ধারাবাহিক উপন্যাস
ঝরা পাতার সংসার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রায় দুপুর। বেনিচকাকে এখনো বাইরে হাঁটতে নেওয়া হয়নি। ছোট ভাই সাশা ওকে একা বাইরে নিয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে না।
সবার আদরের কুকুর বেনিচকা। ওর পুরো নামটা বেশ গালভরা— বেনেডিক্ট আলেক্সান্দ্রোভিচ পেত্রোভ! মিশমিশে কালো বেনিচকা জাতে আধা ল্যাব্রাডর।
বেনিচকার ‘পালক বাবা’ আলেক্সান্দর নিকোলায়েভিচ পেত্রভ ওরফে সাশার নবম জন্মদিন ছিল গত বছর। সেবার খাঁটি ল্যাব্রাডর ছানা ছাড়া অন্য কিছুই উপহার হিসেবে নিতে রাজি হয়নি সাশা। সে সুবাদেই পেত্রোভ পরিবারে আসা বেনিচকার। মা আর ছয় ভাইবোনের কাছ থেকে ছাড়িয়ে আনার সময় তুলতুলে ছানাটার বয়স ছিল মাত্র দেড় মাস। শেষ পর্যন্ত বেনিচকাকে পার্কে নিয়ে যাওয়ার ভারটা সাশা আমার ওপরই চাপাল। পার্ক অবশ্য কাছেই। সকালের চাপে বেনিচকা এমনিতেই ছটফট করছিল। পারলে লাফিয়ে দেয়াল টপকায়। দ্রুতই পৌঁছে গেলাম আমরা।
বাড়ির কাছের পার্কটাকে আজ কিন্তু রীতিমতো অচেনা জায়গা মনে হলো। বেঞ্চগুলো ফাঁকা। প্রেমিক-প্রেমিকার কোলে মাথা রেখে খুনসুটি চোখে পড়ল না। স্কেটবোর্ডের কেরদানি দেখিয়ে বাহবা কুড়ানো বাচ্চাগুলোর একটাও। কানে এলো না বেহালা কি গিটারের সুর, যা প্রায় অবিশ্বাস্য! দলবেঁধে উধাও শখের দাবাড়ুরাও। বিশেষ করে শেষের ব্যাপারটায় মন সত্যিই খুব খারাপ হয়ে গেল আমার। এমনিতে পার্কের এ অংশটা দাবা খেলতে আসা দেদুশকাদের দখলেই থাকে। কাজকর্মহীন বুড়োগুলোর দিনের বড় অংশ কেটে যায় এখানেই। এখন জায়গাটা অস্বাভাবিক রকম খাঁ খাঁ করছে। অথচ আগে রোদবৃষ্টি যাই হোক, দিনের শেষ আলো থাকা পর্যন্ত কমবেশি মানুষে ভরা থাকত।
পার্কটা আসলে ছিল হেরে যাওয়া মানুষগুলোর শেষ আশ্রয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের স্বপ্ন গুঁড়িয়ে যাওয়ার পর থেকে ক্লান্ত, আশাহীন সাবেক শিল্পশ্রমিকরা এখানে এসে বসত। অন্তত কিছুক্ষণের জন্য পুরনো কষ্ট ভোলার চেষ্টা চলত। পেনশনের টাকার দাম দিনকে দিন কমে ক্রয়ক্ষমতা নেমে এসেছে হাস্যকর পর্যায়ে। জীবনের এসব চাপ থেকে একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা ছিল এই পার্কটা। দাদুর সঙ্গে গল্প করে করেই আমি এসব ভারী বিষয় একটু একটু বুঝতে শিখেছি। জেনেছি, কতশত দেদুশকা তাদের বিবর্ণ স্বপ্নকে কবর দিয়েছে এখানে। হারানো দিনের সুখস্মৃতি আর স্বপ্নভঙ্গের কষ্টের মধ্যে বোঝাপড়া করতে করতে বেঁচে থাকার সাহস পেত তারা এই পার্কেই।
আসলে দাবাটা শুধু খেলা ছিল না এই বুড়োদের কাছে। বোর্ডের সাদাকালো ছকের সীমানায় তারাই ছিল রাজা, উজির। অন্যের হাতের অসহায় গুটি না। এই জায়গাটায় তাই মিলত শ্রান্তক্লান্ত জীবনের মৃদু ঝিলিক— দিনের শেষ আলোর মতো নরম, ক্ষণস্থায়ী, অথচ অদ্ভুত সুন্দর।
আঙ্কেল ভানিয়ার কাছ থেকে বাবা আর দাদু খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু খবর নিয়ে ফিরলেন। দোনেৎস্কে যুদ্ধ নাকি আরও অনেক দিন চলবে। পরিস্থিতির উন্নতির কোনো লক্ষণ তো নেই-ই, বরং দিনে দিনে তা আরও খারাপের দিকে যাবে।
ভানিয়া আঙ্কেল বাবাকে তিনজন বিদ্রোহী নেতার নাম-ঠিকানা লিখে দিয়েছেন। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকায় কোনো সমস্যায় পড়লে উনাদের কথা বললেই হবে। নামগুলো ফোনে সেভ করতে মানা করেছেন আঙ্কেল। এমনকি স্ক্রিনশটও রাখা যাবে না।
বাবার হাতে একটা ছোট লাইটারও ধরিয়ে দিয়েছেন আঙ্কেল। বলেছেন, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের শেষ চেকপোস্টটা পার হওয়ামাত্র নাম-ঠিকানা লেখা কাগজটা পুড়িয়ে ফেলতে। একেবারে হলিউডের থ্রিলার মুভির কায়দা যেন!
