বিশ্বের সবচেয়ে সেরা ইলিশ কোন নদীর?

ইলিশ মানেই পদ্মার ইলিশ... এমন কথাই তো প্রচলিত। কিন্তু আসলেই কি পদ্মার ইলিশ সবচেয়ে সেরা? না, গবেষণা কিন্তু তা বলছে না। স্বাদ ও পুষ্টির বিচারে মেঘনা অববাহিকার ইলিশই নাকি সবচেয়ে এগিয়ে। এমনকি গবেষকদের দাবি, বিশ্বে ইলিশের মধ্যে মেঘনার ইলিশ স্বাদ ও পুষ্টির দিক থেকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওশানোগ্রাফি বিভাগের গবেষকদের যৌথ গবেষণায় এসব তথ্য উঠে আসে। গবেষণায় ১৯৯৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাসাগর গবেষণা সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। ২০২০ সালে গবেষণাটি ‘সায়েন্স রিপোর্টস’ সাময়িকীতেও প্রকাশিত হয়েছে।
মেঘনার ইলিশের স্বাদের রহস্যের পেছনে রয়েছে তার খাবার ও পরিবেশ। গবেষণায় দেখা যায়, ইলিশ সাগরে থাকার তুলনায় নদী ও মোহনায় এলে বেশি খাবার পায়। বিশেষ করে মেঘনা অববাহিকায় ইলিশের প্রয়োজনীয় উদ্ভিদকণার প্রাচুর্য রয়েছে। এই খাবার খেয়ে ইলিশের শরীরে ফ্যাটি অ্যাসিড ও ওমেগা-৩ তৈরি হয়, যা মাছটির পুষ্টিগুণের পাশাপাশি স্বাদকেও সমৃদ্ধ করে। সাগর থেকে নদীতে আসার সময় ইলিশ স্রোতের উল্টো দিকে ঘণ্টায় ৭১ কিলোমিটার পর্যন্ত সাঁতার কাটে। যাওয়ার পথে শক্তি অর্জনের খাবারও গ্রহণ করে।
গবেষণা অনুযায়ী, ইলিশের খাবারের বড় অংশই উদ্ভিদকণা। মেঘনা অববাহিকায় এর প্রাচুর্যের পেছনে রয়েছে হিমালয় থেকে গঙ্গা এবং তিব্বত থেকে ব্রহ্মপুত্র হয়ে নেমে আসা বিপুল পরিমাণ উদ্ভিদকণা। এসব উপাদান মেঘনা হয়ে বঙ্গোপসাগরে পৌঁছায়। খাবারের এই প্রাচুর্যের কারণেই ইলিশ বছরের বড় একটি সময় মেঘনা মোহনার আশপাশে অবস্থান করে।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, বাংলাদেশের মোট ইলিশ উৎপাদনের মাত্র প্রায় ২ শতাংশ পদ্মা থেকে আসে। পদ্মার ইলিশ তুলনামূলক ছোট হওয়ার কথাও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। বিপরীতে বড় ও স্বাদে সমৃদ্ধ ইলিশের বড় অংশ পাওয়া যায় মেঘনা অববাহিকায়। ফলে এতদিনের ‘পদ্মার ইলিশই সেরা’ ধারণার সঙ্গে গবেষণার তথ্যের কিছুটা পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
তবে মেঘনার ইলিশের স্বাদ সারা বছর একই রকম থাকে না। গবেষণায় বলা হয়েছে, আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে ইলিশের খাবারের প্রাচুর্য বেশি থাকে এবং এ সময়েই প্রায় ৮০ শতাংশ ইলিশ ধরা পড়ে। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সময়, যখন জাটকা ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে।
শুধু স্বাদ নয়, ইলিশের পুষ্টিগুণও গুরুত্বপূর্ণ। মেঘনা অববাহিকার খাবার থেকে ইলিশের শরীরে তৈরি হওয়া ফ্যাটি অ্যাসিড ও ওমেগা-৩ মানুষের জন্য উপকারী পুষ্টি উপাদান হিসেবে পরিচিত। গবেষণায় এগুলোর স্বাস্থ্যগত নানা উপকারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
মেঘনার পর ইলিশের খাবার হিসেবে প্রয়োজনীয় উদ্ভিদকণার বেশি উপস্থিতি দেখা যায় মিয়ানমারের ইরাবতী মোহনায়। এরপর রয়েছে ইরাবতী অববাহিকা, ভারতের দক্ষিণ উপকূলের নদ-নদী এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড উপকূলসংলগ্ন এলাকা। গভীর সমুদ্রে ইলিশের প্রয়োজনীয় খাবার সবচেয়ে কম পাওয়া যায়।
অর্থাৎ, ইলিশের স্বাদের পেছনে শুধু নদীর নাম নয়, তার চারপাশের জলজ পরিবেশ ও খাবারের প্রাচুর্যও বড় ভূমিকা রাখে। আর সেই বিচারে মেঘনা অববাহিকা যেন ইলিশের জন্য এক প্রাকৃতিক খাবারের ভাণ্ডার।
তবে এই সম্পদ ধরে রাখতে হলে মেঘনাকে রক্ষা করাও জরুরি। গবেষকরা জাটকা ধরা নিয়ন্ত্রণ, দূষণ কমানো এবং ক্ষতিকর জাল ব্যবহার বন্ধের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। নদীতে দূষণ ও ডুবোচর বাড়তে থাকলে ইলিশের জন্য উপযুক্ত পরিবেশও হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।





