমন আরেকজন সংসদ সদস্যকে উন্নয়ন তদারকি ও সমন্বয়ের দায়িত্ব দিলে দুই ধরনের কর্তৃত্ব সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সে আশঙ্কারই একটি চিত্র দেখা গেছে নীলফামারীতে। গত ২৫ আগস্ট সৈয়দপুর উপজেলা পরিষদ ভবনে একটি পরিদর্শন কক্ষ উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে নীলফামারী-৪ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য হাফেজ মাওলানা আব্দুল মুনতাকিম এবং সংরক্ষিত নারী এমপি বিলকিস ইসলামের মধ্যে তীব্র বাগ্বিতণ্ডা হয়। কক্ষের নামফলকে নির্বাচিত এমপি আব্দুল মুনতাকিমের নাম থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিলকিস ইসলাম। তাকে কেন প্রধান অতিথি করা হয়নি এবং নামফলকে কেন শুধু একজনের নাম রাখা হয়েছে— এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। পরে দুপক্ষের নেতাকর্মীরা তাদের শান্ত করার চেষ্টা করলেও দীর্ঘ সময় বাগ্বিতণ্ডা চলে।
বিরোধী দলের নেতাদের আশঙ্কা, নীলফামারীর ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। দায়িত্বের সীমা স্পষ্ট না হলে উন্নয়ন প্রকল্প, সরকারি বরাদ্দ, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড— সব ক্ষেত্রে এমন বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে।
এ প্রেক্ষাপটে ২৩ আগস্ট স্পিকারের কাছে দেওয়া চিঠিতে ৬৭ জন সংসদ সদস্য দাবি করেছেন, সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকার প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যের ওপর সংরক্ষিত নারী আসনের কোনো সংসদ সদস্যের তদারকির সুযোগ নেই।
চিঠিতে তারা বলেছেন, প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি ও সংরক্ষিত আসনের প্রতিনিধির দায়িত্ব এবং জবাবদিহির ক্ষেত্র এক নয়। একজন সংসদ সদস্যের কাজের ওপর অন্য সংসদ সদস্যকে তদারকি, অনুমোদন বা সমন্বয়ের ক্ষমতা দেওয়ার কোনো প্রচলিত আইনি বিধানও নেই।
বিষয়টি নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানও সরকারের সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার ভাষ্য, সংবিধানের কোথাও সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের বিরোধী দলের আসনে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে বসানোর কোনো বিধান নেই।
বিরোধী দলের চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, এতে শুধু বিরোধী এমপিদের সঙ্গে নয়; বিএনপির স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গেও দায়িত্বপ্রাপ্ত নারী এমপিদের বিরোধ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অবশ্য সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষে সংসদে ব্যাখ্যা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, সরকারি ও বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত সংরক্ষিত নারী এমপিদের সংবিধান বা আইনে নির্দিষ্ট কোনো নির্বাচনী আসন নেই। সাধারণ এমপিদের মতো তাদের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক নির্বাচনী এলাকাও নেই। সে কারণে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কাঠামোর ভিত্তিতে দলীয়ভাবে তাদের কাজের জন্য কিছু এলাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে সংসদবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদের মতে, সংরক্ষিত নারী এমপিদের নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকা না থাকলেও আইন করে তাদের এক বা একাধিক সাধারণ আসনে দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ যুক্তিসংগত নয়। এতে বিদ্যমান প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি সংসদীয় গণতন্ত্রের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।







