মাকে কেন ‘মিসেস রায়’ বলতেন অরুন্ধতী রায়

অরুন্ধতী রায়ের মায়ের নাম মেরি রায়। তাকে নিয়েই লেখা ‘মাদার মেরি কামস টু মি’
মাদার মেরি কামস টু মি— বিটলসের ‘লেট ইট বি’ গানের দ্বিতীয় লাইন। পল ম্যাককার্টনি তার মা মেরিকে নিয়ে লিখেছিলেন গানটি। সহ-রচয়িতা ছিলেন জন লেনন (১৯৪০-১৯৮০)। অরুন্ধতী রায়ের মায়ের নামও মেরি। বিটলসের গান থেকেই বইয়ের নামটি নেয়া।
উৎসর্গ বার্তায় অরুন্ধতী লিখেছেন—‘For Mary Roy, who never said Let It Be.’ কথাটার মধ্যে একটা বৌদ্ধিক রসিকতা আছে। বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানের দিনও অরুন্ধতী মজা করে বলেছিলেন, এখানে তিনজন মেরি আছেন। খ্রিস্টধর্মের কুমারী মেরি, পল ম্যাককার্টনির মা আর আমার মা। তিনজনের মধ্যে মিল কেবল নামের। তাদের জীবন ও স্বভাব আলাদা।
আটপৌরে বাংলায়—‘লেট ইট বি’ কথাটার অর্থ সবকিছু মেনে নেওয়া, ছেড়ে দেয়া, পরিস্থিতি তার মতো চলতে দেয়া। তবে অরুন্ধতীর মা মেরি রায়ের (১৯৩৩-২০২২) স্বভাবে এসব কিছু ছিল না। তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকতেন, অন্যের জীবনে নিজের ইচ্ছের ছাপও রাখতে চাইতেন। মেয়ের সঙ্গে তার সম্পর্কের বড় অংশ জুড়ে ছিল নিয়ন্ত্রণের লড়াই। অরুন্ধতী একসময় বাড়ি ছেড়ে চলে যান।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে মেরি রায়ের মৃত্যুর পর অরুন্ধতী কেরালায় আসেন। বিমানের জানালা দিয়ে পরিচিত ভূখণ্ড দেখতে দেখতে তিনি ভাবেন, এই দৃশ্যের সঙ্গে মাকে আলাদা করে ভাবা প্রায় অসম্ভব। এদিকে মেরি রায়ের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়েছে, সংবাদপত্রে শোকবার্তা প্রকাশিত হচ্ছে, স্কুলের প্রাঙ্গণে শেষকৃত্যের আয়োজন। অরুন্ধতী নিজেকে প্রশ্ন করছেন, মাকে ঠিক কীভাবে বিদায় জানানো উচিত? আর প্রশ্নের ভেতর দিয়েই বইটি লেখা শুরু হয়।
মেরি রায়ের জীবন ছিল সময়ের তুলনায় ব্যতিক্রমী। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা আর সম্পত্তির মালিকানায় মেয়েদের অধিকার না থাকা নিয়ে তিনি সচেতন ছিলেন। বিয়ে করেছিলেন রাজীব মাইকেল রায়কে। দাম্পত্যজীবন সুখের হয়নি। বিয়ে ভেঙে গেলে দুই সন্তান অরুন্ধতী আর ললিতকে নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন। সেখানেও তার জন্য অপেক্ষা করছিল পারিবারিক বিরোধ। বাবার সম্পত্তিতে মেয়ের অধিকার নিয়ে আপত্তি ওঠে। শুরু হয় দীর্ঘ আইনি লড়াই।
তৎকালীন ট্রাভাঙ্কোর ক্রিশ্চিয়ান উত্তরাধিকার আইনে সম্পত্তিতে মেয়েদের অধিকার ছিল না বললেই চলে। মেরি সেই বৈষম্যে ঘোচাতে আদালতে যান। মামলা করেন। ১৯৮৬ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট তার পক্ষে ঐতিহাসিক রায় দেয়। পুরোনো বৈষম্যমূলক বিধানের পরিবর্তে ভারতীয় উত্তরাধিকার আইন কার্যকর হয়। সিরীয় ক্রিশ্চিয়ান নারীদের সম্পত্তিতে অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে।
মেরি রায়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর প্রত্যাশার বাইরে অরুন্ধতী আর ললিতের কোনো জীবন ছিল না। এমনকি অরুন্ধতী আর ললিত তাকে ‘মা’ না বলে ‘মিসেস রায়’ বলে ডাকতেন। সম্বোধনের ভেতরে মেরি এমন একটা দূরত্ব তৈরি করেছিলেন যা মাতৃত্বের প্রচলিত ধারণায় খুব একটা দেখা যায় না
