ঝরাপাতার সংসার

মিকিতা আর ওকেলোর মধ্যে পরিচয় করিয়ে দিলাম আমরা। দুজনের হাল্কা কুশল বিনিময়ের পর সেন্ট অ্যান্ড্রু চার্চের দিকে এগোলাম সবাই। কিংবদন্তী বলে, যীশুর বারো শিষ্যের একজন সেন্ট অ্যান্ড্রু খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে এই এলাকার মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন। দনিপ্রো নদীর তীরের পাহাড়ে পৌঁছানোর পর সেইন্ট অ্যান্ড্রু নাকি সেখানে খানিক থেমে বলেছিলেন, ‘এই যে পাহাড়গুলো দেখছো সেগুলোর ওপর ঈশ্বরের মহিমা বর্ষিত হবে। এখানে গড়ে উঠবে মহান এক নগর। ঈশ্বরের নামে তৈরি হবে অনেক গির্জা ।
সেন্ট সোফিয়া স্কোয়ারের কোণাটা পার হতে যাচ্ছি এমন সময় ওকেলো হঠাৎ বোহদান খমেলনিৎস্কির বিশাল মূর্তিটার নিচে থেমে গেলেন। বোহদানের প্রসারিত হাতে ধরা বুলাভার ( কসাক হেতমানদের ক্ষমতার প্রতীক রাজদণ্ড) দিকে আঙুল দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার কী মনে হয়? বুলাভাটা কোন দিকে তাক করা?’
মিকিতা একটু চমকেই গেল। তা চমকাবারই কথা। ওকেলোর সঙ্গে মাত্রই পরিচয় হয়েছে তার। ছেলেটার হুটহাট উল্টোপাল্টা প্রশ্ন করার অভ্যাস সম্পর্কে তো আর ধারণা নেই তার। মৃদু হেসে সে ভদ্রভাবেই জবাব দিলো ্ওকেলোর প্রশ্নের।
মিকিতা: আমি শিউর না। দনিপ্রোর দিকে কি? নাকি স্কােয়ারের ওপাশের মন্ত্রণালয় ভবনের দিকে? মনে হচ্ছে, সেন্ট অ্যান্ড্রু গির্জার দিকেও হতে পারে।
ওকেলো: আসলে আমিও জানি না। তবে আমি সোভিয়েত আমলের একটা পুরোনো কৌতুক জানি। এক ট্যাক্সিচালকের মুখে শুনেছিলাম সেটা। কৌতুকটা এমন: বোহদান খমেলনিৎস্কি কিয়েভের মানুষকে সাবধান করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘কমিউনিস্ট শাসন মেনে না নিলে তোমাদের কিন্তু এনকেভিডিতে পাঠিয়ে দেব।’
মিকিতা: এনকেভিডি ভবনটা আবার কোথায় দেখলেন!
ওকেলো: রাস্তার ওপারে সোজা তাকাও—এখান থেকে ৫০ মিটার মতো দূরে হবে।
মিকিতা: ওটা তো ইউক্রেনের সিকিউরিটি সার্ভিসের গবেষণা একাডেমি। আপনি কি বলতে চাচ্ছেন সোভিয়েত আমলে এনকেভিডি ওই ভবনটিই ব্যবহার করত?
ওকেলো: হ্যাঁ। বিল্ডিংটা প্রথমে এনকেভিডির সদর দপ্তর ছিল। এনকেভিডি বিলুপ্ত হওয়ার পর সেখানে হয় এমজিবির অফিস। তার পরে আবার সেটাই কেজিবির কিয়েভ দপ্তরে রূপ নেয়।
মিকিতা: সোভিয়েত ইউনিয়ন নিয়ে বেশ ভালোই পড়াশোনা করেছেন দেখছি!
ওকেলো : তা করেছি। আর সুযোগ পেলেই নতুন কিছু জানার চেষ্টা করি। সোভিয়েত ইতিহাস আমাকে বেশ টানে। তার ভক্ত বলে নয়, বরং অন্য সমাজগুলোর সঙ্গে মিল-অমিল খুঁজে দেখার একটা দারুণ সুযোগ করে দেয় সেজন্যই।
কাতিয়া: বিষয়টা অদ্ভুত না? এত বিখ্যাত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মাঝখানে এমন একটা স্থাপনা।
ওকেলো: এটাই তো আসল বিষয়। ভেবে দেখো—এনকেভিডির সদর দপ্তর এমন একটি জায়গায় বসানো হয়েছিল যেখান থেকে কিয়েভের সবচেয়ে বিখ্যাত তিন ধর্মীয় স্থাপনা—সেন্ট সোফিয়া ক্যাথেড্রাল, সেন্ট অ্যান্ড্রু’স গির্জা এবং সেন্ট মাইকেল’স মনাস্টারি —প্রায় সমান দূরত্বে!
