বিকৃত আত্মা ও উৎপলের প্রেমের কবিতা

উৎপলকুমার বসু
১.
উৎপলকুমার বসুর কবিতায় বাক্যকে আক্রমণ করা হয়। যার কারণে উনি অবলীলায় কইতে পারেন— ‘লেখায় আমি কনটেন্টের দিক থেকে আসিনি, এসেছি ফর্মের দিক থেকে।’ উনি আরো ঘোষণা দিছিলেন, ‘আমাদের, নির্মমভাবে, এক নতুন ভাষা তৈরি করা দরকার। আমাদের প্রচলিত বাক্যরীতি, শব্দব্যবহার সমস্তই বর্জন করে এক অভিনব গদ্য তৈরি করা দরকার যা দিয়ে নাটক গল্প কবিতা সব লেখা চলে। এজন্য আমাদের বের করতে হবে গ্রাসের শব্দ, লৌকিক বাক্যরীতি, আসামি উড়িয়া বিহারি বাক্যরীতি, আমাদের যে নতুন ভাষা তৈরি হবে—তা হল ঐ বিভিন্ন পদ্ধতির সমন্বয়।’ তার প্রেমের কবিতার ভিতরদি হাঁটতে বার হইলে ভাষার এই বিবেচনাও মাথায় রাখতে হয়। উৎপলকুমার বসু সেকুলার মতাদর্শের বিনির্মাণধর্মী কবি।
ফলে তার প্রেম মরমী বা বৈষ্ণব প্রেমের পুরুষের সাধনা তাতে নাই। তবে সেইখানে জৈব-প্রকৃতির মাননীয় একচ্ছত্র প্রেমের বেলুন উড়াইছেন। দৈব উচ্ছেদকৃত ভূমিতে সেই মানবীয় বিলে নদীতে উৎপল প্রেমের উৎপল ভাসতে দেখছেন। সেই প্রেমের স্বরূপ উৎঘাটন করা দরকার। প্রেমের সেই ‘স্বরূপ’ উৎঘাটন সম্ভব হয় টেক্সেটের নানা উপস্থাপনার ভিতর।
মানবীয় কইলাম এই মন্ত্রে যে ইউরোপীয় রিজনের রাজত্ব কায়েম হওয়ার কারণে রেনেসাঁর মানবধ্বজা, মানবকেন্দ্রিকতার উদ্ভাবনার ধারাবাহিকতার যুগ এখনও এই ভারতীয় বাংলায় শেষ হয় নাই! বরং সম্প্রসারণ ও বিস্তারণের একটা মহাকালে তা হাজির। শরীরের উপস্থাপনা বাক্য অপেক্ষা উৎকট। যখন ধর্ম-সাহিত্যের মধ্যখানে একটি হাইপেন ইতোমধ্যে হাজির হইছে। আমরা দেখছি জয়দেবের কিংবা পরে বিদ্যাপদি, বড়ু চন্ডীদাসের নায়িকাদের ‘নগ্নতা’ খোলামেলা, মিলন ও ভোগ। তখনও ভোগ আর প্রেমের ভিতর বিচ্ছেদ ঘটে নাই। দেহের আগে ‘ইরোটিক’ বা ‘নৈতিক’ তকমা জোড়া হয় নাই। ইরোটিক বা সেক্সবডির সহিত উপর সামাজিক আরোপণ ঘোরচাপ সৃষ্টি করে নাই। আত্মার অধীন যে দেহ তার ভিতর বিচ্ছেদ হয় নাই। ‘আত্মা’ প্রভুর অংশ। আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্রীয় ইডিয়ম এই আত্মা। দেহ এই তুচ্ছ জাগতিক পাপের কাদা মাটির নানা উপাদানের অস্বর্গীয় অংশ। আত্মা স্বর্গীয় অংশ। দেহ ও আত্মা ভিন্ন না অভিন্ন এই তর্ক বহুত আগের। অস্বর্গীয় দেহের ‘কাম’ ও ‘যৌনতা’ এক সমার্থক শব্দ না। কাম ও