যদি

লোকালয় ছেড়ে কেউ সমুদ্রের তলদেশে থাকে নাকি? কিন্তু আমার দীর্ঘদিনের ইচ্ছাটা অবশেষে পূরণ হয়েছে। আমি এখন স্থায়ীভাবে সমুদ্রের তলদেশের বাসিন্দা। এখানে এসির দরকার হয় না, সারাক্ষণ ঠান্ডা। শব্দদূষণ নেই, বাইকের হর্ন নেই, পাশের বাড়ির ঝগড়া নেই। এত অনিয়ম, অবহেলা ও জঞ্জাল দেখতে হয় না। সকাল হলেই জানালা দিয়ে জলের ভেতর দিয়ে সূর্যের আলো আমার ঘরে ঢোকে। মানব সম্প্রদায়ের মধ্যে একমাত্র আমিই সমুদ্রের তলদেশে থাকি। এতদিনেও আর কাউকে চোখে পড়েনি। এজন্য মাছসমাজে আমি বিশাল গুরু। ওরা মানুষের চেয়ে আমাকে বেশি সম্মান করে। আমি এখন আর মানুষ নই; মাছ সম্প্রদায় আমার নাম দিয়েছে ‘দুই-পা-ওয়ালা গুরু’।
এখানে আরামের কথা আর কী বলব? ঘুম থেকে উঠলেই চিংড়ি মাছ এসে পায়ে সুড়সুড়ি দেয়, অক্টোপাস এসে ঘর ঝাড়ু দিয়ে যায়। খাওয়ার চিন্তা নেই, শ্যাওলার স্যুপ, ঝিনুকের ভর্তা— সবই ফ্রেশ। সবচেয়ে বড় আরাম— এখানে কেউ কাউকে বাঁশ দেয় না।
মাঝেমধ্যে আমার বাড়িতে সালিশি বসে। গতকালও একটা সালিশ বসেছিল— আমি ভাব নিচ্ছি, যেন জজ সাহেব! সালিশিতে মাছেদের আগমন মানেই বিরাট ঝামেলা। হাঙর সাহেব সবার শেষে আসেন। এসেই বললেন, ‘গুরু, বিচার তাড়াতাড়ি শেষ করেন, আমার যেতে হবে।’
নিয়ম অনুযায়ী, এদের আপ্যায়ন করতে হয়। শ্যাওলা পাতার চা খাওয়ালেই চলে। চিনি একদম লাগে না, ওখানে লোনা চা-ই বেশি জনপ্রিয়। লবণ বেশি-কম নিয়ে কথা নেই— কারণ, পুরো সমুদ্রটাই লবণাক্ত।
শ্যাওলার চা, প্রবালের বিস্কুট খেয়ে-দেয়ে সবাই বলল, ‘গুরু, বিচারটা যেন ভালো হয়।’ অথচ ওদের বিচার করতে হয় না খুব বেশি। শুধু বলেছি, ‘তোমরা সবাই এখন থেকে মিলেমিশে থাকো।’ মাছেরা খুশি হয়ে চলে যায়। আর আমি বসে বসে ভাবি, ওপরে মানুষের সালিশি আর নিচে মাছের সালিশি— কত পার্থক্য!
সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলতেই দেখি, একঝাঁক পুঁটি মাছ স্কুলে যাচ্ছে। আমি বলি, ‘কীরে, কোথায় যাস?’ ওরা বলল, ‘আর বইলো না ভাই, আজ হাঙর স্যারের ক্লাস আছে, দেরি হলেই বকা খাব!’
দুপুরে একটু শ্যাওলার চা খাই। প্রথম প্রথম ভাবতাম, এ কেমন খাবার, পানসে! এখন বুঝি, এইটাই অমৃত। একটু নোনতা, একটু ঘাস ঘাস, খেলেই মনে হয় সমুদ্রটা পুরো পেটের ভেতর সাঁতার কাটছে।
বিকালে অক্টোপাস মামার সঙ্গে আড্ডা। তার আটটা হাত, প্রতিটি হাতেই আট ধরনের কাজ করে আর আমাকে মাঝেমধ্যে জ্ঞান দেয়। তখন মনে পড়ল মনুষ্য সম্প্রদায়ের কথা— তারাও তো জ্ঞান দিতে ভালোবাসে।
আর রাতে? রাতে তিমি মাছ এসে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, ‘ঘুমাও, ওপরের দুনিয়াটা বড় কঠিন, এখানেই ভালো আছো। তোমাকে আমরা গুরু মানি।’
আমি তখন চোখ বন্ধ করি, আর ভাবি— মানুষ টাকা খোঁজে, বাড়ি খোঁজে, সুখ খোঁজে। আর সুখ তো এখানেই পড়ে আছে, সমুদ্রের তলদেশে, মাছেদের গল্পে আর একটু শ্যাওলার স্বাদে।