তবে অরুন্ধতীর বইয়ের মেরি রায়কে শুধু মামলার আলোয় দেখলে চেনা যাবে না। তার আরেকটি বড় কাজ কোট্টায়ামের পল্লিকুডাম স্কুল (পূর্বনাম কর্পাস ক্রিস্টি হাই স্কুল)। প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলার পেছনে ছিল মেরি রায়ের শিক্ষাভাবনা, সাংগঠনিক ক্ষমতা এবং নিজের শর্তে কিছু তৈরি করার প্রবল আকাঙ্ক্ষা। স্কুলপ্রধান হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। সন্তানদের জীবনেও সেই কঠোরতার ছাপ এসে পড়েছিল। যদিও তিনি সম্পত্তিতে মেয়েদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়েছেন, তবে নিজের মেয়ের স্বাধীনতার প্রশ্নে নিয়ন্ত্রণের জায়গা থেকে সরে আসতে পারেননি। এমন বৈপরীত্যকে কোনো সহজ ব্যাখ্যায় মেলানো যায় না।
বইটিতে অরুন্ধতী মায়ের রাগের কথা লিখেছেন, অপমান করার অভ্যাসের কথা লিখেছেন, সন্তানদের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করার কথা লিখেছেন। মেরির ব্যক্তিত্বে যেমন ছিল অসাধারণ সাহস, তেমনি ছিল নিষ্ঠুরতা। কখনো তার আচরণ এতটাই অপ্রত্যাশিত হয়ে উঠত যে বাড়ির সবাইকে সতর্ক থাকতে হতো। মেরি নিজেও মাতৃত্বকে কোনো স্বাভাবিক, আনন্দময় দায়িত্ব হিসেবে দেখতেন না। সন্তানদের নিয়ে মায়ের বিরক্তি, তাদের প্রতি অসন্তোষ, নিজের জীবন তাদের জন্য উৎসর্গ করতে না চাওয়ার মনোভাব অরুন্ধতী আড়াল করেননি।
আড়ালের মিনার মাহমুদ
৩১ অক্টোবর ২০২৬
অরুন্ধতীর শৈশবের অনেকটা সময় কেটেছে মায়ের স্কুল, মায়ের নিয়ম, মায়ের ছাত্রছাত্রী, মায়ের কর্মজগত ঘিরে। তবে স্বস্তি পাননি। মেরি রায়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর প্রত্যাশার বাইরে অরুন্ধতী আর ললিতের কোনো জীবন ছিল না। এমনকি অরুন্ধতী আর ললিত তাকে ‘মা’ না বলে ‘মিসেস রায়’ বলে ডাকতেন। সম্বোধনের ভেতরে মেরি এমন একটা দূরত্ব তৈরি করেছিলেন যা মাতৃত্বের প্রচলিত ধারণায় খুব একটা দেখা যায় না।
অরুন্ধতীর জীবনে মেরি রায়ের প্রভাব অবশ্য ক্ষত আর শাসনের মধ্যে আটকে ছিল না। মেরিই তাকে বইয়ের জগতে নিয়ে গিয়েছিলেন। শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি এবং নিজের মতামত প্রকাশের সাহসের সঙ্গে মেরিই তাকে পরিচয় করিয়েছিলেন। অরুন্ধতী তার কাছ থেকেই শিখেছিলেন, সমাজের প্রচলিত নিয়মকে কিভাবে প্রশ্ন করতে হয়; আর সেখানেই ছিল অদ্ভুত বৈপরীত্য। মেরি মেয়েকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শিখিয়েছিলেন, কিন্তু স্বাধীনভাবে বাঁচার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি।
আঠারো বছর বয়সে অরুন্ধতী যখন বাড়ি ছেড়ে দিল্লিতে যান, তখন তার হাতে কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যৎ ছিল না। স্থাপত্যবিদ্যায় পড়ছিলেন। সামনে কী করবেন জানতেন না। দিল্লির জীবন ছিল অনিশ্চিত, অর্থের অভাব ছিল, থাকার জায়গাও সবসময় নিরাপদ ছিল না। তবে বিটলসের গান তার মধ্যে একটা মুক্তির পরিসর তৈরি করে দিয়েছিল। ‘শি ইজ লিভিং হোম’ গানটি বাড়ি ছাড়বার আগে বারবার শুনতেন। হয়তো গানটির সঙ্গে নিজের জীবনের মিল খুঁজে পেয়েছিলেন।