যৌনতাকে স্বর্গীয় অনুভূতির সাথে বর্হিভূত করি একটা ন্যারেটিভ তৈয়ার করা হইছে। আবার কামের মধ্যে যে ব্যাপকতা ও নানা আবেগের সম্মিলন তার এই দেহ-আত্মা অভেদ্যতার তত্ত্ব অনেক পরে আসছে— যা ধর্মসাহিত্যের যুগে হাজির ছিল না। দেহরে এই যে যুগে যুগে নানা ভাবে দেখা উৎপল তার এক সাক্ষাৎকারে বলছেন বিষয়টি নিয়া। দেহরে নিয়া নানা টানা-হেঁচড়া হইছে যুগে যুগে তা ধর্মের বাইরেও দেহরে দেখার একটা চোখ ছিল, যেমন, ত্রুবাদুরদের কবিতায় যেইভাবে দেহ আসছে।
জীবাত্মা ও পরমাত্মা, পুরুষ ও প্রকৃতি, এশক ও মাসুকের এইসব ন্যারিটিভ ভারতীয় চিন্তার কেন্দ্রে এই শরীরকে বাদ দিয়া ছিল না। আত্মার আত্মায় বিলীন হওয়ার আকুতিই প্রেমের ঘটনা। কখনও শরীর পবিত্র কখনও শরীর অপবিত্র বস্তু হিসাবে আসছে। শরীর-আত্মার যৌথ প্রজোজনায় লৌকিকতার মধ্যে অলৌকিকতাকে স্থান করি দেয়া হয় ‘হৃদয় ও প্রাণ’ এর স্বীকৃতির মধ্য দিয়া। এই হৃদয় যেন আত্মা মুক্ত বাট আত্মার মতো শরীর-ঊর্ধ্ব একটা মর্যদা পাইল। এই ‘হৃদয়’ জিনিসটা বাঙলা কবিতায় চালু হইল প্রথম কবে বলা কঠিন। তবে সেকুলার জীবনানন্দ দাশের কবিতার তার ব্যাপক ব্যবহার পাওয়া যায় যাকে সেকুলারদের নিকট আত্মারই মিনিং উৎপাদন করে। তবে রবীন্ত্রনাথের প্রাণ ও হৃদয়ের মধ্যে পার্থক্য তৈয়ার করছিলেন তা প্রায় শরীর ও আত্মারই দ্যোতক। প্রাণ শরীরের দ্যোতক আর হৃদয় আত্মার দ্যোতক। রবীন্দ্রনাথের গানে এই হৃদয় ও প্রাণের বিশাল ব্যাপকতার প্রকাশ ঘটান। আত্মাকে এইভাবে রবীন্ত্রনাথ তার গানে বর্জন করছিলেন তাতে করি আমাদের মতো সেকুলাররা রবীন্দ্রগানে আরাম পাই। তার গানেতেই মুগ্ধ হই। আত্মার জায়গায় উনি হৃদয়রে বসাইতে পারছিলেন এইটা বড় একটা কৃতিত্ব উনার ভাবা হয়। কারণ এতে সেকুলারগণের ইহচর্যার ভিতর স্পেস ক্রিয়েট হইল।
দেহই আত্মা এই ধারণার ঘোষণা দিছেন যেমন নিটশে। কারণ তাতে ট্রান্সেন্ডেন্সের মৃত্যু ঘটে। দেহের উপর ঐশীর রাজত্ব খর্ব হয়। দেহের একাধারে স্বাধীন হইতে থাকার পথে যাত্রা করে। সেই দেহ কি শুধু পুরুষ নাকি তা নারীর। প্রেমের ক্ষেত্রে দেহের ব্যাপকতার কারণেই এতসব চিন্তার অবতারণা।
