আমার স্বপ্ন ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম এক রাতে। ১৯৭১ সালের কথা। আগস্ট মাস। মুক্তিযুদ্ধ চূড়ান্ত পর্যায়ে। আমার এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। এপ্রিল মাসে পাকিস্তান সরকার পরীক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। সেই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ঢাকা আর বিক্রমপুরে আসা-যাওয়া করে দিন কাটে।
ওই সময়টায় ঢাকায় ছিলাম। গেন্ডারিয়ার সাবেক শরাফতগঞ্জ লেনে বাসা। ভোররাতের দিকে স্বপ্ন দেখলাম, ডান দিককার মাড়ির একটা দাঁত পড়ে গেল। সকালবেলা উঠে মাকে বললাম। শুনে মায়ের মুখে আতঙ্ক দেখা দিল। ভয়ার্ত স্বরে বললেন, ‘মাড়ির দাঁত পড়ে যাওয়ার স্বপ্ন ভালো না। এই স্বপ্ন দেখলে খুব কাছের কেউ মারা যায়।’ শুনে আমি হাসলাম। ‘ধুৎ, এসব বাজে কথা।’ কিন্তু দেড় মাসের মাথায় স্বপ্ন সত্য হয়ে গেল। অক্টোবরের ৭ তারিখে আমার বাবা মারা গেলেন। সেই স্বপ্নের কথা আমি আজও ভুলিনি।
এ ঘটনার বহু বছর পর আরেক স্বপ্ন দেখলাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে নিয়ে। সে কথা বলার আগে সুনীলের সঙ্গে পরিচয়ের দিনগুলোর কথা বলি। এই সব্যসাচী লেখককে প্রথমে দেখেছিলাম ১৯৭৪ সালে। বাংলা একাডেমিতে আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন হচ্ছিল। সেই সম্মেলনে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও আরও কয়েকজন সাহিত্যিক অংশগ্রহণ করেছিলেন। কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতাটি পড়েছিলেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায় পড়েছিলেন ‘অবনী বাড়ি আছো?’। মঞ্চের অদূরে দাঁড়িয়ে সেই প্রথম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে দেখা। তার সঙ্গে পরিচয় হলো ’৭৮ সালের শেষ দিকে। সেবার ‘দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষ আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কী যেন কী কাজে ঢাকায় এসেছিলেন। ইত্তেফাক ভবন থেকে ‘রোববার’ নামে সাপ্তাহিক পত্রিকা বেরোবে। জুনিয়র রিপোর্টার হিসেবে সেই পত্রিকায় জয়েন করেছি। নির্বাহী সম্পাদক রফিক আজাদ। পত্রিকার মালিক ও প্রকাশক ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন সাহেবের স্ত্রী সাজু হোসেন। আবদুল হাফিজ নামের এক ভদ্রলোক সম্পাদক। তিনি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। ভালো অনুবাদ করতেন। রাহাত খান ছিলেন পত্রিকাটির সার্বিক ব্যবস্থাপনায়। ঢাকা ক্লাবে সাগরময় ঘোষ ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সম্মানে ডিনারের আয়োজন করেছিল ‘রোববার’ পত্রিকা। সেই সন্ধ্যায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার পরিচয়। বেলাল চৌধুরীর সঙ্গে ছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের গভীর বন্ধুত্ব। এক-দু বছর পরপরই তিনি বেলাল চৌধুরীর আমন্ত্রণে ঢাকায় আসতেন। গাজী শাহাবুদ্দিন আহমেদের বাড়িতে সুনীলদাকে ঘিরে তুমুল আড্ডা হতো। আমি সেসব আড্ডায় যেতাম।
