কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সরব নজরুল চর্চা, গবেষণা ও স্মৃতি সংরক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন

কবি কাজী নজরুল ইসলাম
দ্রোহ ও মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলামকে হারানোর ৫০ বছর পূর্ণ হলো। আবার ঠিক ১০০ বছর আগে, ১৯২৬ সালে প্রথম ঢাকায় এসেছিলেন কবি। এমন দুটি ঐতিহাসিক যোগসূত্রের কারণে এ বছর নজরুলকে স্মরণ ও উদযাপনের তাৎপর্যও যেন বেড়েছে।
সরকার বছরব্যাপী নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করছে ‘নজরুলবর্ষ’। জাতীয় কবিকে ঘিরে আয়োজনেরও কমতি নেই। কিন্তু উৎসবের এই বিপুল আয়োজনের আড়ালে উঁকি দিচ্ছে অন্য এক বাস্তবতা—নজরুলচর্চার প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা সক্রিয়? গবেষণা, প্রকাশনা ও কবির স্মৃতি সংরক্ষণে তাদের ভূমিকা কতটা দৃশ্যমান?
রাজধানীর ধানমন্ডিতে অবস্থিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮৫ সালে। নজরুলের স্মৃতি সংরক্ষণ, জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণা, তার সাহিত্য ও সংগীত সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রচারের পাশাপাশি দেশ-বিদেশে কবির চেতনা ছড়িয়ে দেওয়াই প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম লক্ষ্য।
অথচ এই প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়কেন্দ্রে দীর্ঘদিন ধরেই পাওয়া যাচ্ছে না কবির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি গ্রন্থ। ‘নজরুল-রচনাবলী’, ‘সঞ্চিতা’, ‘অগ্নিবীণা’, ‘সাম্যবাদী’র মতো বইও নেই সেখানে।
শুধু বইয়ের সংকটই নয়, জনবল নিয়েও রয়েছে নানা জটিলতা। প্রতিষ্ঠানটিতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োজিত কর্মীরা গত ১১ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক লতিফুল ইসলাম শিবলী আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে যারা কাজ করছেন, তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত শিগগিরই জানা যাবে। প্রক্রিয়াটি এখন অর্থ মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। আশা করি তারা দ্রুতই বেতন পাবেন।’
বিক্রয়কেন্দ্রে নজরুলের রচনাবলী না থাকার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বললেন, ‘পূর্বে মুদ্রিত বইয়ের মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় নতুন মুদ্রণ করা হয়নি। তবে নজরুল-রচনাবলীসহ কিছু বই পুনর্মুদ্রণের প্রক্রিয়া চলছে এবং দ্রুতই সেগুলো প্রকাশিত হবে।
একই সঙ্গে তিনি জানান, নজরুলবর্ষ উপলক্ষে কবিকে নিয়ে পাঁচটি গবেষণাধর্মী বই প্রকাশ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে নজরুলের সাহিত্যের অনুবাদগ্রন্থসহ কয়েকটি বই প্রকাশিত হয়েছে।
ইনস্টিটিউটের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রকাশ করেছে ‘সন্ধ্যা’, ‘দোলন-চাঁপা’, ‘নজরুলের ইসলামি কবিতা’, ‘নজরুলের ইসলামি গান’, ‘নজরুলের পত্রাবলি’, ‘নজরুলের নাট্য সমগ্র’, ‘মক্তব সাহিত্য’, ‘নজরুলের কবিতা সমগ্র’, ‘নজরুলের ছোটগল্প সমগ্র’, ‘নজরুলের প্রবন্ধ সমগ্র’ ও ‘নজরুলের উপন্যাস সমগ্র’। এছাড়া প্রকাশিত হয়েছে ‘জাতীয় কবি ও শহীদ জিয়া’ বইটি। আদি গ্রামোফোন রেকর্ডে ধারণকৃত নজরুলসংগীতের স্বরলিপি নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ‘নজরুল-সংগীত স্বরলিপি ৫৭ ও ৫৮তম খণ্ড’। ‘কোয়েনটেসেন্স অব নজরুল’ বা ‘নজরুল নির্যাস’ নামে প্রকাশিত হয়েছে কবির সাহিত্যের ইংরেজি অনুবাদও।
নজরুলকে আন্তর্জাতিক পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে। ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও জাপানে ‘নজরুল কালচারাল সেন্টার’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে এ ধরনের কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে।