দিল্লিতে অরুন্ধতীর জীবন ক্রমে অন্য দিকে এগোচ্ছিল। পড়াশোনা, চলচ্চিত্রের কাজ, চিত্রনাট্য লেখা, ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভাঙাগড়া— এসবের ভেতর দিয়েই লেখকজীবনের দিকে এগোচ্ছিলেন। প্রথম উপন্যাস ‘গড অব স্মল থিংস’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালে। উপন্যাসটি প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক সাফল্য আসে। তিনি বুকার পুরস্কার পান। কেরালার আয়েমানাম গ্রাম, পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, সামাজিক ট্যাবু, জাতপাত, ভালোবাসা আর ক্ষমতার সংঘাত নিয়ে লেখা এ উপন্যাসে তার শৈশবের ছায়া ছিল। অরুন্ধতীর স্মৃতিকথা পড়লে বোঝা যায়, একজন লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কীভাবে কল্পনার জগতে প্রবেশ করে, আবার সাহিত্যিক সাফল্যের পর সেই অভিজ্ঞতা নতুন করে দেখার সুযোগ তৈরি হয়।
মেরি মেয়েকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শিখিয়েছিলেন, কিন্তু স্বাধীনভাবে বাঁচার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি
পরবর্তী সময়ে অরুন্ধতী রাজনৈতিক লেখালেখিতে প্রবলভাবে যুক্ত হন যা আমরা সবাই কমবেশি জানি। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আর সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে অরুন্ধতীর যে অবস্থান আমরা দেখতে পাই, তার সাথে মেরি রায়ের জীবনসংগ্রামের যোগসূত্র আছে। দুজনেই কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে লড়েছেন। তবে অরুন্ধতী এখানে মায়ের কাছ থেকে পাওয়া রাজনৈতিক শিক্ষার কথা বলতে গিয়ে তাকে নির্দোষ করে তোলেননি। কারণ তিনি জানেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করলেই একজন মানুষ ব্যক্তিজীবনে ন্যায়পরায়ণ হয়ে ওঠেন না।
বইটির সবচেয়ে তীব্র দৃশ্যগুলোর একটা বোধহয় মেরির শেষ জীবনের হাসপাতাল-পর্ব। অসুস্থ, দুর্বল অবস্থাতেও তিনি চিকিৎসকদের জাত ও ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে মন্তব্য করেছেন। এতে অরুন্ধতী ক্ষুব্ধ হয়ে হাসপাতাল কক্ষেই একটা চেয়ার আছড়ে ফেলেন। শব্দে মেরির শরীর কেঁপে ওঠে। মুহূর্তে অরুন্ধতীর মনে হয়, তিনি যেন মাকে মেরে ফেলেছেন। পরে বুঝতে পারেন, মায়ের শরীর নয়, নিজের ভেতরের কিছু একটা ভেঙে দিয়েছেন তিনি।
অরুন্ধতী এখানে নিজেকেও নৈতিকভাবে নিরাপদ জায়গায় রাখেন না। মায়ের সংকীর্ণতায় ক্ষুব্ধ হওয়ার পাশাপাশি নিজের প্রতিক্রিয়াও তাকে বিচলিত করে তোলে। জাতপাত, শ্রেণিবিভাজনের বিরুদ্ধে আজীবন লিখে আসা একজন মানুষের কাছে এ ঘটনা ব্যক্তিগত ক্রোধের চেয়েও বড় প্রশ্ন তোলে, সামাজিক বৈষম্য কীভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ঢুকে পড়ে? অসুস্থ, মুমূর্ষু কিংবা মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও কি মানুষ পুরোনো সামাজিক পক্ষপাত থেকে মুক্ত হতে পারে?
মেরি রায়কে নিয়ে অরুন্ধতীর সবচেয়ে সৎ সিদ্ধান্ত সম্ভবত তাকে একরৈখিক চরিত্র হতে না দেয়া। মেরি একই সঙ্গে সাহসী ও নিষ্ঠুর, উদার ও কর্তৃত্বপরায়ণ, সৃজনশীল এবং বিধ্বংসী। তার বিদ্রোহ সবসময় ন্যায়বোধ থেকে আসেনি, কখনো কখনো এসেছে নিজের মতামত প্রতিষ্ঠার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে। আবার তার কঠোরতার আড়ালে যে ভয়, নিরাপত্তাহীনতা বা ক্ষত ছিল, সেগুলোও অরুন্ধতীর দৃষ্টি এড়ায়নি।
অরুন্ধতী দেখান, একজন মানুষকে বুঝতে হলে সাফল্যের পাশাপাশি তার কারণে অন্যরা কতটা কষ্ট পেয়েছেন, সেটাও জানতে হয়।