উৎপলের প্রেম-ঘেঁষা কবিতায় উৎপল যে আত্মা উৎপাদন করছেন তা ক্লান্তি ও নিঃসঙ্গতায় মোড়া ইহ গ্লানিতে ভারাক্রান্ত হৃদয়েরই পরিণতিময় দশা। কথিত আত্মাতে ক্লান্তি অবস্থান নিতে পারে না। কারণ আত্মা জাগতিকতা ধারণ করে না। সে জাগতিকতার সহিত সংঘাত সংঘর্ষের ডাইনামিক্সে লিপ্ত হয় না। তাই সুফি বা আধ্যাত্মিকগণের বা সাধকের নিকট আত্মা যে চেহারা তা আমাদের সেকুলার কবি উৎপলের কাছে বিকৃত আত্মা বা বিকেন্দ্রীভূত বা বিনির্মাণের ফলে তৈয়ার হওয়া ‘হৃদয়’। উৎপলের প্রথম দিগকার এইসব প্রেমের কবিতায় স্পেসের সাথে ব্যক্তি কবির সত্তার যে সম্পর্ক প্রকাশ ঘটে তা জ্বরা ও বিকেন্দ্রীকতার পথ অনুসন্ধানের কারণে প্রচল প্রেমের বাইরে উনারে অবস্থান নিতে হইছে। আমরা পরে দেখিব কবি উৎপল-অদিতির প্রেম যমুনার তীরে তাজমহলে ভিন্ন স্পেস-টাইমে ঘটতেছে বটে। ভাই-বোনের যৌন সম্পর্করে উপস্থাপনায় শৈল্পিক ডাইনামিক্স তৈয়ার আধুনিক ‘বিকৃত আত্ম’র হৃদয়ে অবসান ঘটানোর নামান্তর।
উৎপল একান্ত সাক্ষাৎকারে আমারে বলছিলেন যে উনি প্রেমের মানব-মানবীর মধ্যে যে সম্পর্ক এ যাবত বাংলা কবিতায় উপন্যাসে বেশি বেশি আসছে। যেই প্রেমের মধ্যে বিবাহের সম্পর্ক জিয়ানো থাকে। সেই প্রেমের ভিতর বন্ধুত্ব যেন সংকোচিত। যেই প্রেমরে আমাদের সমাজ-রাষ্ট্র স্বীকৃতি দিছে। কারণ তার পরিণতি বৈবাহিকতায় পর্যবসিত হইবার সম্ভবনা রহিয়াছে। তাই প্রেম মূলত ছদ্মবেশী বিবাহ একটি ডিফেক্টো মর্যদা পাইতে থাকে। সমাজ স্বীকৃত ব্যাপার, প্রায় লিগ্যাল একটা ব্যাপার। কারণ সমাজে বিবাহের স্বীকৃতি আছে। প্রেমের স্বীকৃতি বিবাহে নিহিত। যে গাছ ফল দিবে তার শৈশব আমাদের নিকট স্বীকৃত। যে গাছ কাঠ ফল কিছুই দেয় না তার স্বীকৃতি প্রকৃতির বৈচিত্রতার বিচারে ফেলায়ে সেই গাছরে নিম্নতরমর্যদায় গ্রহণ করি। বাংলা কবিতায় নামীকবিদের মধ্যে উনিই বোধ হয় কম সংখ্যক প্রেমের কবিতা লিখছেন। কিন্তু বিশাল বাংলা কবিতার শরীরের সেই একখান-দুখান প্রেমের কবিতা তিল আকারে প্রেমের কবিতার সৌন্দর্যরে উসকায়ে দিছে। যেন বিশাল মরুভূমিতে খন্ডকালীন বৃষ্টিপাত। সংবেদনশীলতার চারায়ন আর বহুমাত্রিক প্রেমপুষ্পভরা বসুন্ধরার সহিত পরিচয় ঘটে। প্রেমের কবিতা ধরা যাক তার ‘নবধারাজলে’ নামক কবিতাখানি। কিংবা ‘প্রিয়তমা’ আধুনিক প্রেমের কবিতায় প্রায় প্রবাদ হিসাবে উপস্থপনায় হাজির হয়। পুরা কবিতাটাই এইখানে উঠায়ে দিই:
মন মানে না বৃষ্টি হলো এত
সমস্ত রাত ডুবো-নদীর পারে
আমি তোমার স্বপ্নে-পাওয়া আঙুল
স্পর্শ করি জলের অধিকারে।
