দুদকের চিঠিতে সাড়া নেই ইন্টারপোলের
- শেখ হাসিনাসহ ১০ জনের নামে রেড নোটিসের আবেদন

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল এবং ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী ব্যক্তিসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারির আবেদনে সাড়া দিচ্ছে না আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল। তদন্ত ও বিচারাধীন মামলার পলাতক আসামি হিসেবে এক বছরেরও বেশি সময় আগে তাদের ছবিসহ ব্যক্তিগত তথ্য ইন্টারপোলের রেড কর্নারে তোলার আবেদন পুলিশ সদর দপ্তরের কাছে পাঠায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পুলিশের দাবি, এ ব্যাপারে তারা যথাযথ উদ্যোগ নিলেও এখন পর্যন্ত কারও নাম ইন্টারপোলের রেড কর্নারে তোলা হয়নি। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। তবে এই দীর্ঘসূত্রতার জন্য পুলিশ সদর দপ্তরের ইন্টারপোল ডেস্কের অবহেলাকে দায়ী করছে দুদক। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের ইন্টারপোল ডেস্কের দায়িত্বপ্রাপ্ত এআইজি আলী হায়দার চৌধুরী এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘মন্ত্রণালয় ও আদালত থেকে আমাদের কাছে এ-সংক্রান্ত যে আবেদনগুলো এসেছে, সেগুলো সঙ্গে সঙ্গে প্রসেস করে ইন্টারপোলের সদর দপ্তরে আবেদন হিসেবে পাঠানো হয়েছে। প্রতিটি আবেদনের ব্যাপারে ইন্টারপোল জানিয়েছে, সেগুলো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এখন রেড নোটিস জারি হবে কি হবে না, সেই এখতিয়ার ইন্টারপোল সদর দপ্তরের। আমরা শুধু অনুরোধ পাঠাতে পারি। সিদ্ধান্তের বিষয়ে আমাদের করণীয় কিছু নেই।’
আন্তর্জাতিকভাবে অপরাধ দমনে বিভিন্ন দেশের পুলিশ বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতা বাড়ানোর কাজ করে ইন্টারপোল। কোনো অপরাধী এক দেশে অপরাধ করে অন্য দেশে পালিয়ে গেলে তাকে শনাক্ত করতে এবং তার নিজের দেশে ফিরিয়ে আনতে সংস্থাটি সহায়তা করে থাকে।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছেলেমেয়ের বিরুদ্ধে পূর্বাচল নতুন শহরে প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা করে দুদক। পূর্বাচল প্রকল্পে প্লট জালিয়াতির অভিযোগে দুদকের করা তিনটি মামলায় শেখ হাসিনাকে ২১ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। গত ২৭ নভেম্বর ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এর বিচারক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন এ রায় দেন। দুদকের তিনটি মামলার প্রতিটিতে আদালত তাকে সাত বছর করে মোট ২১ বছরের কারাদণ্ড দেন। তিন মামলার পৃথক দুটিতে শেখ হাসিনার ছেলে জয় ও মেয়ে পুতুলকে পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড দেন আদালত।
মামলা চলাকালেই বিদেশে পলাতক থাকায় অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের অবস্থান জানতে এবং দেশে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারি করার জন্য গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি আদালতে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। আদালতের অনুমোদন পাওয়ার পর ১১ এপ্রিল ১০ পাতার একটি আবেদন পুলিশ সদর দপ্তরের ইন্টারপোল ডেস্কে পাঠানো হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত ওই বিষয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো নোটিস জারি করেনি ইন্টারপোল।
দুদক আরও যাদের বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারির আবেদন করেছে তারা হলেন— সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, তার স্ত্রী রুকমিলা জামান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ, এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম, পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিস সরাফাত, তার স্ত্রী সাউথইস্ট ব্যাংকের সাবেক পরিচালক আঞ্জুমান আরা নাহিদ ও ছেলে কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য রাহীব সাফওয়ান সরাফাত চৌধুরী।
দুদকের তদন্তসংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রেড নোটিস জারির জন্য পাঠানো প্রতিটি চিঠির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিস্তারিত পরিচয়, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, পাসপোর্ট নম্বর, ঠিকানা এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংযুক্ত করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী দুদকের চিঠি পাওয়ার পর পুলিশ সদর দপ্তর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলের কাছে রেড নোটিস জারির অনুরোধ জানাবে। কিন্তু পুলিশ সঠিক সময়ে অনুরোধ জানিয়েছে কি না, সব ক্ষেত্রে সেটা তাদের জানানো হয় না। এক্ষেত্রে পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট ডেস্কের কাজে গাফিলতি রয়েছে। দুদক ও পুলিশের কাজের আরও সমন্বয় দরকার বলে মনে করেন ওই কর্মকর্তা। তবে গত ১ জুন পুলিশ সদর দপ্তরের ইন্টারপোল ডেস্কের দায়িত্বে থাকা এআইজি (এনসিবি) আলী হায়দার চৌধুরীর সই করা এক চিঠিতে দেখা গেছে, তিনি নাফিজ সরাফাত ও তার স্ত্রী-সন্তানের বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারির আবেদন করার বিষয়টি দুদক চেয়ারম্যানকে অবহিত করেছেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেছেন, ২০২৫ সালের ৭ জুলাই দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মামলার এজাহারভুক্ত তিন আসামির (সরাফাত ও তার স্ত্রী, ছেলে) বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারি করার জন্য ইন্টারপোল বরাবর আবেদন পাঠানো হয়েছে। আবেদনটি বর্তমানে ইন্টারপোলে পর্যালোচনাধীন। এর অংশ হিসেবে প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য ৮ থেকে ১০ জুনের মধ্যে পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য পাঠানো সম্ভব না হলে রেড নোটিসের আবেদন খারিজ হয়ে যাবে।