আমি: আপনার কি মনে হয়, ওরা গির্জাগুলোর ওপর নজরদারি করতে চেয়েছিল? কমিউনিস্টরা তো ধর্মকর্ম করা লোকদের সব সময়ই সন্দেহের চোখে দেখেছে।
ওকেলো: এটা আসলে তার চেয়েও বেশি কিছু। গির্জা তো ক্ষমতার প্রতীক ছিল। সোভিয়েতরা সবাইকে স্পষ্ট একটা বার্তা দিতে চেয়েছিল—ক্ষমতা আর ঐশী উৎস থেকে আসে না। তা আসে কঠিন পাথুরে ভবনগুলোতে বসা লোকের কাছ থেকে।
আমি: এই কারণেই কি কিয়েভের সব সোভিয়েত আমলের সরকারি ভবনের চেহারা এরকম বিশাল, সমীহ জাগানো?
কাতিয়া: শুধু কিয়েভে না কিন্তু। ইউক্রেনের সবচেয়ে প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতেও সোভিয়েত আমলের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনেক ভবনই দেখবে গির্জার চেয়ে বড় আর বেশি জাঁকালো।
মিকিতা: জানেন, একটা গল্প প্রচলিত আছে—সোভিয়েতরা যখন কিয়েভে মাদারল্যান্ড স্মৃতিস্তম্ভ বানায় তখন নাকি নকশার একটা শর্ত ছিল, সেটা যেন কিয়েভ পেচেরস্ক লাভরার ঘণ্টাঘরের চেয়ে উঁচু হয়।
ওকেলো: সোভিয়েতদের মতো কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা আর গির্জা দুটোরই ক্ষমতাই চরিত্রগতভাবে কেন্দ্রীভূত। একটা অন্যটার অস্তিত্বের জন্য হুমকি। তোমরা যদি শুধু ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতাটা খেয়াল করো, তাহলেই দেখবে সেই দ্বন্দ্ব কীভাবে প্রকাশ পেয়েছিল।
১৯৩৪ সালে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র ইউক্রেনের রাজধানী খারকিভ থেকে কিয়েভে সরিয়ে আনা হয়। সেবছরই এনকেভিডি ঠিক এখানেই তাদের সদর দপ্তর বসায়। আর ১৯৩৫ সালে তারা সেন্ট মাইকেল‘স মনাস্টেরি গুঁড়িয়ে দেয়। সরকারি ব্যাখ্যা ছিল, নগর পরিকল্পনার কারণে এটা করা দরকার ছিল। মনাস্টেরিটা পুনর্নির্মাণ করা হয় ১৯৯০ এর দশকে।
আমি: কিন্তু গির্জার হাতে তো বেশ কয়েক শতাব্দী ধরেই আর কোন প্রকৃত ক্ষমতা ছিল না—বিশেষ করে গির্জা ও রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব আলাদা করার পর থেকে।
ওকেলো: এ আলাপ অল্প কথায় সারা যাবে না। তবে তার আগে কোথাও বসে একটু বিয়ার খেয়ে নেওয়া যাক, চলো।
আমরা সেন্ট অ্যান্ড্রু’স গির্জার দিকে হাঁটা চালিয়ে গেলাম। একটু পর ধরলাম আন্দ্রিয়িভস্কি ডিসেন্টের পথ। ওকেলো দাবি করলেন, উনি এখানে এমন একটা রেস্তোরাঁ চেনেন যেখানে ‘বিশ্বের সেরা’ পর্ক রিব পাওয়া যায়। পথে আমরা বুলগাকভের পুরনো বাসভবনের সামনে কিছুক্ষণ থামলাম। তারপর গেলাম পাহাড়ের ঢালের নিচের সেই ‘বিশ্বসেরা’ রেস্তোরাঁয়। সবার জন্য গ্রিল্ড পর্ক রিব আর বিয়ার অর্ডার করা হলো। ওকেলো নিজের জন্য এক টুকরো পালিয়ানিত্সিয়াও নিলেন।