সুনীলদার সঙ্গে একত্রে চার দিন কাটানো হলো ১৯৯৬ সালের ইলেকশনের সময়। সেবার বিদেশ থেকে ইলেকশন অবজারভার হিসেবে বেশ কিছু নামি ব্যক্তিত্ব এসেছিলেন। ভারত থেকে এসেছিলেন কিংবদন্তি ক্রিকেটার মনসুর আলী খান পতৌদি আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। বাংলাদেশ থেকে সুনীলের সঙ্গে অবজারভার হিসেবে দেওয়া হলো আমাকে। যেতে হবে বরিশাল অঞ্চলে। সেখানকার ভোটাভুটির অবস্থা লক্ষ করতে হবে। দুপুর ১২টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে আমরা গিয়েছিলাম জীবনানন্দ দাশের ‘ধানসিড়ি নদীর সন্ধানে’। সুনীলদার ইচ্ছাতেই যেতে হয়েছিল। তিনি জীবনানন্দ দাশের খুবই অনুরক্ত।
আশ্চর্য ব্যাপার, ‘ধানসিড়ি নদী’র নামই জানেন না কেউ। নদীটি কোথায়, তাও জানেন না। একেকজন একেক রকম কথা বলেন। আমরা একটা গাড়ি নিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরছি। নদীর খবরই নেই। শেষ পর্যন্ত সাহিত্যের খোঁজখবর রাখেন এমন একজনকে পাওয়া গেল। তার কথামতো নদীতীরে পৌঁছালাম। নদী দেখে আমাদের দুজনেরই মন খারাপ হয়ে গেল। নদী তো নয়, শীর্ণ একটি খাল। এপারে গৃহস্থলোকের ঘরবাড়ি, মহিলারা থালাবাসন ধোয়ার কাজ করছেন, ওপারে কিছু বাবলা গাছ। পাগলা কিসিমের একজন মাঝি পাওয়া গেল। সে নদীটা কিছুক্ষণ ঘুরিয়ে দেখাল। মাঝির একটা কথা এখনো আমার মনে আছে, বাবলা গাছগুলো দেখিয়ে বলেছিল, ‘গাছগুলান খুব গরম।’ সেই গরমের অর্থ সুনীলদা বা আমি কেউ বুঝিনি।
রাতে ঘটল এক ঘটনা। আমরা এক রুমেই আছি। সুনীলদা পান করলেন। খাওয়া-দাওয়া সেরে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আমাকে বললেন, ‘তোমার বোধ হয় একটু অসুবিধা হবে। আমি খুব নাক ডাকি।’ নাক তো অনেকেই ডাকেন। এ আর এমন কী? শোয়ার মিনিটখানেকের মধ্যে সুনীলদা ঘুমিয়ে গেলেন। শুরু হলো তার নাক ডাকা। সে কি ডাক! একটা পর্যায়ে আমার মনে হলো, তার নাক ডাকার শব্দে হোটেলের সবার ঘুম ভেঙে যাবে, হয়তোবা পুরো বরিশাল শহরই জেগে উঠবে। শুধু সে রাতটিই নয়, তারপর আরও তিনটি রাত এই আজাব আমার সহ্য করতে হয়েছে। রাতে একটা মিনিটও ঘুমাতে পারিনি। কলকাতায় ফিরে গিয়ে ‘দেশ’ পত্রিকায় তিনি একটি ভ্রমণকাহিনি লিখেছিলেন। ‘ধানসিড়ি নদীর সন্ধানে’।
সুনীলদার সঙ্গে নিউ ইয়র্কে গিয়েছি, লস অ্যাঞ্জেলেসে গিয়েছি। দুটোই ছিল সাহিত্যের অনুষ্ঠান। তিনি তার বেশ কয়েকটি উপন্যাসে আমার নাম উল্লেখ করেছেন। ‘পঞ্চাশ বছর’ নামের বইটি আমাকে উৎসর্গ করেছেন। এ আমার এক বিরল সৌভাগ্য। কলকাতায় গেলেই তার সঙ্গে দেখা করতাম। তার ফ্ল্যাটে বা ‘বুধসন্ধ্যার’ অফিসে অথবা ‘দেশ’ পত্রিকার অফিসে অনেক সময় কাটিয়েছি তার সঙ্গে। আমি যে হোটেলে উঠতাম, সেখানেও তিনি আমার সঙ্গে আড্ডা দিতে আসতেন। এক রাতের আড্ডায় আমার রুমে এসেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, শেখর বসু ও বাদল বসু। সে ছিল এক অবিস্মরণীয় আড্ডা।