এখন এক ঢেউ দোলানো ফুলে
ভাবনাহীন বৃত্ত ঘিরে রাখে-
স্রোতের মতো স্রোতস্বনী তুমি
ঐা-কিছু ঠানো প্রবল দুর্বিপাকে।
তাদের জয় শঙ্কাহীন এত
এন মানে না সহজ কোনো জলে
চিরদিনের নদী চলুক, পাখি।
একটি নৌকা পারাপারের ছলে
স্পর্শ করে অন্য নানা ফুল
অন্য দেশ, অন্য কোনো রাজার,
তোমার গ্রামে, রেলব্রিজের তলে,
ভোরবেলা রৌদ্রে বসে বাজার।
(নবধারাজলে, চৈত্রে রচিত কবিতা)
উৎপল নায়ক-নায়িকার মৈথুনী প্রেমে তা যেন গরহাজির না হইয়া যায় সেইদিকে অতীব না বেখেয়াল ছিলেন। ফলে নবধারাজলে’র নায়কের মনে নায়িকার স্বপ্নে-পাওয়া আঙুল স্পর্শ করে জল হই। কারণ জলের অধিকার আছে যে তার কাছে আসে তারে ভিজায়ে দেওয়ার। স্বপ্নে নায়িকা আসছে জলের কাছে, জল নায়িকাকে স্পর্শ করার অধিকার সংরক্ষণ করে যেন ইহা নিয়তিগত উৎস। ফলে তা যেন পরস্পর অঙ্গগত।
উৎপল নিছক প্রেমের কবিতা বলতে নর-নারীর ভিতরের মৈথুনঅংশরে বুঝতেন না। এর সাথে সদা যুক্ত রয় সমাজ-প্রকৃতি-মানুষের এক মায়াময় সম্পর্ক। সম্পর্কগুলি আলাদা নামের আলাদা রূপ-রসের কিন্তু তাদের ঐক্য আছে তারা বিচ্ছিন্ন না। সমাজ যেন অনেক বৈচিত্র্য কিছুকে ধারণ করি তার বুনিয়াদ তৈয়ার করে। এথনোগ্রাফিক চিত্র কবির অগোচরেই চলিয়া আসে। সমাজ একই সাথে ধর্মীয় আবার ধর্মের বাইরের জিনিসরে সে নেয়। যা ধর্মে স্থান পায় না, তাহা সমাজে পায়। ধর্মে বেশ্যালয় নিষিদ্ধ, কিন্তু সমাজে তা প্রচলিত। সমাজের ধারণ ক্ষমতা যেন বেশি। তবে ধর্মের ভিতর যে ক্ষমা, দয়া, তওবা তাহা সংবেদনশীলতাকে অনেক মর্যাদা দেয়। এইখানে বলা ভালো যে, ব্যাখ্যার ভিন্নতার কারণে ধর্ম-বিরোধিতা, ধর্মের প্রতি অবিচারও সমাজ করে। সমাজের সেই অস্বস্তির জায়গা থাকিই সেকুলারগণের অবিশ্বাসীগণের অসহিষ্ণুতার জন্ম হয়। ধর্ম ও সমাজের একটা সেতু তৈয়ার করা প্রয়োজন সংহতির প্রশ্নে। ধর্ম ও সমাজের ভিতর সেই ডায়ালগ বন্ধ হইলে অন্ধ অন্ধকার পয়দা হয়। উৎপল সেই অন্ধকাররে লাঠি দিয়া পিটাইছেন বটে!
২.