খেতে খেতে আলোচনা আবার ক্ষমতার প্রসঙ্গে ফিরে গেল। ওকেলো আমাদের তার একটা পিকিনিজ কুকুরের গল্প শোনালেন। ছোট্ট একটা কুকুর, কিন্তু বাড়িতে চলত একেবারে রাজার মতো। একদিন ওকেলোর স্ত্রী সপ্তাহ পাঁচেক বয়সী একটা জার্মান পয়েন্টারের বাচ্চা বাড়িতে নিয়ে এলেন। পিকিনিজটা সঙ্গে সঙ্গেই কর্তৃত্ব নিয়ে নিল আর বাচ্চা পয়েন্টারটার ওপর মাতব্বরি ফলাতে শুরু করল।
এক বছরের মধ্যেই পয়েন্টারটা আকারে পিকিনিজের প্রায় তিন গুণ বড় হয়ে গেল। কিন্তু তাদের মধ্যে কে রাজা, সেটা আর বদলাল না। বাড়িজুড়েই পিকিনিজের রাজত্ব, তার চেয়ে ঢের বেশি পেল্লায় আকারের কুকুরটার ওপরও।
“দেখো,” ওকেলো বললেন, “ক্ষমতা তোমার আসলে কতটা আছে, সেটা দিয়ে ঠিক হয় না—অন্যরা তোমার কতটা ক্ষমতা আছে বলে মেনে নেয়, সেটাই আসল।”
আমি: আমরা তো দেখি না গির্জা কাউকে জোর করে কিছু করাচ্ছে? করে কি?
ওকেলো: কোনো বাস্তব বিপদের ভয়ে তুমি কারও কথা মেনে চললে—ধরো, এনকেভিডির ভয়ে—আর কোনো ধারণা বা বিশ্বাসের কারণে কারও কর্তৃত্ব মেনে চললে, এই দুয়ের মধ্যে আসলে পার্থক্যটা কোথায়? আমার জার্মান পয়েন্টারটার কথাই ভাবো। পিকিনিজটার কাছ থেকে তার সত্যিকারের কোনো বিপদের আশঙ্কা ছিল না, তারপরও সে তার কর্তৃত্ব মেনে চলত।
মিকিতা: আমরা কেন এত সহজেই অন্যদের কর্তৃত্ব মেনে নেই বলতে পারেন? মানুষ প্রজাতি হিসেবে দুর্বল বলেই কি তা হয়?
ওকেলো: নিশ্চয়ই। আমরা খুব দুর্বল একটি প্রজাতি। বহু প্রাণীর তুলনায়ই মানুষ অনেক দুর্বল। সিংহের শক্তিশালী চোয়াল ও থাবা আছে। হরিণ ঘণ্টায় ৯০ কিলোমিটার বেগে দৌড়াতে পারে। কুকুরের ঘ্রাণশক্তি আমাদের চেয়ে ১০ হাজার গুণ ভালো। ঈগল পাখি তিন কিলোমিটার উঁচুতে উড়ন্ত অবস্থায় শিকার দেখতে পায়। খরগোশ প্রচণ্ড গতিতে লাফাতে আর দিক পরিবর্তন করতে পারে। এমনকী সামান্য শজারুও প্রয়োজন হলে নিজেকে মারাত্মক কাঁটায় মোড়া বর্মের মতো করে ফেলতে পারে।
আমাদের মানুষদের সত্যিকার অর্থে কোনো প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা নেই। তাই আমরা সামাজিক সহযোগিতার মাধ্যমে টিকে থাকি। আর যেহেতু প্রতিরক্ষার জন্য আমরা অন্যদের ওপর নির্ভরশীল, তাই নিরাপত্তার বিনিময়ে স্বাধীনতা ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা আমাদের জন্য স্বাভাবিক।
আমি: কিন্তু আমাদের বুদ্ধি আছে। যদি দেখি যে কেউ আমাদের ওপর অন্যায় করছে, তাহলে আমরা তার কাছ থেকে সরে যাব, তাই না? সোভিয়েত ইউনিয়নেও তো এমনটাই ঘটেছিল। বাধ্য করা হতো বলে মানুষ তাদের নির্দেশনা মানতো। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ তা মন থেকে মেনে নেয়নি।
