তবে

ইটপাথরের এই নগরীতে প্রতিটি মানুষের জীবনেই লুকিয়ে আছে আলাদা আলাদা কিছু গল্প। কারও ছোটগল্প, কারও বড়গল্প এবং নানা ধরনের গল্প। কেউ সেই গল্প লেখেন অফিসের টেবিলে, কেউবা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঘামের বিনিময়ে। আবার কেউ চোখের জলের বিনিময়ে।
সকালে টুকরিতে করে বাদাম নিয়ে বের হন এক বাবা। দরজায় দাঁড়িয়ে তার ছোট্ট মেয়েটি কি বলে দেয়— ‘বাবা, আজ আমার রঙ-পেনসিল আনবে?’ পাশ থেকে স্ত্রীও কি বলে ওঠেন— ‘ঘরে কিচ্ছু নেই, আজ মাছ-তরকারি কিছু আনবেন?’ বাবা মুচকি হেসে মাথা নাড়েন। তারপর টুকরি কাঁধে বেরিয়ে পড়েন শহরের ব্যস্ত রাস্তায়।
পথের ধারে পানির জার বসিয়ে লেবুর শরবত বিক্রি করেন আরেকজন। বের হওয়ার সময় তার ছেলেও হয়তো আবদার করে বলে দিয়েছে, ‘বাবা, আমার জুতাটা ছিঁড়ে গেছে। আজ নতুন জুতা আনবে কিন্তু।’ আর স্ত্রীও কি মনে করিয়ে দেন— ‘ফেরার সময় একটু চাল-ডালও নিয়ে এসো, ঘরে যা আছে তাতে রাতে রান্না হবে না।’ রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে এক গ্লাস, দুই গ্লাস করে শরবত বিক্রি করতে থাকেন তিনি। শুধু সন্তান কিংবা স্ত্রীর স্বপ্নপূরণের আশায়।
খোলা ভ্যানে আনারস, পেয়ারা কিংবা কলা নিয়ে বসা মানুষটির কাছেও দিনটি শুধু ফল বিক্রির নয়। দিনটি আসলে তার ছেলের আবদার মেটানোরও। আজ ভালো বিক্রি না হলে যে ছেলের স্কুলের বেতন দিতে পারবে না।
আর ফুটপাতে কয়েক জোড়া মোজা সাজিয়ে বসা মানুষটি— ঘর থেকে বের হওয়ার সময় সন্তান বলে দিয়েছে, ‘বাবা, আজ কিন্তু স্কুল ব্যাগটা আনতেই হবে।’
দিনশেষে কেউ ব্যাগ নিয়ে ফেরেন, কেউ জুতা, কেউ রঙ-পেনসিল, কেউ শুধু একটি চকোলেট। কারও হাতে থাকে এক কেজি মাছ, দুটো সবজি আর সামান্য বাজার। কিন্তু ঘরে ফেরার মুহূর্তটি সবার একই— সন্তানের ছুটে এসে জড়িয়ে ধরা, স্ত্রীর মুখের মুচকি হাসি আর ছোট্ট ঘরে একটু আনন্দ।
এই মানুষগুলো শুধু পণ্য বিক্রি করেননি; প্রতিদিন তারা বিক্রি করেন নিজেদের শ্রম, ক্লান্তি আর স্বপ্ন— শুধু পরিবারের মুখে একটুখানি হাসি ফোটানোর জন্য।
কিন্তু এই মানুষগুলোর স্বপ্নভঙ্গ হয় কোনো কোনো দিন। সব দিন স্বপ্নের মতো কাটে না। কোনো দিন উচ্ছেদের নামে উল্টে দেয় পানির জার। ফুটপাতে ছড়িয়ে পড়ে জীবিকার শেষসম্বল। কোনো দিন সড়কে বাসের ধাক্কায় উল্টে যায় বাদামের টুকরি। মুহূর্তেই থেমে যায় রোজগার। সেদিন ঘরে ফেরার পথে বাবার হাতে থাকে না সন্তানের আবদার, স্ত্রীর বাজারের তালিকাও থেকে যায় অপূর্ণ।



