বাংলাদেশসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের যুদ্ধে নামিয়েছে রাশিয়া

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাশিয়ার মাটি ছুঁলেই বদলে যাবে জীবন। হাতের মুঠোয় ঘুরবে স্বপ্নের চাকরি। ঘুচবে বেকারত্বের অভিশাপ। রুশ রুবলের আশীর্বাদে ফুলেফেঁপে উঠবে সংসার। সুখের বাতাসে ম-ম করবে অভাবী আঙিনা। এমন হাজারো সব অলীক আশায় বুক বেঁধে রাশিয়ার উদ্দেশে দেশ ছেড়েছেন অনেক অসহায় বাঙালি। পরিবারের শেষসম্বল খুইয়ে ছুটে গেছেন দূর-মরীচিকার ঠিকানায়। যখন ঘোর কাটল, তখন সব পথ বন্ধ।
অস্ত্র হাতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে। পিছু ফেরার পথ নেই। স্বপ্ন পুড়ে ছাই! সাধের প্রাণপাখিটাও তখন বুলেটের মুখে! শুধু বাংলাদেশ নয়; প্রতারণা ও চাকরির প্রলোভনে বাংলাদেশের মতো বিশ্বের আরও ২৮ দেশের নাগরিকদের কপালেও জুটেছে একই প্রবঞ্চনা। রাশিয়ায় ঢুকতেই বিভিন্ন চক্রের মাধ্যমে এমন জোর করে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামিয়েছে রুশ সেনাবাহিনী। ভয়াবহ সে চিত্রই উঠে এসেছে গত সোমবার প্রকাশিত জাতিসংঘের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ৪৮টি দেশের নাগরিকদের নিয়োগ-সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে এসব তথ্য সংগ্রহ করেছে জাতিসংঘের ইউক্রেনবিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন। জাতিসংঘের চলমান সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে উপস্থাপনের জন্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে এ তথ্য।
ইউক্রেনবিষয়ক তদন্ত কমিশন জানিয়েছে, তারা এমন জোরালো প্রমাণ সংগ্রহ করেছে— যা থেকে বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সক্রিয় নিয়োগকারী এজেন্টদের সহায়তায় মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল রুশ কর্তৃপক্ষ। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইউক্রেনের বেসামরিক জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ধারাবাহিক হামলার মাধ্যমে রাশিয়া যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছে। সেখানে প্রতারণামূলক বা জবরদস্তিমূলক নিয়োগের প্রমাণ পাওয়া গেছে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, কেনিয়া, নাইজেরিয়া, ফিলিপাইন, উজবেকিস্তানসহ ২৯টি দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে। পাচার ও প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের সবাই ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী পুরুষ।
যে তথ্য মিলেছে বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে
বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে রাশিয়ায় প্রবেশের জন্য ব্যবহৃত বেশ কিছু ব্যবসায়ী ভিসার অনুলিপি সংগ্রহ করে তদন্ত কমিশন। রাশিয়ার একটি বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণের কথা বলা হয়েছিল সেসব ভিসায়। কাগজপত্রে ভ্রমণের উদ্দেশ্য বেসামরিক হিসেবে দেখানো হলেও, মূলত এর আড়ালেই রুশ বাহিনীতে লোক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এজেন্সির মাধ্যমে নিরাপত্তাকর্মী, গাড়িচালক, নির্মাণশ্রমিক, ইলেকট্রিশিয়ান ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মতো পেশায় চাকরির প্রলোভন দেওয়া হতো। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর ফোন ও পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয় তাদের বেশিরভাগেরই। জোরপূর্বক স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া হয় রুশ ভাষায় লেখা সামরিক চুক্তিতে। ভুক্তভোগী এক বাংলাদেশির স্ত্রী জানিয়েছেন, ‘পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে শুধু রুশ ভাষায় লেখা চুক্তির বিভিন্ন জায়গায় আমার স্বামীকে স্বাক্ষর করতে বলা হয়েছিল। প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়েছিলেন তিনি আর কোনো উপায়ও ছিল না।’
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে বাংলাদেশি যোদ্ধা
রাশিয়ার সেনা হয়ে যুদ্ধে লড়েছেন বাংলাদেশের ২৭ বছর বয়সী রিমেল মিয়া। তিনি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের বাসিন্দা। টাকা ধার করে ভালো চাকরির আশায় ২০২৫ সালের মার্চে রাশিয়ার উদ্দেশে দেশ ছাড়েন। তিনি রাশিয়ায় নির্মাণকাজের একটি চাকরি পাওয়ার জন্য খরচ করেছিলেন প্রায় ৬ লাখ টাকা। সেখানে গিয়ে স্থায়ী কর্মসংস্থান হারানোয় এবং অভিবাসন-সংক্রান্ত জটিলতার মুখে পড়ে রিমেল যোগ দেন রুশ সেনাবাহিনীতে। ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর ফ্রন্টলাইনে মোতায়েন থাকার সময় ইউক্রেনীয় বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন তিনি। সে সময় থেকেই যুদ্ধবন্দি হিসেবে আটক রয়েছেন।



