নতুন গবেষণার সতর্কবার্তা
খাবারে ১০ শতাংশ আল্ট্রা প্রসেসড ফুড বাড়ালেই বাড়ছে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি

সংগৃহীত ছবি
আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় আল্ট্রাপ্রসেসড বা অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিমাণ মাত্র ১০ শতাংশ বৃদ্ধি করলে ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি বাড়ে অনেকটা। এক প্যাকেট ছোট পটেটো চিপস খাওয়া মূলত এই সামান্য ১০ শতাংশের সমান। এমনকি আপনি যদি প্রচুর শাকসবজি বা স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করেন নিয়মিত, তবুও এই ঝুঁকি কমছে না মোটেও।
বর্তমানে উন্নত দেশগুলোর মানুষ তাদের মোট ক্যালরির অর্ধেকের বেশি অংশ পায় এই অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার থেকে। আমেরিকার শিশুদের খাদ্যতালিকায় এই ধরনের খাবারের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬২ শতাংশে। অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক বারবারা কার্ডোসো এই গবেষণা থেকে জানান যে, প্যাকেটজাত খাবার নিয়মিত খাওয়া মধ্যবয়সী ও বৃদ্ধদের মনোযোগ কমিয়ে দেয় আশঙ্কাজনকভাবে।
এই গবেষণায় গবেষকরা খুঁজে পেয়েছেন খাবার প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে ডিমেনশিয়ার এক গভীর সম্পর্ক। আপনি যদি মাছ-সবজি সমৃদ্ধ ‘মেডিটেরেনিয়ান ডায়েট’ পালন করেন নিষ্ঠার সঙ্গে, তবুও প্রসেসড খাবার খাওয়ার কুফল দূর হচ্ছে না শরীর থেকে। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের বিশেষজ্ঞরাও এই গবেষণাকে দেখছেন অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে।
তবে আশার আলো দেখা যাচ্ছে কিমবার্লি নামের একজন গবেষকের দেওয়া তথ্যে। তিনি দাবি করেন যে, ৫-৬ বছর ধরে প্যাকেটজাত খাবারের বদলে প্রাকৃতিক খাবার খেলে মানসিক শক্তি বৃদ্ধি পায় প্রায় ১২ শতাংশ। এমনকি পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সেও অস্বাস্থ্যকর খাবার বাদ দিলে আলঝেইমারস বা ভুলে যাওয়ার রোগের ঝুঁকি কমে যায় উল্লেখযোগ্য হারে।
আসল খাবার বলতে আমরা বুঝি আস্ত দানা শস্য, ফলমূল, ডাল, বাদাম আর খাঁটি অলিভ অয়েল। ড্যাশ বা মাইন্ড ডায়েট মূলত গুরুত্ব দেয় প্রাকৃতিক উপাদানের ওপর এবং চিনি ও লাল মাংসের ব্যবহার কমিয়ে দেয় অনেকটা। এই ধরনের খাবার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে রক্তচাপ আর কোলেস্টেরল, যা শেষ পর্যন্ত সচল রাখে আমাদের মস্তিষ্ককে।
অন্যদিকে আল্ট্রাপ্রসেসড খাবারে প্রাকৃতিক গুণের নামগন্ধও থাকে না প্রায়। বিভিন্ন রাসায়নিক অণু আর কৃত্রিম রঙ মেশানো হয় ফ্যাক্টরির এই খাবারগুলোতে। এসব ‘আধাহজম’ হওয়া খাবারে প্রচুর লবণ, চিনি আর চর্বি থাকলেও শরীরের জন্য দরকারি পুষ্টি থাকে না একটুও।
১০ হাজার মানুষের ওপর চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, যারা অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার খায় বেশি, তাদের মানসিক অবনতির গতি অন্যদের চেয়ে থাকে ২৫ শতাংশ দ্রুত। ২০২৪ সালের একটি বড় পর্যালোচনায় ১০ শতাংশ অতিরিক্ত প্রসেসড খাবার খাওয়াকে চিহ্নিত করা হয়েছে ডজনখানেক রোগের মূল কারণ হিসেবে। এমনকি মানসিক রোগ বা হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়ে প্রায় ৫০ শতাংশ।
গবেষকরা আরও লক্ষ করেছেন যে, প্রসেসড খাবার খাওয়া বাড়ায় স্থূলতার ঝুঁকি ৫৫ শতাংশ। এই খাবারগুলো ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় ৪১ শতাংশ এবং বিষণ্ণতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় ২০ শতাংশ। ডায়াবেটিসের মতো মরণব্যাধি হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয় অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের হাত ধরে।
নতুন এই গবেষণায় অংশ নিয়েছিলেন ৪০ থেকে ৭০ বছর বয়সী প্রায় ২ হাজার মানুষ। পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, প্রতি ১০ শতাংশ আল্ট্রাপ্রসেসড খাবার গ্রহণ করার ফলে মানুষের মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে মাপজোখ করা যায় এমনভাবে। মনোযোগ যেহেতু শেখার মূল ভিত্তি, তাই এর অভাবে মস্তিষ্কের অন্যান্য কাজও পড়ে যাচ্ছে ঝুঁকির মুখে।
যদিও এই গবেষণায় সরাসরি স্মৃতির ওপর প্রভাব পাওয়া যায়নি, তবে এটি ২০ বছর পরের ডিমেনশিয়া ঝুঁকির এক আগাম পূর্বাভাস দেয়। ০ থেকে ৭ পয়েন্টের স্কেলে ডিমেনশিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে প্রায় ০.২৪ পয়েন্ট করে। সকালে কৃত্রিম প্যানকেক, দুপুরে চিপস আর রাতে পিৎজা খেলে এই ১০ শতাংশের সীমা পার হয়ে যায় নিমিষেই।
তবে জটিলতা শুরু হওয়ার আগেই যদি আপনি ছাড়তে পারেন এই ধরনের খাবার, তবে ঝুঁকি কমে যাবে অনেকটাই। গবেষক কার্ডোসো মনে করেন যে, মধ্যবয়স হলো এই ধরনের বাজে অভ্যাস পরিবর্তনের সব থেকে সঠিক সময়। প্যাকেটজাত খাবার যেহেতু শরীরের হরমোন আর পেটের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ক্ষতি করে, তাই সুস্থ থাকতে প্রাকৃতিক খাবারের কোনো বিকল্প নেই।