ভলনোভাখা রাইওন এলাকার এক গ্রামে মায়ের এক খালার একটা দাচা (সাবেক সোভিয়েতভুক্ত অঞ্চলের খামারবাড়ি) আছে। সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চলের পঞ্চাশ-ষাট কিলোমিটার ভেতরে দাচাটা। মা এরই মধ্যে তার খালার সঙ্গে কথা বলেছেন। ঠিক হয়েছে, আজ সন্ধ্যায়ই উনার কাছ থেকে দাচার চাবি নিয়ে নেব আমরা।
ইউক্রেনের স্বাধীনতার পর নব্বইয়ের দশকের অনেকটা সময় খুব অর্থনৈতিক অস্থিরতা চলে। তখন এই সামান্য দাচাই খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল দেশের মানুষের কাছে। বহু পরিবারের মতো মায়ের খালারাও তখন টিকে থাকার লড়াই করছিলেন। সেই সময় দাচা থেকে পাওয়া আলু আর বাঙ্গির ফলন তাদের বাঁচিয়ে দেয়।
দেশের অর্থনীতির দুঃসময় ধীরে ধীরে কেটে যায়। মায়ের খালাতো ভাইবোনরাও বড় হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ায়। ওদের কাছে কদর হারিয়ে ফেলে গ্রামের দাচা। সত্যি বলতে, পরে আর চাষবাসের নামও শুনতে পারত না আমার মামা-খালারা। পারবেইবা কী করে! ওদের কাছে দাচা বলতেই তো সেই দুর্দিনের স্মৃতি। ক্ষেত থেকে নিজের হাতে আলু তোলা আর হররোজ তাই দিয়ে পেট ভরানোর সেই দুঃসহ দিন।
কপালের কী ফের! তিন দশক পরে সেই দাচাই আবার বাঁচিয়ে দিচ্ছে আমাদের। বাবা আর মা মারিউপোলে কাজকর্ম না পাওয়া পর্যন্ত ওখানেই থাকতে হবে। এখনো ইউক্রেনের দখলে থাকা কাছাকাছি সবচেয়ে বড় শহর মারিউপোলই।
প্রথমে ঠিক হয়েছিল, সূর্য ওঠার পরপরই আমরা শহর ছাড়ব। পাড়ার লোকজনের প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে না তাতে। কিন্তু বাবা বলছেন, ব্যাংক থেকে টাকা না তুলে যাবে না। এটিএম মেশিনে টাকা নেই। রবিবার বলে আজ ব্যাংকও বন্ধ। তাই কাল সকালেই ব্যাংক খুললে বাবার প্রথম কাজ হবে সব হৃভনিয়া তুলে ফেলা।
মাস দুই ধরে মায়ের অফিস রাশিয়ান রুবলেই বেতন দিচ্ছে। সেই টাকাগুলো বাসাতেই ছিল। বাবা ঠিক করেছেন, হৃভনিয়া আর রুবল— দুটোই ডলার বা ইউরোতে বদলে ফেলবেন। ব্ল্যাক মার্কেটে দাম বুঝে যেটা ভালো হয়।
দাদু আর দাদি কেউই আমাদের সঙ্গে যাচ্ছেন না। সেটা কেউ আশাও করিনি। বাবা বা মা কেউই তাদের খুব বেশি জোর করার চেষ্টা করেননি। তার কারণও আছে। বয়স অনেক হলেও মানুষ দুটো মনেপ্রাণে ভালোই তরতাজা এখনো। কিন্তু দোনেৎস্ক ছাড়লে তারা বাঁচবেন না। সত্তরটা বছর ধরে তাদের গোটা অস্তিত্ব জুড়ে আছে এ শহর। এই চেনা ছন্দের দিনযাপনেই স্বস্তি বুড়োবুড়ির। সময়ের ভারে ক্লান্ত শরীর দুটো তারা এখনো বয়ে চলেছেন এর জোরেই। এই সময়ে এসে শিকড় উপড়ালে বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাই হয়তো নিভে যাবে।