তবে পরিকল্পনার পাশাপাশি থমকে থাকা উদ্যোগও আছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ধানমন্ডি লেকে রবীন্দ্র সরোবরের আদলে ‘নজরুল সরোবর’ নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিল। এর নকশাও চূড়ান্ত হয়েছিল। পরে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নজরুল ইনস্টিটিউট সেখানে ‘বিদ্রোহী চত্বর’ বা ‘র্যাবেল স্কয়ার’ করার কথা জানিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি।
নজরুলের ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থের ‘বিদ্রোহী’ কবিতাকে ইউনেস্কোর ডকুমেন্টারি হেরিটেজে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে। এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে জানান কবির নাতনি খিলখিল কাজী। আগামীর সময়কে তিনি বলেছেন, ‘বিদ্রোহী কবিতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি থেমে আছে।’
নজরুলকে কেবল দিবসকেন্দ্রিক চর্চার মধ্যে আটকে না রেখে সারা বছর তার সাহিত্য ও চেতনা নিয়ে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন খিলখিল কাজী। তার ভাষায়, ‘নজরুলকে যেন কেবল দিবসকেন্দ্রিক চর্চা করা না হয়। নজরুলকে সারা বছর চর্চা করতে হবে এবং নজরুলের চেতনাকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে।’
নজরুলচর্চার সংকট অবশ্য শুধু ইনস্টিটিউটেই সীমাবদ্ধ নয়। ধানমন্ডির কবিভবন থেকে বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউস—কবির জীবনের সঙ্গে যুক্ত স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোর সংরক্ষণ কতটা যথাযথ হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসে প্রতিষ্ঠিত ‘নজরুল স্মৃতিকক্ষ’-এ সরেজমিনে দেখা যায়, নজরুলের কিছু বই, পোস্টার ও কয়েকটি আলোকচিত্র ছাড়া উল্লেখযোগ্য স্মারক খুব বেশি নেই। অথচ এই স্থান কবির জীবনের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ২৪ মে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে ভারত সরকারের সহযোগিতায় নজরুলকে সপরিবারে বাংলাদেশে আনা হয়। ধানমন্ডির কবিভবনে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় আবাসন দেওয়া হয়। ১৯৭৬ সালে তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব লাভ করেন।
অসুস্থ অবস্থায় জীবনের শেষ এক বছরের কিছু বেশি সময় কবি ছিলেন ঢাকার পিজি হাসপাতালে (বর্তমান বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়)। তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ১১৭ নম্বর কক্ষটি ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকক্ষ’ হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। সেখানে রয়েছে নজরুলের হাতে লেখা ‘চল্ চল্ চল্’ কবিতার পাণ্ডুলিপির প্রতিলিপি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা চিঠি, বিভিন্ন আলোকচিত্র, স্মৃতিচিহ্ন এবং কবির নিজের লেখা ও তাকে নিয়ে লেখা বই। দর্শনার্থীদের জন্য কক্ষটির ইতিহাস ও কবির চিকিৎসাজীবনের তথ্যও সংরক্ষিত রয়েছে। তবে অবহেলা, অযত্ন ও অপরিকল্পিত ব্যবহারে স্মৃতিকক্ষটির বর্তমান অবস্থা মলিন।
দেশে নজরুলচর্চার প্রাতিষ্ঠানিক পরিসর অবশ্য ছোট নয়। বাংলা একাডেমির পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নজরুল গবেষণা কেন্দ্র, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ’ এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত ‘নজরুল চেয়ার’কে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিস্তৃত গবেষণা কাঠামো। কিন্তু জনবল সংকটসহ নানা সীমাবদ্ধতার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই প্রত্যাশিত মাত্রায় সক্রিয় নয়। ফলে ‘নজরুলবর্ষ’ ঘিরে মূল প্রশ্নটি শুধু কতগুলো অনুষ্ঠান হলো, কতটি মঞ্চ সাজল কিংবা কতবার কবির গান গাওয়া হলো—তা নয়। প্রশ্ন হলো, অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর নজরুলচর্চার কতটুকু থেকে যাবে?






