শীর্ষেন্দু: জীবনপাঠের এক পাঠশালা

সংগৃহীত ছবি
দুপুরের ঠিক পরপর যখন রোদটা একটু অলস হয়ে আসে, ঘরের কোণের পর্দাটা সামান্য দুলে ওঠে উদাস বাতাসে— তখন হুট করেই মনে হতে পারে, এই চেনা দৃশ্যটার ওপারেই বুঝি লুকিয়ে আছে অন্য কোনো জগৎ। হয়তো একটু খুঁজলেই দেখা মিলবে শেওলাধরা পাঁচিলের ওপর বসে থাকা কোনো একলা ভূতের, যে ভয় দেখাতে নয়, এসেছে স্রেফ দুটো সুখ-দুঃখের গল্প করতে।
কিংবা হয়তো কোনো গলির মোড়ে দেখা হয়ে যাবে চাদর গায়ে হেঁটে যাওয়া এক অদ্ভুত মানুষের সঙ্গে, যার ঝুলিতে আছে আশ্চর্য সব ম্যাজিক। এ যে অতি সাধারণ জীবনের সমান্তরালে একটা মায়াবী জগৎ তৈরি করা, এই জাদুটি যিনি দশকের পর দশক ধরে বাঙালিকে শিখিয়ে যাচ্ছেন, আজ (২ নভেম্বর) তার জন্মদিন।
১৯৩৫ সালের এই দিনটিতেই ময়মনসিংহের এক মফস্বলি আলো-ছায়ায় জন্ম নিয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের পরমাত্মীয় শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। রেলের চাকরিজীবী বাবার হাত ধরে ঘুরেছেন কত চেনা-অচেনা স্টেশনে— আসাম, পূর্ববঙ্গ আর বিহারের কত বিচিত্র প্রান্তর।
দেশভাগের মেঘলা দিনে এপার বাংলায় চলে এলেও মনের ভেতর রয়ে গিয়েছিল সেই ফেলে আসা নদী আর মেঠোপথ। পৈতৃক নিবাস বিক্রমপুরের বাইনখাড়া গ্রামটি সশরীরে দূরে হারিয়ে গেলেও, কল্পনার জাদুতে তিনি তাকেই বারবার ফিরিয়ে এনেছেন ‘নশঙ্কর’ গ্রামের আবহে। জলপাইগুড়ির ফণীন্দ্র দেব ইনস্টিটিউশন আর কোচবিহারের ভিক্টোরিয়া কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তরের বারান্দা— তার জীবনের এ প্রতিটি বাঁকই যেন একেকটি গল্পের খসড়া। পরে স্কুলশিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও, শব্দ আর কল্পনার যে ডাক তিনি পেয়েছিলেন, তা উপেক্ষা করা তার পক্ষে ছিল অসম্ভব।
১৯৫৯ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রথম গল্প ‘জলতরঙ্গ’ দিয়ে যে যাত্রার শুরু, তার ঠিক সাত বছর পর একই পত্রিকার পূজাবার্ষিকীতে তার প্রথম উপন্যাস ‘ঘুণপোকা’ যখন বাংলা সাহিত্যজগতে পা রাখল, চমকে উঠেছিল পাঠক। চেনা ছকের বাইরে গিয়ে এক অন্যরকম আত্মানুসন্ধান আর মনস্তত্ত্বের খেলা। এরপর একে একে ‘দূরবীন’, ‘পারাপার’ কিংবা ‘পার্থিব’-র মতো কালজয়ী সৃষ্টিতে তিনি দেখালেন, মানুষ আসলে ওপর থেকে যতটা সাধারণ, ভেতরে ঠিক ততটাই রহস্যময়। ১৯৮৮ সালে যখন তিনি তার বিখ্যাত
‘মানবজমিন’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেলেন, ততদিনে বাঙালি বুঝে গেছে— এই কলম শুধু গল্প লেখে না, জীবনের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক আধ্যাত্মিক আর দার্শনিক সত্যকে খুব সহজে ছুঁয়ে দেয়। এর আগে ১৯৮৫ সালে শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য বিদ্যাসাগর পুরস্কার, ১৯৭৩ ও ১৯৯০ সালের আনন্দ পুরস্কার, ২০১২ সালের বঙ্গবিভূষণ এবং ২০২১ সালের সাহিত্য অকাদেমির সর্বোচ্চ ‘ফেলো’ সম্মাননা— তার প্রাপ্তির ঝুলিটি শুধু তারই যোগ্যতায় ভারী হয়েছে।
আসলে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় মানেই তো এক আশ্চর্য ক্যানভাস। সেখানে যেমন লালবাজারের খসখসে বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে গোয়েন্দা শবর দাশগুপ্ত তার তীক্ষ্ণ চোখ জোড়া নিয়ে অপরাধীর মনস্তত্ত্ব মাপেন, তেমনই আবার বরোদাচরণের মতো চরিত্ররা অদ্ভুত সব কাণ্ড ঘটিয়ে আমাদের অবলীলায় হাসায়। কিংবা ‘ফাটিক’-এর মতো সাধারণ এক কিশোরের ভেতরের চঞ্চলতা আর মায়া আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় নিজেদের কৈশোরে। ছোটদের জন্য তার লেখা প্রথম উপন্যাস ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’র হাত ধরে যে অদ্ভুতুড়ে সিরিজের সূচনা হয়েছিল, তা ‘গোসাঁই-বাগানের ভূত’, ‘হিরের আংটি’, ‘পাতালঘর’ কিংবা ‘ছায়াময়’ হয়ে আজ এক চিরকালীন ছুটির দুপুর, যা জীবনের কোনো বয়সেই এসে ফুরিয়ে যায় না।
বাংলা সাহিত্যের আকালের এ সময়ে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের প্রাসঙ্গিকতা সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল ও অনিবার্য। যান্ত্রিক জীবনের জটিলতায় যখন তৈরি হচ্ছে মানবিক মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের সংকট, তার সাহিত্য তখন পাঠককে জোগায় জীবনের এক পরম আধ্যাত্মিক ও মায়াবী সান্ত্বনা। বড়দের জটিল মনস্তত্ত্ব আর আধ্যাত্মিক অন্বেষণকে তিনি যেভাবে তার লেখায় ফুটিয়ে তুলেছেন, তা এক পলিমাটির মতো কাজ করে বর্তমানের ক্ষয়িষ্ণু জীবনবোধে। অন্যদিকে, ছোটদের জন্য তার সৃষ্টি করা নিষ্পাপ ও অতিপ্রাকৃতিক অদ্ভুতুড়ে জগৎ আজকের প্রযুক্তিনির্ভর এবং যান্ত্রিক শৈশবকে উপহার দেয় এক চিলতে বিশুদ্ধ কল্পনার আকাশ। সস্তা চটকদার লেখার ভিড়ে জীবনকে গভীরভাবে চেনার ও ভালোবাসার এক শাশ্বত পাঠশালা হিসেবে শীর্ষেন্দু আজীবন বেঁচে থাকবেন আমাদের মধ্যে।
বয়স তো শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় জমে থাকা কিছু ধুলোবালি। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের বয়স ৯১ ছুঁলেও তার ভেতরের সেই চিরতরুণ গল্প বলিয়ে মানুষটা আজও সমান সতেজ, আজও তিনি বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে এক বটবৃক্ষ। তার জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় আরও দীর্ঘকাল ঋদ্ধ হোক আমাদের এই অবহেলিত বাংলা সাহিত্য। শতায়ু হোন, শ্রদ্ধাস্পদেষু শীর্ষেন্দুদা!



