সুতরাং

টুনটুনির শরীরে বেশ কদিন ধরেই লালচে র্যাশ উঠেছিল। গায়ে ছিল প্রচণ্ড জ্বর। ডাক্তার দেখে বলেছিলেন, ‘হাম হয়েছে সাইফুর সাহেব। হাসপাতালে রাখতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু বেড একটাও খালি নেই। আপাতত মেয়েকে বাসাতেই রাখুন। ভালো হয়ে যাবে আশা করছি।’
টুনটুনি ভালো হয়নি। আজ সকালে একদম নিঝুম হয়ে গেল। মাত্র ছয় বছর বয়স ছিল তার।
ছোট্ট একটা খাটিয়া এনে ড্রয়িংরুমের মাঝখানে রাখা হয়েছে। টুনটুনির পরনে হালকা গোলাপি রঙের ফ্রক। যেটা রোজার ঈদে তার বাবা কিনে দিয়েছিলেন। কাপড়টা এখনো একদম নতুন। অথচ টুনটুনি আর নেই।
টুনটুনির মা রেহানা ঘরের এক কোণে মেঝের ওপর স্থির হয়ে বসে আছেন। তার একমাত্র সন্তান মারা গেছে। উনি কাঁদছেন না। চোখের কোণে এক ফোঁটা পানিও নেই। তিনি শুধু একদৃষ্টে মেয়ের বাঁ হাতের ছোট আঙুলটার দিকে তাকিয়ে আছেন। কাল সকালেও আঙুলটা দিয়ে বাবার শার্টের বোতাম টানছিল টুনটুনি। কোলে উঠে বাবার গালে চুমু দিয়ে বলেছিল, ‘বাবা, আমি যখন বড় হব, তোমাকে প্রতিদিন একটা করে আইসক্রিম কিনে দেব। তুমি কাউকে দেবে না। ওকে?’
টুনটুনির বাবা সাইফুর ড্রয়িংরুমে একটা মোড়ায় বসে আছেন। তার চশমাটা টেবিলের ওপর রাখা। কাচ একটু ঘোলা। এতদিন চশমা ঘোলা হলে মেয়েই পরিষ্কার করে দিত তার জামা দিয়ে। আজ পরিষ্কার করার কেউ নেই। সাইফুর টেবিল থেকে ঘোলা চশমাই চোখে দিলেন।
বিকালের দিকে কাফনের কাপড় আনা হলো। টুনটুনির মা হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। ধীর পায়ে খাটিয়ার পাশে গিয়ে বসলেন। তারপর খুব সাবধানে, যেন ঘুম ভেঙে না যায়— মেয়ের গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।
রেহানা খুব নিচু গলায় ডাকলেন, ‘ও সাইফুর, শুনছ?’
সাইফুর উঠে দাঁড়ালেন। ‘কী বলছ?’
‘মেয়েটার জ্যাকেটটা গায়ে জড়িয়ে দিলে হতো না? গোরস্তানে তো অনেক ঠান্ডা। ওর আবার ঠান্ডা লেগে জ্বর আসবে।’
রেহানার বড় খালা ডুকরে কেঁদে উঠলেন, ‘ও রেহানা, তুই তো পাগল হয়ে যাবি রে!’
সাইফুর কাঁদলেন না। তিনি আলমারি খুলে টুনটুনির লাল রঙের জ্যাকেটটা বের করে আনলেন। কাফনের সাদা কাপড়ের ওপর অতি যত্নে সেই জ্যাকেটটা বিছিয়ে দিলেন।
টুনটুনিকে গোরস্তানে নেওয়া হবে। সাইফুর টুনটুনির পড়ার ঘরে গিয়ে ঢুকলেন। টেবিলের ওপর অর্ধেক রঙ করা একটা খাতা পড়ে আছে। একটা উড়ন্ত পাখির ছবি। ডানা দুটো নীল রঙ করা। বাকি শরীরটা আর রঙ করা হয়নি। পাশে তার ছোট নীল রঙের পেনসিলটা রাখা।
সাইফুর খাতা আর পেনসিলটার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর মেয়ের খাতাটা বুকের মধ্যে চেপে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে থাকলেন।