‘একটা মনোজগৎ, তার সঙ্গে ভাষাজগৎ এবং ভাষাজগতের সঙ্গে ত্রিভুজ হিসাবে একটা যৌনতার জগৎ আছে। এই যে যৌনসচেতনতা, আজ প্রমাণিত, এটা জন্মমূহূর্ত থেকেই থাকে। শোনা যাচ্ছে, মায়ের পেটে থাকার সময়েও যৌনতা একটা ভূমিকা পালন করতে থাকে। আমৃত্যু একজন ব্যক্তি এই যে একটা জিনিস বহন করে চলেছে-সেক্সুয়ালিটি— এ বড় একটা ডমিনেটিং ফ্যাক্টর, আমাদের জীবনে একটা কনট্রোলিং ফ্যাক্টর, এর সঙ্গে ভাষার একটা সম্পর্ক আছে। এখন, ভাষা বা যৌনতা কীভাবে উদ্রেক হয়, কোনটা কীভাবে প্রভাবিত করে, বাইরের লেখকদের ক্ষেত্রে তার বিশ্লেষণ করতে আমি রাজি নই; কিন্তু আমার নিজের লেখায় চিরদিনই এগুলো ভয়ঙ্করভাবে ফিরে এসেছে।’
‘কবিদের মধ্যে এমন একটা মারাত্মক ক্ষমতা আছে! তারা সমাজের মধ্যে একটা সাবভারসিভ রোল প্লে করতে পারে। উপরে যা মেনে নেওয়া হচ্ছে, ভিতরে ভিতরে কবিরা তা সম্পূর্ণ নষ্ট করে দিতে পারে। আরও বিস্তৃতভাবে বলা যায়, যেকোনো সভ্যতা যখন খুব বড় ধরনের হয়ে ওঠে, তখন তার ভিতরের ধবংসের বীজ গাছ হয়ে বিকশিত হয়। এই ফেটালিজম জগৎজুড়ে, সব ইতিহাসে দেখা যায়। কিন্তু এখানে পাইয়োনিয়ার হচ্ছে কবিরা। তাদের ছবি-আঁকিয়েদের মতো মালমশলা নিয়ে ঘুরতে হয় না, লেখার জন্য এক টুকরো কাগজ পেনসিল হলেই হল। আর ওই ওর্যাল সাহিত্যের যুগে কবিরা কোথায় কাকে কী বলে বেড়াচ্ছে, কী ছড়া কাটছেন, গান বাঁধছেন তাও নিয়ন্ত্রণের উপায় নেই।
এই যে দেহ ও দেহজ প্রেমকে ভিত্তি করে রচিত ত্রবাদুর সাহিত্য – এর মধ্যে যিশুর উল্লেখ পর্যন্ত নেই, ধর্মীয় চিন্তার লেশমাত্র নেই, আমি ও আমার প্রেমিকা-এটাই প্রধান। এক কিছুটা রোমানন্টিক বলা যেতে পারে। ওই ধারার সমন্বয় ঘটল দান্তের মধ্যে। দান্তের সঙ্গে সঙ্গে মধ্যযুগের শেষ ও আধুনিক মানসিকতার শুরু। … আমাদের দেশে যেমন চৈতন্যদেবের মধ্যযুগের সূচনা এবং রবীন্দ্রনাথে এর শেষ। এখন রবীন্দ্রনাথ মধ্যযুগের শেষ না আধুনিক যুগের শুরু এ প্রশ্ন উঠতেই পারে।’
‘সমুদ্রসাঁতার মেয়েদের ক্লান্ত করে। শুধু একজন
ভাসছে সহজ নীল জলের ভিতর । তার জামাখোলা স্তন
ঢেকে যায় বুদবুদে। আমার পায়ের নীচে সওে যাক বালি :
তার এই কথা ফুরোতেই আরেক বিশাল ঢেউ বলে : এসা, চালি
নতুন পাশার দান। তুমি নাকি ভালো খেলোয়াড়?
ঢেউ অটুট দাঁড়িয়ে থাকে। ভাঙে শুধু বালির পাহাড়।
সমুদ্রসাঁতারে নৌকার ক্লান্তি কত- আমি একদিন
ওর কাছে জেনে নিতে যাই। আমারো তো কিছুটা প্রবীণ,
কিছুটা গভীর সত্য শোনবার ইচ্ছা হয়।
আমার স্তনের দিকে চেয়ে থাকো, এর চেয়ে বেশি সত্যময়
খুজো না অন্য কিছু : হেন উক্তি তার।
আমি অটুট দাঁড়িয়ে থাকি। ভাঙে শুধু বালির পাহাড়।
সমুদ্রসাঁতারে শ্মশানের কালো কাঠ ক্লান্ত হয় নাকি?