কারণ আরও আছে। দাদি পার্কিনসন্সের রোগী। অবস্থা জটিল পর্যায়ে। তার কষ্ট একেকসময় খুবই অসহনীয় হয়ে ওঠে। এ নিয়েও মজা করতে ছাড়েন না দাদি। বলেন, ঈশ্বর যদি রুশ কামানের গোলায় মরণ লিখেই রাখত, তাহলে আর এই দীর্ঘদিনের আজাব চাপিয়ে দিত না। বলে রাখা দরকার, ঈশ্বরের সঙ্গে দাদির সম্পর্কটা জমেনি কোনোদিনই।
মা জিনিসপত্র বাঁধাছাঁদা করছেন। চারজন মানুষ আর চারপেয়ে বেনিচকাকে বসানোর পর জিগুলিতে মালপত্র রাখার খুব বেশি জায়গা থাকবে না।
বোঝা যাচ্ছে, আজ বাড়ির প্রতিটা জিনিসের আসল গুরুত্বের ‘শেষ বিচার’ হয়ে যাবে। ছোট গাড়িটায় ঠাঁই পাওয়ার জন্য জিনিসগুলোকে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের কঠিন লড়াইয়ে নামতে হচ্ছে।
একসময় বাসার কেউ মায়ের প্রিয় ডিনার সেটের কিছু একটা ভাঙলে সে চেঁচামেচি করে বাড়ি মাথায় করত। চরম বিরক্তি নিয়ে সেদিন যা রান্না করত, তা মুখে তোলা যেত না প্রায়। সারা দিন তার মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে থাকত।
আজ সেই প্রাণের ডিনার সেটের দিকে মায়ের খেয়ালই নেই। বাবার কিস্তিতে কেনা লম্বা স্টেইনলেস স্টিলের অতি ভারী ফ্রিজটা সংগত কারণেই পাত্তা পাচ্ছে না।
এমনকি গাড়িতে উঠল না হাতে নকশা করা চমৎকার ড্রেসডেনের ফ্লাওয়ার ভাসটাও। অথচ বাসায় কেউ বেড়াতে এলেই মা তাদের জিনিসটা দেখিয়ে তারিফ করাতে ভুলত না। দেখা গেল, শেষ পর্যন্ত গাড়িতে জায়গা পাচ্ছে মূলত সেই জিনিসগুলোই, যেগুলো ছাড়া প্রায় আক্ষরিকভাবেই পেত্রোভ পরিবারের অস্তিত্ব অচল। সেই তালিকায় আছে জন্মসনদ, পরিচয়পত্র, ব্যাংকের কাগজপত্র, বাড়ির দলিল ইত্যাদি। বাস্তব দরকারে নিতে হয়েছে কিছু জরুরি কাপড়চোপড়, বিছানার
চাদর— আর হ্যাঁ, এই মুহূর্তে হাস্যকর শোনালেও— কয়েকটা বালিশও।
আমার অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছিল আরেকটা বিষয় দেখে। দিনের পর দিন সবার চোখের আড়ালে দেয়াল আর শোকেসে ধুলা জমতে থাকা কিছু জিনিস কীভাবে হঠাৎ জীবন্ত আর অপরিহার্য হয়ে ওঠে। সাশার জন্মের সময়ের ছোট্ট পায়ের ছাপ, বাবা-মার বিয়ে, ব্রেজনেভের হাত থেকে দাদুর অর্ডার অব দ্য রেড ব্যানার নেওয়া আর আমার স্কুল গ্র্যাজুয়েশনের ছবি, দোনেৎস্ক জুনিয়র দাবা প্রতিযোগিতায় পাওয়া সাশার তামার তৈরি ‘স্বর্ণপদক’, আর ক্রাইমিয়ায় ঘুরতে যাওয়ার কয়েকটা ছবি— এসবের গাড়িতে জায়গা পাওয়া নিয়ে কোনো প্রশ্নই উঠল না।
(চলবে)