২০১২ সালে দিল্লির ‘সুরমা চৌধুরী স্মৃতি আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কার’ পেয়েছিলেন ভারত ও বাংলাদেশের ছয়জন লেখক। ভারতের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, প্রফুল্ল রায় ও সমরেশ মজুমদার। বাংলাদেশ থেকে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সেলিনা হোসেন ও আমি। আমি পেয়েছিলাম ‘নূরজাহান’ উপন্যাসের জন্য। যত দূর মনে পড়ে, আমেরিকায় বসবাস করা আফগানিস্তানের ইংরেজি ভাষার লেখক খালেদ হোসাইনিও এই পুরস্কার পেয়েছিলেন সম্ভবত তার ‘কাইট রানার’ উপন্যাসের জন্য। এই উপন্যাসটির কাহিনি অবলম্বনে হলিউডে সিনেমাও হয়েছে।
পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে সুনীলদার সঙ্গে দেখা হলো। তাকে দেখে আমি চমকে উঠলাম। শরীর-চেহারা ভেঙে তিনি একেবারে জবুথবু হয়ে গেছেন। বললেন, ‘শরীরটা ভালো যাচ্ছে না।’ সেটা বোধ হয় এপ্রিল-মে মাসের কথা। আমি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের যেকোনো বই পেলেই পড়ি। অতি মধুময় ভাষায় তিনি লেখেন। তার অতি দুর্বল রচনাটিও সুখপাঠ্য। সে বছর আগস্ট মাসের দিকে পড়ছিলাম তার ‘সপ্তম অভিযান’ ও ‘স্বর্গের নীচে মানুষ’ উপন্যাস দুটো। পড়ার কিছুদিন পর এক রাতে স্বপ্নে দেখি, তার সঙ্গে নির্জন এক বনভূমি আর মাঠপ্রান্তরে বেড়াতে গিয়েছি। হাঁটতে হাঁটতে একটি পাহাড়ি নদীর সামনে এসেছি দুজনে। আমি ক্লান্ত হয়ে নদীতীরে বসে পড়লাম। শীর্ণ খালের মতো নদী, তবে খরস্রোতা। হাঁটুজলের বেশি গভীর হবে না। ওপারে নিবিড় বনভূমি। সুনীলদাকে দেখি, কোনো কথা না বলে নদীতে নেমে গেলেন। ভারী শরীর নিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে নদী পেরোলেন। ওপারে উঠে একবার আমার দিকে তাকালেন। তারপর বনভূমির ছায়াময়তার ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। বেশ কয়েকটি দিন এই স্বপ্নের ঘোরের মধ্যে আমি থাকলাম। কেন এ রকম অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম? সেবারও স্বপ্নটা দেখেছিলাম আগস্ট মাসেই। সেবারও ঘটনা ঘটল অক্টোবরেই। ২৩ অক্টোবর ২০১২। ‘কালের কণ্ঠ’র অফিসে ছিলাম। আমার স্ত্রী ফোন করে বললেন, ‘তুমি মন খারাপ করো না, সুনীলদা মারা গেছেন।’ ঠিক সে মুহূর্তে আমার মনে পড়েছিল, অদ্ভুত সেই স্বপ্নের কথা। খরস্রোতা পাহাড়ি নদী পেরিয়ে সুনীলদা হারিয়ে যাচ্ছেন বনের ছায়াময়তার ভেতরে আর আমি এপারে বসে আছি। স্বপ্নের ভেতর দিয়ে প্রকৃতি যে কত রহস্যময়তার ইঙ্গিত দেয়!



