কবুতরের বাড়ি চেনার রহস্য

আকাশপথে সাইনবোর্ড নেই, নেই কোনো মানচিত্র। থাকলেও কবুতর নিশ্চয়ই সেগুলো ধরে ঘরে ফিরতে পারত না? কবুতরকে কয়েকশ কিলোমিটার দূরে নিয়ে ছেড়ে দিলেও সে অবিশ্বাস্য নির্ভুলতায় নিজের ঘরে ফিরে আসতে পারে। যুগের পর যুগ এই ছোট্ট পাখিগুলো মানুষের বার্তা বহন করেছে দূরদূরান্তে। কিন্তু কীভাবে? কবুতরের এ রহস্যময় ক্ষমতার উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা এবার এমন এক আবিষ্কারের সামনে দাঁড়িয়েছেন, যা সবাইকে চমকে দিয়েছে। খবর, এপির।
বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, কবুতররা পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র অনুভব করতে পারে। কেউ বলতেন, এ ক্ষমতা তাদের চোখে থাকা আলো-সংবেদনশীল অণুর মাধ্যমে কাজ করে। আবার কারও ধারণা ছিল, রহস্য লুকিয়ে রয়েছে তাদের ঠোঁট বা ভেতরের কানে।
জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট অব অ্যানিমেল বিহেভিয়ারের বিজ্ঞানী মার্টিন উইকেলস্কি বলেছেন, ‘প্রায় ১০০ বছর ধরে চৌম্বক অনুভূতির রহস্য বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছে।’ এ রহস্যের সমাধান খুঁজতে গবেষকরা কবুতরের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ পরীক্ষা করতে শুরু করেন। তারা ভেবেছিলেন, হয়তো চোখ বা ঠোঁটেই মিলবে উত্তর। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, সবচেয়ে শক্তিশালী চৌম্বক সংকেত তারা খুঁজে পেলেন কবুতরের যকৃতে— অর্থাৎ লিভারে।
আরও বিস্ময়কর ছিল পরবর্তী পরীক্ষা। লিভারের কিছু বিশেষ রোগপ্রতিরোধী কোষ, যেগুলো লোহা জমা করে রাখে, সাময়িকভাবে সরিয়ে দেওয়া হলে কবুতরগুলো পথ চিনতে হিমশিম খেতে শুরু করে। তারা আর আগের মতো সহজে বাড়ির পথ খুঁজে পায়নি।
যদিও এ সমস্যা দেখা দিয়েছিল মূলত মেঘলা দিনে। কারণ রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে কবুতররা সূর্যকেও পথপ্রদর্শক হিসেবে ব্যবহার করে। অর্থাৎ তাদের কাছে একাধিক ‘নেভিগেশন সিস্টেম’ থাকতে পারে। গবেষকদের ধারণা, লিভারের এই লৌহসমৃদ্ধ কোষগুলো পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র শনাক্ত করে কাছাকাছি থাকা স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে সেই তথ্য মস্তিষ্কে পাঠায়। আর সে তথ্যই কবুতরকে বলে দেয় কোন দিকে উড়তে হবে।
সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণা নতুন এক সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। গবেষকদের মতে, শুধু কবুতর নয়— ইঁদুরসহ অনেক প্রাণী হয়তো একই ধরনের ‘জৈবিক জিপিএস’ ব্যবহার করে।
তবে বিজ্ঞানীরা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নন। তাদের মতে, বিষয়টি প্রমাণ করতে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ একই ধরনের কোষ কবুতরের ঠোঁট ও প্লীহাতেও পাওয়া গেছে।
সম্ভবত প্রকৃতি এ রহস্যের জন্য একটিমাত্র উপায় বেছে নেয়নি। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া, নির্দিষ্ট গন্তব্য খুঁজে পাওয়া কিংবা অন্ধকারে ঘরে ফেরা— ভিন্ন পরিস্থিতিতে কবুতররা ভিন্ন কৌশল ব্যবহার করতে পারে। আর হয়তো এটিই প্রকৃতির বুদ্ধিমত্তা— বাড়ি ফেরার জন্য একাধিক পথ জানা সবসময়ই নিরাপদ।




