অথচ

ছোট্ট শিশুদের কিছু অভিনয় আমাকে সত্যিই অবাক করে! শিশুদের কান্না দেখলে এটাকে অস্কারজয়ী অভিনয় মনে হয়! আসলে শিশুরা কি সত্যিই মিথ্যা বলে? নাকি জন্মগতভাবেই তারা একেকজন নাট্যজগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র— তা নিয়ে গবেষণা দরকার। কারণ, বড় বড় অভিনেতাকে অভিনয়ের জন্য প্রশিক্ষণ নিতে হয়, আর শিশুরা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই এমন অভিনয় করে যে, দর্শক তো বটেই, স্বয়ং পরিচালক মানে মা-বাবাও বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন!
শিশুটি দিব্যি শুয়ে আছে। হঠাৎ কী এক অদৃশ্য বিপর্যয় নেমে এলো তার জীবনে! মুখে এমন এক অভিব্যক্তি, যেন পৃথিবীর সব দুঃখ এসে তার ছোট্ট বুকটায় আশ্রয় নিয়েছে। তারপর শুরু হলো সেই বিখ্যাত সংলাপ— ‘অ্যাঁ, অ্যাঁ, অ্যাঁ!’
সবাই দৌড়ে এলো। কেউ বললেন, ‘কী হয়েছে?’ শাশুড়ি বললেন, ‘বউমা তুমি দাদুকে জোরে ধরে রেখেছ নাকি?’ অথচ দেখা গেল, কোথাও কিছু হয়নি। দিব্যি সুস্থ, শুধু তার অভিনয়ের চাহিদাটা একটু বেশি। এবার পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন। ব্যাস! মুহূর্তেই কান্নার ইতি। মুখে হাসি। মনে হলো, এইমাত্র জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল শান্তিচুক্তিটি সম্পন্ন হলো। কয়েক সেকেন্ড আগেও যে শোকের মহাসাগরে ডুবেছিল, সে এখন এমন ভাব নিয়ে খেলছে, যেন কিছুই ঘটেনি। কী আশ্চর্য!
তবে কান্নার চেয়েও আকর্ষণীয় হলো খাবারবিষয়ক নাটক। শিশুর সামনে খাবার দেওয়া হলো। সে খাবে না। পৃথিবীর সব খাবার যেন তার শত্রু! মুখ বন্ধ, ঠোঁট শক্ত। মা-বাবা নানা কৌশল করছেন। কেউ খেলনা দেখাচ্ছেন, কেউ গল্প বলছেন, কেউ পাখি দেখিয়ে বোঝাচ্ছেন— ‘এই যে, পাখিটাও খায়!’ কিন্তু শিশুর সিদ্ধান্ত অটল। খাবার মুখে তোলার প্রশ্নই আসে না। শুরু হলো কান্না। এমন কান্না, যেন তাকে খাবার নয়, পাহাড় গিলতে বলা হচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে মা তাকে কোলে নিয়ে মুখে এক লোকমা খাবার তুলে দিলেন। আশ্চর্য! কান্না বন্ধ! মানে কোলে ওঠার বাহানা। এটা কি শিশুর প্রতারণা!
কোনো ঘোষণা নেই, কোনো সমঝোতা স্মারক নেই। যে মুখটি কিছুক্ষণ আগে খাবারের বিরুদ্ধে দুর্ভেদ্য দুর্গ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেই মুখেই এখন খাবার! আমরা ভাবি, শিশুরা কিছু বোঝে না। অথচ তারা বোঝে— কান্না করলে কোলে ওঠা যায়, একটু আদর পাওয়া যায়, আর খাবারের ব্যাপারে দরকষাকষির সুযোগ তৈরি হয়।
শিশুরা স্ক্রিপ্ট ছাড়াই পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, দর্শকদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, আর প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে এমন নির্লিপ্তভাবে দৃশ্য ত্যাগ করতে পারে যে, অভিজ্ঞ নাট্যকারও লজ্জায় পড়ে যাবেন!
এ নাটকের দর্শক আমরা, প্রযোজক মা-বাবা, আর প্রধান অভিনেতা সেই ছোট্ট মানুষটি— যার অভিনয়ে বিরতি নেই, পারিশ্রমিক নেই, অথচ জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী!