প্রশ্নের মতো জেনো উত্তরেও যথেষ্ট চালাকি
লুকানো থাকতে পারে। আমাদেও কৌতূহল তত কালো নয়
যতটা আগুনে পোড়া। আজ খোলা-গিঁট হাঙরের ভয়
উপক’ল স্তব্ধ রাখে। সম্ভবত আর
সমুদ্রে নামো না যারা, জাপ্টে ধরো বালির পাহাড়।’
(সতর্কবার্তা, লোচনদাস কারিগর)
‘হে রুয়া, আদিম পিতা, আবির্ভাবমাত্র তুমি আপন লিঙ্গের অবাস্তব
দৈর্ঘ নিয়ে উচাটন করেছিলে জ্যোস্নার বিশাল গহ্বর’
(আমার আত্মার মাঝে)
কিংবা
‘প্রিয়তমা, তোমার চুলের
ভিতরে দেখছি আমি ভারতীয় ভূমিজরিপের যন্ত্রগুলি…
প্রিয়তমা, দেখছি তোমার কালো স্তন,
দেখছি এবার ধর্মপ্রচারকগণ
সেঁটে দিচ্ছে ইস্তাহার
দেখছি তোমার কালো স্তন ভরে যায় ধর্মীয় দ্রুতলিখন অক্ষরে’
(প্রিয়তমা, আবারপুরী সিরিজ)
‘দিতি-অদিতির কোলে মাথা রেখে ডুবে যায় শেষরজনীর চাদঁ/
আজ ঈগলের, পাখিদের রাজা দেখা দিক।’
(চিঠিপত্র)
‘আমি কান পেতে শুনছি কোলাহল, শোভাযাত্রা, দৈববাণী-
স্ত্রীলোকের রক্তক্ষরণ হচ্ছে এই মহাউৎসবের দিনে’
(পিপাসা, আবার পুরী সিরিজ)
‘এখন ডাটা শাক ফুলে ভরে উঠল, স্ত্রীলোকেরাও বেশ রসালো হয়ে
উঠেছে- তাদের পুরুষদের কাছে আরো দাও আরো দাও বলে দাবি জানাচ্ছে’
(একটি প্রাচীন লিরিকে যা বলা হয়েছিল)
উৎপলই ‘স্তন’ ও ‘ধর্ম’ এই দুইটা শব্দরে প্রায়ই বিপরীত শব্দ বা স্তনের অপর ‘অপর’ হিসে ধর্মরে বর্ণনা করছেন। পরবর্র্তী সময়ে অনেক কবিরে উৎপলের স্তনভাবরে নিরাপরাধ হিসাবে চুরি করছেন ভদ্র ভাবে কইলে প্রভাবিত হইছেন।
নারী একটা চোরাবালি। কিংবা বালির পাহাড়। কিংবা উনি যৌনতার ভিতর নারীর অংশগ্রহণ একটা সমুদ্র-সাঁতার হিসাবে বর্ণনা করছেন। শক্তি যেমন, ‘ধর্ম’ ও ‘জিরাফ’রে এক অপরের বিপরীত দ্যোতনা তৈয়ার করি মিথ সৃষ্টি করছেন তেমনি উৎপল ধর্মরে স্তনের বিপরীতে।
উৎপলের এইসব কবিতায় বুদ্ধির ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্যনীয়। যখনি উনার মনে হইছে কোনো জায়গা এরোটিক হইছে তখনি উনি তারে ঢাকার জন্য ব্যস্ত হই আকাশ তারা ব্রহ্মান্ড দিয়া লজ্জাস্থানগুলি ডাকছেন বস্ত্র হিসাবে। কারণ জীবনানন্দ দাশ তার চাকরি হারাইছিলেন ‘ঘাই হরিণী’ এই শব্দবন্দের কারণে ক্যাম্পে কবিতার জন্য কলেজের অধ্যাপনার চাকরি হারাই ছিলেন। উৎপলও চাকরি হারাইছিলেন কলেজের সেইটা আরেক ভিন্ন কারণে। তখন তিনি বিলাতে হিজরত করছিলেন আমাদের মনে আছে।
৩.
