আগামীর সময়

সর্বপ্রাচীন কুকুরের সন্ধান!

সর্বপ্রাচীন কুকুরের সন্ধান!

সংগৃহীত ছবি

হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের বিশ্বস্ত সঙ্গী এবং সবচেয়ে পুরনো গৃহপালিত প্রাণী কুকুর। হিংস্র নেকড়ে থেকে উৎপত্তি হওয়া প্রাণিটিকে কখন, কোথায় এবং কীভাবে গৃহপালিত করা হয়েছিল এ নিয়ে রহস্য দীর্ঘদিনের। তবে সম্প্রতি জিনগত গবেষণায় উঠে এসেছে নতুন তথ্য। গবেষকরা জানাচ্ছেন, তারা প্রায় ১৫ হাজার ৮০০ বছর আগের সবচেয়ে প্রাচীন কুকুরে দেহাবশেষের সন্ধান পেয়েছেন।

গবেষকরা জানিয়েছেন, তুরস্কের পিনারবাসি রক শেল্টার এলাকায় প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহকদের ব্যবহৃত একটি স্থানে পাওয়া হাড়ের মাধ্যমে এই কুকুরটির অস্তিত্ব জানা যায়। এর আগে জিনগতভাবে নিশ্চিত হওয়া সবচেয়ে পুরনো কুকুরের চেয়ে এটি প্রায় ৫ হাজার বছরের পুরনো।
গবেষণায় দেখা গেছে, ওই সময় ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে কুকুর ছড়িয়ে পড়েছিল এবং কৃষির সূচনার বহু আগে থেকেই মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিল।

নতুন এই গবেষণার ফলাফল বুধবার ‘ন্যাচার’ জার্নালে প্রকাশিত দুটি বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

লন্ডনের ফ্রান্সিস ক্রিক ইনস্টিটিউটের গবেষক উইলিয়াম মার্শ জানান, ডিএনএ বিশ্লেষণে দেখা গেছে প্রায় ১৮ হাজার বছর আগেই পশ্চিম ইউরেশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে কুকুরের উপস্থিতি ছিল। তখনই তারা নেকড়ে থেকে জিনগতভাবে ভিন্ন হয়ে ওঠে। ধারণা করা হচ্ছে, কুকুর ও নেকড়ের বিচ্ছেদ সম্ভবত বরফযুগের সর্বোচ্চ সময়েরও আগে। অর্থাৎ ২৪ হাজার বছরেরও আগে ঘটেছিল। তবে এ বিষয়ে এখনও নিশ্চিত হওয়ার মতো যথেষ্ট তথ্য নেই।

গবেষকরা বলছেন, আধুনিক নেকড়ের থেকে ভিন্ন এক প্রাচীন নেকড়ে গোষ্ঠী থেকেই কুকুরের উদ্ভব। কুকুরই ছিল মানুষের প্রথম গৃহপালিত প্রাণী। এরপর মানুষ ছাগল, ভেড়া, গরু ও বিড়াল গৃহপালিত করে।

গবেষণাটির প্রধান লেখক ও ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট অ্যাংলিয়ার জিনতত্ত্ববিদ অ্যান্ডার্স বার্গস্ট্রম বলেছেন, মানুষের জীবনে বড় ধরনের রূপান্তর ও জটিল সমাজ গঠনের সময় থেকেই কুকুর আমাদের পাশে ছিল। মজার ব্যাপার হলো, অন্যান্য গৃহপালিত প্রাণীর তুলনায় কুকুরের ভূমিকা বা মানুষের জন্য প্রয়োজনীয়তা সবসময় খুব স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত নয়। সম্ভবত তাদের প্রধান ভূমিকাটি ছিল কেবল সঙ্গ দেওয়া।

বার্গস্ট্রমের নেতৃত্বে গবেষক দল ইউরোপের প্রাথমিক যুগের কুকুর খুঁজতে ব্যাপক জরিপ চালায়। জরিপে বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, স্কটল্যান্ড, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড ও তুরস্ক থেকে প্রাপ্ত ৪৬ হাজার থেকে ২ হাজার বছর পুরনো ২১৬টি নমুনায় তারা কুকুর ও নেকড়ের মধ্যে জিনগত পার্থক্য নির্ণয়ে একটি নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এটি এখন পর্যন্ত প্রাচীন কুকুরের হাড় নিয়ে করা সবচেয়ে বড় গবেষণা।

গবেষকেরা ৪৬টি কুকুর ও ৯৫টি নেকড়ের নমুনা শনাক্ত করতে সক্ষম হন। কুকুর গৃহপালনের প্রাথমিক পর্যায়ে কুকুর ও নেকড়ের কঙ্কাল এতই একই রকম ছিল যে এদের মধ্যে পার্থক্য করতে প্রাচীন নমুনায় জিনগত গবেষণা প্রয়োজন হয়।

গবেষণায় সুইজারল্যান্ডের কেসলারলোক গুহা থেকে পাওয়া ১৪ হাজার ২০০ বছর আগের একটি কুকুরকেও প্রাচীনতমদের মধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া ইউরোপের এসব কুকুরের সঙ্গে এশিয়া ও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের কুকুরের মিল পাওয়া গেছে, যা থেকে বোঝা যায় বিভিন্ন জনপদের কুকুর আলাদা আলাদা গৃহপালন ঘটনার ফলে সৃষ্টি হয়নি।

উইলিয়াম মার্শের গবেষণায় শনাক্ত হওয়া পিনারবাসির কুকুর থেকে বোঝা যায় কুকুর শিকারী–সংগ্রাহকদের কাছে কতটা মূল্যবান ছিল। মার্শ জানান, ‘পিনারবাসিতে তারা মানুষের সমাধির পাশাপাশি কুকুরের সমাধিও সন্ধান পেয়েছেন। প্রমাণ পাওয়া গেছে পিনারবাসির লোকেরা কুকুরকে মাছ খাওয়াতেন।

এই গবেষণায় ১৫ হাজার ৮০০ থেকে ১৪ হাজার ৩০০ বছর আগের পাঁচটি কুকুরের সন্ধান পাওয়া যায়। এর মধ্যে ইংল্যান্ডের চেডারের কাছে গফস গুহায় পাওয়া কুকুরের দেহাবশেষে মৃত্যুর পর কিছু পরিবর্তনের চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা মানুষের দাফন প্রথার সঙ্গে কিছুটা মিল রয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, পিনারবাসি ও গফস গুহার কুকুরগুলো আর্কটিকের জাত যেমন সাইবেরিয়ান হাস্কির চেয়ে বর্তমান ইউরোপীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের জাতগুলোর (যেমন বক্সার ও স্যালুকি) পূর্বসূরিদের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত।

গবেষকদের ধারণা, প্রাচীন কুকুর শুধু সঙ্গী হিসেবেই নয়, শিকার করতে সাহায্য করা বা পাহারাদার হিসেবেও কাজ করত। যদিও আজকের বিভিন্ন জাতের কুকুরের তুলনায় সেই সময়ের কুকুর দেখতে অনেকটাই নেকড়ের মতো ছিল।

এখনও কবে, কোথায় ও কেন মানুষ কুকুরকে গৃহপালিত করেছিল— এর বেশিরভাগ প্রশ্নেরই উত্তর অজানা রয়ে গেছে বলে জানান অ্যান্ডার্স বার্গস্ট্রমে। তার ধারণা, এটি সম্ভবত এশিয়ার কোনো অঞ্চলে শুরু হয়েছিল। সূত্র: এআরওয়াই নিউজ।

    শেয়ার করুন: