মাহির চিত্রকর্ম: অসন্তোষের ভাষা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চিত্রকর আফরিদা তানজিম মাহি বাংলাদেশের শিল্পকলায় এমন এক প্রতিভা, প্রাতিষ্ঠানিক রীতি এবং অনুশীলনের প্রচলিত পদ্ধতি এড়িয়ে নিজস্ব জীবনদৃষ্টি আর আঙ্গিকস্বাতন্ত্র্যের সাধনায় দীপ্যমান। তার চিত্রকর্মের সংখ্যা তিনশর বেশি; কিন্তু জনসমক্ষে এসেছে বায়ান্নটি। জীবদ্দশায় অনুষ্ঠিত প্রথম এবং একমাত্র প্রদর্শনী লস্ট ইন ট্রানজিশন [২০১৮]-তে সেগুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। সমকালীন যান্ত্রিক সমাজ, ব্যক্তিমানুষের অভ্যন্তরীণ হাহাকার, অবদমিত কামনা এবং মনস্তাত্ত্বিক সংগ্রামের গভীর তীব্র স্পন্দন তার চিত্রকর্মে নানাভাবে দ্যোতিত। শিল্পী হিসেবে তিনি অবস্থান নিয়েছেন প্রথাগত নন্দনরুচির বাইরে। ফলে বিষয়—আঙ্গিকে রোমান্টিক দৃষ্টিভঙ্গি শুধু নয়, শিল্পকলায় প্রতিষ্ঠিত আদর্শও তার চিত্রকর্মে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। মানুষের অস্তিত্বসংকট, নৈঃসঙ্গ্য, বিচ্ছিন্নতা এবং বিদ্যমান বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার যেসব প্রতিভাস মাহি সৃষ্টি করেছেন, তাতে স্বীকার্য হয়ে ওঠে যে, চিত্রকলার মধ্যদিয়ে তিনি অসন্তোষ, প্রতিবাদ কিংবা প্রসারিত অর্থে বিদ্রোহের ভাষা তৈরি করতে চেয়েছেন।
মাহির আঁকা সব আত্মপ্রতিকৃতিতে [Self-Portraits] মনোবাস্তবতার চাপ থেকে সৃষ্ট অস্থিরতা আর যন্ত্রণার প্রকাশ লক্ষ করা যায়। এসব চিত্রে অবয়ব স্থির নয়, বরং অনির্দিষ্ট; কোথাও অক্ষিকোটর অস্পষ্ট, চোখের নিচে অতিরিক্ত চোখ কিংবা ক্ষত ও রক্তের দাগ দিয়ে তিনি বিপন্নতা ও অস্তিত্বসংকটকে প্রকাশ করেছেন। শুধু ব্যক্তিসত্তাকে প্রামাণ্য করে তোলা নয়, বহির্বাস্তবতার প্রতিক্রিয়া দেখানোও অন্তর্জাগতিক চিত্রের দায়িত্ব— সে সম্পর্কে তিনি ছিলেন প্রশ্নোর্ধ্ব-রকমের সচেতন। বলেছিলেন, ‘আমার ছবিই আমার অস্তিত্বের একমাত্র প্রমাণ।’ আত্মপ্রতিকৃতিগুলো দেখলে বোঝা যায় অস্তিত্বের ধারণা মাহির কাছে দ্বিমাত্রিক: একদিকে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের দ্যোতক, অন্যদিকে বিদ্যমান সমাজকাঠামো সম্পর্কে শিল্পীর অবস্থান ঘোষণা করছে।
ফলে পুঁজিতন্ত্র কিংবা বাজারসংস্কৃতিও মাহির আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে। রিকশা পেইন্টিংয়ের লোকজ ধারায় আঁকা Meeting with the corporate animals & Corporate Love, Corporate Lust ছবিতে করপোরেট পোশাক পরা মানুষের শরীরে পশুর মাথা জুড়ে দিয়ে তিনি কার্যত পুঁজিগ্রস্ত সমাজের ভণ্ডামি, অমানবিকতা, উদ্ভটত্ব ও অর্থহীনতার দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। বুঝিয়েছেন, বাজারসংস্কৃতিতে আত্মসমর্পণের অর্থ হচ্ছে ব্যক্তিমানুষের বুদ্ধি ও বিবেচনাশক্তি বিসর্জন দেওয়া; মনুষ্যত্বহীনতা যখন মানবশরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে, তখন ওই পোশাক ছাড়া সভ্যতার কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না।
মাধ্যমগত বৈচিত্র্য ও নিরীক্ষামূলক অনুশীলন এই শিল্পীর স্বাতন্ত্র্যের আরেকটি প্রান্ত। তেলরঙ, অ্যাক্রিলিক, চারকোল ও প্যাস্টেলের পাশাপাশি নানা ধরনের কোলাজের ব্যবহার তার চিত্রকর্মে দেখা যায়। কোনো-কোনোটিতে রঙের দ্রবীভূত এবং অসংলগ্ন প্রয়োগের মধ্যদিয়ে তীব্র মানসিক চাপকে দৃশ্যমান করে তোলা হয়েছে। রঙ ও কম্পোজিশনে সৃষ্ট মর্বিডিটির আড়ালে বিপন্নতাসংকুল জীবন আর মৃত্যুর অনিবার্যতা সম্পর্কে শিল্পীর অভিব্যক্তি স্পন্দমান।
মাহির চিত্রকর্ম তীব্র আত্মানুসন্ধান, মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্রণা, করপোরেট সংস্কৃতির যান্ত্রিকতা এবং সামাজিক অসংগতির বিরুদ্ধে বিচিত্রমাত্রিক অসন্তোষের প্রতিভাস। Under The Influence সিরিজ [যেমন: All in all you’re just another gear in the machine / A Musical Evening সিরিজে তিনি পুঁজিবাদী সমাজ ও যান্ত্রিকতার শৃঙ্খলে বন্দি মানুষের জীবনকে তুলে ধরেছেন। মানুষ কীভাবে সমাজ ও আধুনিক ব্যবস্থার একটি পুতুল বা যন্ত্রের অংশে পরিণত হয়, তা প্রতীকী রূপকে দেখানো হয়েছে।
আফরিদা তানজিম মাহির প্রেরণা মূলত ফ্রিদা কাহলো [১৯০৭-’৫৪], এডওয়ার্ড মুঙ্ক [১৮৬৩-১৯৪৪] এবং ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ [১৮৫৩-’৯০]। তার একটি ডিজিটাল ফটো-ম্যানিপুলেশনধর্মী কোলাজচিত্রে ফ্রিদার বিখ্যাত The Two Fridas চিত্রকর্মে ম্যানিপুলেশনের মাধ্যমে নিজেকে ফ্রিদারই আরেক রূপ হিসেবে দেখিয়েছেন। মাহির নিঃসঙ্গতা, অস্থিরতা ও অন্তর্যন্ত্রণার রূপায়ণে এডওয়ার্ড মুঙ্কের বিখ্যাত চিত্রকর্ম The Scream Ges Anxiety-র স্পষ্ট প্রভাব দেখা যায়। বিশেষত ‘দ্য স্ক্রিম’-এর ভাবধারা মিশিয়ে তৈরি করা কোলাজে নারীর শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার এক বিশ্বজনীন মেলবন্ধন ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মুঙ্কের চিত্রকর্ম থেকে উদ্দীপনা নিয়ে
A 21st century woman trapped in her own mind & Self Destruction-এর কাজগুলোয় আধুনিক নারীর মানসিক বন্দিদশা, আত্মহত্যাচিন্তা এবং শ্বাসরুদ্ধকর বাস্তবতার চিত্রায়ণ ঘটেছে। মাহির Vincent van Gogh on my palette শিরোনামের ছবিতে ভ্যান গঘের বিখ্যাত চিত্রকর্ম Starry Night এবং রঙিন পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্ট প্যালেটের প্রত্যক্ষ প্রভাব লক্ষ করা যায়। এ ছাড়া তার Under the influence: High Art চিত্রেও ভ্যান গঘের রঙের ব্যবহার এবং এক্সপ্রেসনিস্টিক ক্যানভাসের ছাপ দৃশ্যমান। তা সত্ত্বেও মাহির স্বাতন্ত্র্য ও নিজস্বতা নিহিত তার চিত্রকর্মের গভীর মনস্তাত্ত্বিক রূপায়ণ, অপ্রথাগত মাধ্যম ব্যবহার এবং আধুনিক যান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে তীব্র শৈল্পিক অসন্তোষ প্রকাশের মধ্যে। এ ছাড়া তার আত্মপ্রতিকৃতিগুলোয় রঙের এলোমেলো ব্যবহার, কোলাজের নিরীক্ষা এবং প্রথা ভাঙার সাহসিকতা তার শিল্পকর্মকে অনন্যতায় উত্তীর্ণ করেছে।
মাহির শিল্পকর্ম প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাকরণ ভেঙে কোলাজ, কাট-আউট টেক্সট এবং ভাঙা প্রতিকৃতির মাধ্যমে দর্শককে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক অস্বস্তি ও বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। আগেই বলা হয়েছে, প্রচলিত ধারার শিল্পী তিনি নন। এমনকি, বিমূর্ত চিত্রকলা, যা শেষ পর্যন্ত বুর্জোয়া শ্রেণিস্বার্থের অনুকূলে যায়— তাও তিনি সচেতনভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। যদিও শিল্পকলার আত্মরক্ষা কিংবা সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে গত শতাব্দীর গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিকরা এর পক্ষ নিয়েছেন। তার প্রধান কারণ সে সময়ের রাজনৈতিক চাপ, দমনমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা, সেন্সরশিপের পীড়ন ইত্যাদি। এই আলাপের জায়গা অন্যত্র। স্পষ্ট যে, মাহির অর্ধমূর্ত শিল্পকর্মগুলো জানিয়ে দেয় তার সাধনার স্থান গজদন্তমিনার নয়, সেই সমাজও নয়— জীবনযাপনের জন্য যা আরামদায়ক; বরং ব্যক্তির বিকাশের প্রতিকূল। সেই সমাজ সম্পর্কে একজন সৎ শিল্পীর আপত্তি থাকা স্বাভাবিক। চিত্রকলায় মাহি তাই জানিয়ে গেছেন।




