টিকিটবিহীন যাত্রীদের দৌরাত্ম্যে নাকাল বৈধ টিকিটধারীরা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রেনের অপেক্ষা, স্টেশনে ছিনতাই ও পকেটমারের আতঙ্ক, সঙ্গে টিকিটবিহীন যাত্রীদের ভিড়। ট্রেনে ভ্রমণ করেছেন এমন চিত্রের মুখোমুখি হননি খুবই কম পাওয়া যাবে। এমন পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রেলযাত্রীদের।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন রুটে ট্রেনের অনিয়মিত চলাচল ও দীর্ঘ বিলম্বের চিত্র নিত্যদিনের। টিকিট ছাড়াই অনেক যাত্রী ভ্রমণ করেন— এতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় বৈধ টিকিটধারীদের।
শুক্রবার ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রেনের অপেক্ষায় রয়েছেন।
এ সময় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানায়, সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশনে প্রবেশের সময় রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী আন্তঃনগর সিল্কসিটি এক্সপ্রেসের একটি বগির চাকা লাইনচ্যুত হয়। পরে জরুরি শিকল টেনে ট্রেনটি থামানো হয়। এ ঘটনায় ঢাকার সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের রেল যোগাযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
কালনী এক্সপ্রেসের যাত্রী আসমা আক্তার জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাওয়ার জন্য তিনি টিকিট কেটেছেন। ট্রেনের নির্ধারিত সময় ছিল দুপুর ২টা ৩৮ মিনিট। কিন্তু বিকাল ৩টা পেরিয়ে গেলেও ট্রেনের কোনো দেখা মেলেনি। তার ভাষ্য, শুধু আজ নয়, প্রায় প্রতিবারই দীর্ঘ সময় স্টেশনে অপেক্ষা করতে হয়।
একই সুরে ক্ষোভ ঝাড়লেন সিল্কসিটি এক্সপ্রেসের যাত্রী মনিরুজ্জামান। ‘তিনি সিরাজগঞ্জ যাবেন। টিকিট না পাওয়ায় স্ট্যান্ডিং টিকিটের অপেক্ষায় ছিলেন। তবে ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হওয়ার খবর পাওয়ার পর তার যাত্রা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।’
এদিকে উপকূল এক্সপ্রেসের অপেক্ষায় থাকা মাসুম জানান, তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাবেন। টিকিট না কেটেই ট্রেনে উঠে পড়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি দাবি করেন, অনেক সময় টিকিট পরীক্ষক বগিতে আসেন না। তার মতো আরও অনেকে টিকিট ছাড়াই ভ্রমণ করেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ বিষয়ে কমলাপুর রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার সাইদুল ইসলাম জানান, সম্ভাব্য ট্রেন চলাচলের সময় ডিজিটাল বোর্ডে প্রদর্শন করা হচ্ছে এবং মাইকিংয়ের মাধ্যমেও যাত্রীদের নিয়মিত অবহিত করা হচ্ছে। সিল্কসিটি এক্সপ্রেসের দুর্ঘটনার কারণে উত্তরাঞ্চলের রেল যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেন উদ্ধারে কাজ চলছে। ট্রেনটি কমলাপুর হয়ে বিমানবন্দর স্টেশনে রাত ৯টার দিকে পৌঁছাতে পারে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। যেসব যাত্রী ভ্রমণ করতে চান না, তাদের টিকিটের পুরো অর্থ ফেরত দেওয়া হচ্ছে।
টিকিট ছাড়া ভ্রমণের বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করেন, কোনো যাত্রী টিকিট ছাড়া ট্রেনে ভ্রমণের সুযোগ পান না। প্রতিটি বগিতে টিকিট পরীক্ষক দায়িত্ব পালন করেন এবং গন্তব্য স্টেশনেও টিকিট ছাড়া স্টেশন ত্যাগ করা সম্ভব নয়।
ট্রেনের বিলম্বে দীর্ঘ সময় স্টেশনে অবস্থান করতে গিয়ে যাত্রীরা আরেকটি সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, স্টেশনে পকেটমার ও অজ্ঞান পার্টির সদস্যদের তৎপরতা বেড়েছে। ভিড়ের সুযোগে মোবাইল ফোন, মানিব্যাগসহ মূল্যবান সামগ্রী চুরি হচ্ছে। একই সঙ্গে খাবার বা পানীয়ের সঙ্গে চেতনানাশক মিশিয়ে সর্বস্ব লুটে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
অপেক্ষমাণ যাত্রীদের অভিযোগ, নির্ধারিত সময়ে ট্রেন না আসায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অন্যদিকে টিকিটবিহীন যাত্রীদের কারণে বৈধ টিকিটধারীরাও নানা বিড়ম্বনায় পড়ছেন।
যাত্রীদের দাবি, ট্রেনের সময়সূচি কঠোরভাবে অনুসরণ, টিকিটবিহীন যাত্রীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং স্টেশনের নিরাপত্তা জোরদার করতে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে রেলযাত্রায় দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
এয়ারপোর্ট রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার জানান, স্টেশনের নিরাপত্তার দায়িত্ব রেলওয়ে পুলিশের। নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়। টিকিট বা প্ল্যাটফর্ম টিকিট ছাড়া কেউ স্টেশনে প্রবেশ করলে জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া যাত্রীদের সতর্ক করতে স্টেশনের বিভিন্ন স্থানে পোস্টার ও বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে এবং নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে।
তবে যাত্রীরা নিরাপত্তাব্যবস্থায় সন্তুষ্ট নন। রাজশাহীগামী যাত্রী শাহানাজ বললেন, স্টেশনে মোবাইল ফোন বা মানিব্যাগ বের করতেও ভয় লাগে। কখন কে টান দিয়ে নিয়ে দৌড় দেবে, সেই আতঙ্কে থাকতে হয়।