ওকেলো: সেটা তখনই সম্ভব,যদি তুমি আদৌ বুঝতে পারো যে কেউ তোমার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারছে। আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে অসাধারণ মানুষটির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল কাম্পালার মিশনারি বোর্ডিং স্কুলে। তিনি ফাদার ওয়ারেন হেস্টিংস। তাকে দেখাতো ধর্মীয় ছবির সাধুদের মতো। ফর্সা ত্বক, নীল চোখ, মুখ বলিরেখাহীন। সব সময় নীল পাড় দেওয়া ঝকঝকে সাদা ক্যাসক পরতেন তিনি।
কিন্তু ফাদার ওয়ারেন হেস্টিংসের শুধু চেহারাটাই এমন ছিল না—তিনি নিজেকে উপস্থাপনও করতেন অসাধারণভাবে। শান্ত, সহৃদয় ও মৃদুভাষী মানুষ ছিলেন। ভালোবাসা ও ক্ষমার কথা তিনি শুধু মুখে বলতেন না—নিজের জীবনেও তা পালন করতেন। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে স্বচ্ছন্দে মেলামেশা করার জন্য তিনি লুগান্ডা ভাষা পর্যন্ত শিখেছিলেন। সমাজ যেসব দরিদ্র, রুগ্ন ও প্রত্যাখ্যাত মানুষদের উপেক্ষা করত, তিনি তাদের পাশে দাঁড়াতেন। কোনো কুষ্ঠরোগীকে যখন সবাই ত্যাগ করত, তখনও তিনি ওষুধ আর সহমর্মিতা নিয়ে হাজির হতেন।
এবার নিজেকে একজন গড়পড়তা উগান্ডাবাসীর জায়গায় কল্পনা করো। তুমি কি কখনো প্রশ্ন করতে যে, এই এত দয়ালু, এত ভালো মানুষটি একই সঙ্গে একটি ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার অংশ কি না? সম্ভবত না। তুমি শুধু একজন সাধুকেই দেখতে তখন।
মিকিতা: তার মানে আমাদের মাথাটাই কি সেভাবে তৈরি? মানে, না ভেবেই অন্যের কথা মেনে চলার অভ্যাসটা কি আমাদের ভেতরেই গেঁথে আছে?
ওকেলো: শোনো, আমাদের সবকিছুই চলে তথ্যের ওপর। কিছু তথ্য জন্ম থেকেই আমাদের ভেতরে থাকে, যেমন ডিএনএ-তে। এটা আমাদের জৈবিক দিক —অবিশ্বাস্যরকম দীর্ঘ এক কোডের মালা। আমাদের শরীর কীভাবে বেড়ে উঠবে, কীভাবে কাজ করবে, এমনকি চোখের মনির রং কী হবে—সবই নিয়ন্ত্রণ করে ডিএনএ।
আমাদের জৈবিক সাড়াগুলো কেমন হবে তা-ও নির্ভর করে চারপাশের পরিবেশ থেকে পাওয়া সংকেতের ওপর —যেমন আলো, খাবার বা তাপমাত্রা। এসব ছোট ছোট সংকেত আমাদের শরীরকে বলে দেয় কী করতে হবে: কখন ঘুম থেকে উঠতে হবে, কখন খিদে পেতে হবে, এমনকি কতটা চাপ বা উদ্বেগ অনুভব করতে হবে তা-ও।
তারপর আছে সামাজিক দিক। অন্য মানুষ কী বলেছে বা কী করেছে এবং তাতে আমাদের কেমন লেগেছে—আমাদের মস্তিষ্ক সেসব স্মৃতি সংরক্ষণ করে। মস্তিষ্কের এক অংশ তথ্য মনে রাখে; অন্য অংশ ভয় বা উত্তেজনার মতো আবেগগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। এই দুটো একসঙ্গে মিলে ঠিক করে সামাজিক পরিস্থিতিতে আমরা কীভাবে সাড়া দেব- কী বলব, কীভাবে আচরণ করব, এমনকি কী বিশ্বাস করব, সেটাও।
তাহলে তুমি কে? তুমি মূলত তথ্যেরই একটি সমষ্টি—তোমার জিনে লেখা তথ্য আর তোমার মনে সঞ্চিত তথ্য। কেউ যদি সেই তথ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তাহলে সে তোমাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
অর্থাৎ কিনা, তোমার ভেতরের তথ্যই তুমি।
(চলবে)







