যদি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বড় মামা আজ সকালে মারা গেছেন। খবর পেয়ে আমরা সবাই ছুটে গেছি তার বাসায়। ঘরে অনেক মানুষ। মরা বাড়িতে কান্নার একটা রোল চলছে। একেকজন ঘরে ঢুকছেন, মামার লাশের দিকে তাকাচ্ছেন এবং কান্নার ভলিউম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। যেন কান্নার আওয়াজ যত তীব্র হবে, মামার প্রতি ভালোবাসার গভীরতা তত বেশি প্রমাণিত হবে। এটা হয়তো এক ধরনের সামাজিক ব্যাকরণ।
বড় খালা বসে আছেন লাশের পাশে। তিনি বিলাপ করে হাত-পা ছুড়ে কাঁদছেন। তার কান্নার মধ্যে একটা সুর ও ছন্দ আছে। খালা একটু পরপর চিৎকার করে বলছেন, ‘ভাইরে, তুমি আমারে ফালায়া কই গেলারে?’
বড় খালা বেশ মন দিয়েই কাঁদছিলেন; কিন্তু অবাক করা দৃশ্যটা ঘটল একটু পর। বিলাপের ঠিক মাঝখানেই খালা হঠাৎ স্বাভাবিক ও নিচু গলায় ছোট খালাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কক্সবাজার থেকে মেজো ভাই রওনা হয়েছে? সময়মতো পৌঁছাবে তো?’
ছোট খালাও ঠিক ততটাই শান্ত ও নিচু গলায় উত্তর দিলেন, ‘শোনার সঙ্গে সঙ্গেই রওনা হইছে। চিটাগাং রোডে নাকি বিশাল জ্যাম।’
কথাটা শেষ হতেই বড় খালা আবার ঠিক আগের সুর ও স্কেলে কান্নার বিলাপ ধরে ফেললেন। যেন একটা ক্যাসেট প্লেয়ার ক্ষণিকের জন্য পজ করা হয়েছিল, আবার প্লে করা হলো। কান্না যে এত সুনির্দিষ্ট স্কেলে থামানো আর শুরু করা যায়, তা না দেখলে বিশ্বাস হতো না।
বড় মামার একমাত্র ছেলে রনি ড্রয়িং রুমের সোফায় নিচু হয়ে বসে আছে। তার চোখে পানি। পাড়ার বয়স্ক মোতালেব সাহেব রনির কাঁধে হাত রেখে বলছেন, ‘চোখ মোছো রনি। এভাবে কাঁদতে হয় না। কাঁদলে মরা মানুষের আত্মা কষ্ট পায়। পৃথিবীর মায়া ছেড়ে সবাইকেই একদিন যেতে হবে।’
আজহার সাহেবও এসেছেন। বড় মামার সঙ্গে তার তিনটা দেওয়ানি মামলা চলছে। মামা বেঁচে থাকতে কোনোদিন আজহার সাহেবের নামটা গালি ছাড়া উচ্চারণ করেননি। সেই আজহার সাহেব মামার মুখ দেখে চোখ মুছতে লাগলেন। তারপর উপস্থিত সবার উদ্দেশে বললেন, ‘বড় মিঞা ছিলেন আমার নিজের ভাইয়ের মতো। এমন ফেরেস্তার মতো মানুষ আর হয় না। আমাদের মধ্যে সামান্য একটু মতের অমিল ছিল ঠিকই, কিন্তু মানুষটার মনে কোনো প্যাঁচ ছিল না।’
বাইরে জানাজা কে পড়াবেন তা নিয়ে স্নায়যুদ্ধ চলছে। মেজো মামার ইচ্ছে— স্থানীয় মসজিদের খতিব সাহেব জানাজা পড়াবেন। কিন্তু সেজো খালুর যুক্তি অন্য। তার পীর নাকি এখন ঢাকাতেই আছেন। পীর সাহেব কামেল লোক। তিনি জানাজা পড়ালে কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ব্যাপারটা নিয়ে জটিলতা বাড়বে মনে হয়। মামা ও খালু দুজনই নিজ নিজ জায়গায় অনড়।
ঘরের ভেতর বড় মামা চুপচাপ শুয়ে আছেন। বাইরে তখনো তাকে নিয়ে নানা কথা চলছে। আমি একবার মামার মুখের দিকে তাকালাম। মনে হলো, এত মানুষের ভিড়ে মানুষটা আজ ভীষণ একা।



