অতএব

আমার অফিসের পাশেই একটা ফার্নিচারের শোরুম আছে। আর সেই শোরুমে প্রতিদিন একজন লোক আসেন। অন্তত ১০ দিন ধরে তাকে দেখছি। প্রতিদিন একটা করে চেয়ার কেনেন তিনি। প্রথম দিন কাঠের চেয়ার কিনলেন। দ্বিতীয় দিন প্লাস্টিকের। তৃতীয় দিন একটা ঘূর্ণায়মান চেয়ার। চতুর্থ দিন লোহার। পঞ্চম দিন ফোম লাগানো হাতাছাড়া চেয়ার। দোকানি ব্যাপক খুশি। এমন ক্রেতা প্রতিদিন এলে শুধু চেয়ার বিক্রি করলেই চলে।
একদিন জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাই, এত চেয়ার দিয়ে কী করেন?’
তিনি বললেন, ‘বসার জন্য।’
আমি বললাম,‘প্রতিদিন একটা করে চেয়ার কিনলে একসময় তো ঘরে চেয়ার রাখার জায়গা থাকবে না।’
তিনি হেসে বললেন, ‘আপনি শুধু চেয়ার দেখছেন। আমি দেখছি মানুষ।’
কথাটা বুঝলাম না। লোকটা চলে গেলেন। পরদিন আবার দেখা। এবার তিনি একটা ছোট্ট মোড়ার দামদর করছেন।
দোকানি বললেন, ‘আপনি তো রোজ চেয়ার কেনেন। আজ মোড়া কেন স্যার?’
লোকটা বললেন, ‘সব মানুষের পছন্দ এক না।’
আমি পাশে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলাম। কৌতূহল সামলাতে না পেরে বললাম, ‘আপনি কি আসবাবের ব্যবসা করেন?’
তিনি বললেন, ‘না। আমি গবেষণা করি। মানুষের নানা আচরণ নিয়ে গবেষণা। এই মুহূর্তে মানুষের বসার অভ্যাস নিয়ে গবেষণা করছি।’
তারপর তিনি পকেট থেকে একটা খাতা বের করলেন। সেখানে অনেক মানুষের নাম লেখা। নামের পাশে লেখা— চেয়ারে বসে পায়ের ওপর পা রাখেন। বুক থাকে সোজা। মানুষকে হুকুম দিতে পছন্দ করেন। কারও পাশে— বসার আগে চেয়ার পরীক্ষা করেন। বসে আবার পরীক্ষা করেন। খুঁতখুঁতে স্বভাবের লোক। একজনের নামের পাশে লেখা— নিজে বসেন না, অন্যকে বসতে দেন। নিজেকে অতি বিনয়ী প্রমাণের চেষ্টা থাকে।
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘এত কিছু খেয়াল করেন কীভাবে?’
তিনি বললেন, ‘মানুষের কথা শুনলে মানুষকে সবসময় চেনা যায় না। মানুষ বসলে চেনা যায়।’
কথাটা খারাপ লাগল না। পরদিন অফিসে এসে দেখি, আমার চেয়ারে একজন সহকর্মী বসে আছেন। আমি বললাম, ‘এটা আমার চেয়ার।’
তিনি বললেন, ‘আপনি তো এখনো বসেননি। তাই একটু বসেছি।’
আমি কিছু বললাম না। হঠাৎ চেয়ার গবেষকের কথা মনে পড়ল। বিকালে তার সঙ্গে দেখা। অফিসের ঘটনাটা বলতেই তিনি খাতায় কিছু লিখলেন।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী লিখলেন?’
তিনি বললেন, ‘আপনি সবসময় নিজের চেয়ার হারানোর ভয় করেন।’
আমি প্রতিবাদ করতে গিয়েও থেমে গেলাম। মানুষটা অদ্ভুত। মাথায় কিছুটা সমস্যাও থাকতে পারে। তাই কথা বাড়ালাম না।
গবেষক এবার দামি একটা অফিস চেয়ার কিনলেন। দোকানি বললেন, ‘এত দাম দিয়ে চেয়ার কিনছেন কেন স্যার?’
তিনি বললেন, ‘এটা আমার নিজের জন্য। নিজেকে দামি জায়গায় দেখার আনন্দ আছে।’
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘এতদিন অন্যদের বসা নিয়ে গবেষণা করলেন। এবার নিজে বসবেন?’
লোকটা চেয়ার হাতে নিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ। এই চেয়ারে কাউকে বসতে দেব না।’
তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘অন্যের আচরণ দেখে মানুষকে চেনা যায়। কিন্তু নিজের চেয়ারে অন্য কাউকে বসতে দেখলে নিজের আচরণটাও বেরিয়ে পড়ে।’
চেয়ার গবেষক কী বোঝাতে চাইছেন, সেটা পরিষ্কার নয়। আমাকেও ইঙ্গিত করতে পারেন। তবে চেয়ারের গুরুত্বটা বোঝা যাচ্ছে। নিজের চেয়ার নিয়েও ভয় হচ্ছে এখন। চেয়ারটা ঠিকঠাক আছে কি না, অফিসে ফিরে একবার দেখে নেওয়া দরকার।