সূর্য ডুবে যায় দ্রুত। অগ্নিনির্বাপক
জাল রসায়নরাশি ফেটে পড়ে চতুর্দিকে। আমি তাজমহলের
পৈঠায় দাঁড়িয়ে ভাবি এবার বিশ্রাম
সপ্তর্ষিমন্ডল এসে দাঁড়িয়েছে তাজমহলের নর্মমিনার ঘিরে
অর্থাৎ বিশ্রাম
অর্থাৎ সঙ্কেত পাঠাচ্ছে ও টুকে নেয় সান্ধ্যবিমান
যমুনার দুই তীরে গাঢ় হয় তরমুজবন
বেলা চলে গেল।
এবার অদিতি আমি তোমারই কোলের কাছে সরাসরি পড়ে যেতে থাকি
ধর্মচ্যুত, আশ্রয়হীন
নিজেরই বোনের প্রতি যৌনতা ও উপদ্রব আমি লক্ষ্য করি
নক্ষত্রসন্ধির প্রতি ঝুকে পড়ে শাহীবাগ গম্ভীর আগুন
নিয়ে ক্রীড়াশীল, ক্ষমা নেই, নির্দেশ, অপরাধবোধ,
দেখাও অদিতি।
অর্থৎ আমাকে তুমি সমসাময়িক জাল রসায়ন দিয়ে
স্পষ্ট করে তোলো, কোলে পড়ে আছে গ্রীষ্মেও ক্রোড়পত্রখানি,
উপনয়নের তুলা উড়ছে বাতাসে,
তাজমহলের সিঁড়ির কিনার দিয়ে গর্ভবতীদের আমি ক্রমাগত
উঁচু বারান্দার দিকে উঠে যেতে দেখি
এবার বিশ্রাম
অর্থাৎ সম্ভব হল সৌন্দর্য ও সন্তানবেদনা
বিদ্যুৎ পড়ে এল নক্সাহীন ধূসর পাথর থেকে
উৎক্ষিপ্ত হল পাখা মানুষের
মানুষেরই উড্ডীন ব্যথা ঘিরে দেখা হল সান্ধ্যবিমান থেকে
পরস্পর তাজমহলের যুথ, চাঁদ ওঠে পূবে
চাঁদ চলে যায় পশ্চিমের নক্ষত্রবিহীন মাঠে যেখানে প্রবল
ডানায়, নিশ্বাসে, শব্দে উৎখাত হতে থাকে হৃদয় হৃদয়
হৃদয় তোমারই প্রতি যেত থাকি নর।
(বোনের সঙ্গে তাজমহলে, পুরী সিরিজ)
‘বোনের সাথে তাজমহলে’ উৎপলের একটা ব্যাপক পরিচিত কবিতা। এই কবিতার বিষয় যখন ব্যবিচারী প্রেম অর্থাং বোন ও ভাইয়ের বিচ্ছেদরে উনি বোনের প্রতি ভাইয়ের বা উল্টাভাবে প্রেমমূলক যৌনতা দিয়া উত্তর দিতে চাইছেন এই কবিতায়।
‘এবার অদিতি আমি তোমারই কোলের কাছে সরাসরি পড়ে যেতে থাকি
ধর্মচ্যুত, আশ্রয়হীন
নিজেরই বোনের প্রতি যৌনতা ও উপদ্রব আমি লক্ষ্য করি’
এই লাইনগুলাই মূল কথা আর বাদবাকি লাইন ইশারা-টিশারা শীতের লেপ-তোষক। উৎপলিক ইশারা-টিশারার জগৎ। আমরা এইভাবে কবিতায় ঢাকিয়া-টাকিয়া থাকি ।
উনার এই কবিতারে আরও একভাবে এর মিনিং হাজির করা যায়। আমাদের সমাজে ধর্ম-সংস্কৃতি সভ্যতার নিচে চাপা-পড়ি আছে হাজারো ইনসেস্ট সম্পর্ক। চাপাপড়া সেইসব সম্পর্কের মধ্যে ভাই-বোনের আদিম কোনো বাধাহীন প্রেমরে উনি উদ্ধারকর্মী হিসেবে কবিতায় হাজির করছেন।
ব্যক্তিগতভাবেও আমার সাথে উনি স্পষ্টই এ-ব্যাপারে কইছিলেন। এই সম্পর্করে উনি সংবেদনশীলতার স্তরে আনতে নিয়ত উদ্যোগী। ফলে ফ্রয়েডিয় ইনসেস্ট যারপরনাই হাজির হয়। ট্যাবু ভাঙার খেলায় উৎপল আগ্রহী বেশি। উৎপল নিজকণ্ঠে ‘বোনের সঙ্গে তাজমহলে’এই কবিতার অংশবিশেষ শোনাইছিলেন।
এইসব কথার অবতারণা হইছিল যখন আমি উনারে কইছিলাম- বিনয়ের কবিতায় অবলিলায় লিঙ্গচিহ্নসহ নায়ক-নায়িকা মৈথুন আসিয়া পড়ে। এইটা আমার কাছে ততটা আকর্ষণীয় মনে হয় না! সেই প্রসঙ্গে তিনি তার প্রেমের কবিতার বিষয়ে নানা আভাষ দিছিলেন। আমি উনার সাক্ষাৎকার অংশে অনেক কথায় আনি নাই, তাও সামাজিক কারণে।





