তবে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ভেংচি কাটাও একটি মহৎ শিল্প! এটা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে আদিম যোগাযোগ ব্যবস্থা। কথা বলতে না পারলে ভেংচির মাধ্যমেই নিজেকে প্রকাশ করা যায়। এখনো কি ভেংচি কাটে মানুষ, কাটে। তবে ওভাবে দেখা যায় না। বাঙালির ভেংচি কাটার একটা আলাদা ধরন আছে। মুখ বাঁকা, চোখ ট্যারা, জিভ বের করা— একসঙ্গে তিনটি কাজ। বিজ্ঞানীরা এখনো বের করতে পারেননি এতগুলো মাংসপেশি একসঙ্গে কীভাবে নড়ে!
ছোটবেলায় মা বকলে পেছন ফিরে ভেংচি কাটা ছিল জাতীয় খেলা। ধরা পড়লে মা বলত, ‘মুখ ওইভাবেই বাঁকা হয়ে থাকবে।’ ভেংচি কাটতে গিয়ে দাদির বকুনি এখনো মনে পড়ে।
ভেংচি হলো বিনাখরচে প্রতিশোধ। মারামারি লাগে না, শুধু মুখটাই যথেষ্ট। ভেংচি কাটারও যে একটা শিল্প আছে, তা আমি বুঝেছিলাম আমার এক বন্ধুকে দেখে। ওর নাম রোহান। পৃথিবীতে কেউ ছবি আঁকে, কেউ গান গায়, কেউ কবিতা লেখে; আর রোহান মুখ বাঁকিয়ে এমন সব শিল্পকর্ম সৃষ্টি করত, যা দেখে বিখ্যাত চিত্রকররাও হয়তো নিজেদের প্রতিভা নিয়ে নতুন করে ভাবতেন। তার মুখ ছিল যেন এক চলমান প্রদর্শনী। কখনো ঠোঁট বাঁকা, কখনো নাক কুঁচকে এমন অবস্থা করত— মনে হতো, পৃথিবীর যাবতীয় দুর্গন্ধ একসঙ্গে তার সামনে হাজির হয়েছে।
একদিন তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা বন্ধু, ভেংচি কাটার এই অসাধারণ প্রতিভা তুই কোথায় শিখেছিস?’ বন্ধুটি গম্ভীর মুখে বলল, ‘এটা শেখার বিষয় নয়, অনুভবের বিষয়। কেউ জন্মায় ডাক্তার হওয়ার জন্য, কেউ ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য, আর কেউ জন্মায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য।’
আমি তখন ওকে বলেছিলাম, ‘তাহলে তুই শেষের দলের লোক?’ ও শুধু হেসেছিল। তার সঙ্গে সঙ্গে এমন একটা ভেংচি কাটল যে, আমার মনে হলো, কথাটা বোধ হয় তার আত্মসম্মানে আঘাত করেছে।
একদিন মজা করে জানতে চেয়েছিলাম, ‘তোর এই ভেংচি শিল্পের ভবিষ্যৎ কী?’ রোহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘দেশে শিল্পীদের কদর নেই। আমি কত সুন্দর সুন্দর ভেংচি কাটলাম, অথচ কেউ আমাকে পুরস্কার দিল না।’ তবে হেড স্যার ভেংচি কাটার জন্য একবার ওকে পুরস্কৃত করেছিল— কান ধরে উঠবস! স্কুলের সহপাঠীরা নালিশ করলে যা হয়।
আমরা মজা করে অনেক সময় বলতাম, ‘তোর ভেংচি শিল্পটা আসলে আন্তর্জাতিক মানের।’ রোহান উৎসাহিত হয়ে সেদিন বলেছিল, ‘সেটাই তো চাই বন্ধু।’ রসিকতা করে প্রায়ই বলত, ‘একটা ভেংচি একাডেমি খুলব। সেখানে মানুষকে শেখানো হবে— কীভাবে রাগ প্রকাশ করতে হয়, কীভাবে অপছন্দ বোঝাতে হয়, আর কীভাবে কোনো কথা না বলেই সামনের মানুষকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করা যায়।’



