ক্লান্ত কিশোরী: সাধারণ অলসতা নাকি ঋতুচক্রের প্রভাব?

ছবি-এআই
নায়রা বয়স ১৪। একসময় স্কুলে দুর্দান্ত খেলোয়াড় ছিল, পড়াশোনায় যেমন ভালো ছিল তেমনি গল্প, গানে, আড্ডায় মাতিয়ে রাখতো সবাইকে। কিন্তু যখন থেকেই নারীত্বের অভিষেক ঘুর্ণিতে পড়ল তখন থেকেই যেন তার সব কাজে অনীহা।
বিশেষ করে মাসের ঋতুচক্রর দিনগুলোয় সে যেন হয়ে যায় ভিন্নরূপের মানুষ। রাগ, জেদ, কথায় কথায় কান্না। স্কুল থেকে ফেরার পর অস্বাভাবিকভাবে অলসতা, ক্লাসে মনোযোগের অভাব, অথবা যা পড়ছে তা রাখতে পারছে না মনে। সবকিছুতেই যেন ক্লান্তি। অধিকাংশ অভিভাবকরা কিশোরীদের এ অবস্থার জন্য পড়াশোনার চাপ বেড়ে যাওয়া, ঘুম কম বা জীবনের ব্যস্ত রুটিনকে দায়ী করেন। অথবা বলেন ‘মুড সুইং’। কিন্তু স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞরা এর জন্য দায়ী করছেন কিশোরীদের আয়রনের ঘাটতিকে।
কারণ ঋতুস্রাব বা মাসিকের সময় শরীর থেকে স্বাভাবিকভাবেই যথেষ্ট পরিমাণ আয়রন বেরিয়ে যায়। আর যদি হেভি ফ্লো হয় তবে তো কথাই নেই। কিন্তু কিশোরী মেয়েদের ক্ষেত্রে রক্তক্ষরণ এমন একটি সময়ে হয় যখন তাদের শরীরই নিজস্ব বৃদ্ধির জন্য স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি আয়রন ব্যবহার করে। তাই চিকিৎসকরা অভিভাবকদের এ সময় কিশোরীদের ভারী পিরিয়ড বা মাসিকে অতিরিক্ত রক্তপাত হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে খেয়াল রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন।
একটি স্বাভাবিক পিরিয়ডের ৪-৫ দিনে শরীর থেকে মাত্র ৩০-৪০ মিলিলিটার রক্তক্ষরণ হয়। কিন্তু হেভি ফ্লো বা ভারী মাসিকের ক্ষেত্রে এই রক্তক্ষরণের পরিমাণ ৮০ মিলিলিটার বা তার চেয়েও বেশি হয়
তবে পদক্ষেপ নেওয়ার আগে, জেনে নেওয়া যাক হেভি পিরিয়ড বা মাসিকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ আসলে কী? পিরিয়ডে হেভি ফ্লো বা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় মেনোরেজিয়া বলে। সাধারণত একটি স্বাভাবিক পিরিয়ডের ৪-৫ দিনে শরীর থেকে মাত্র ৩০-৪০ মিলিলিটার রক্তক্ষরণ হয়। কিন্তু হেভি ফ্লো বা ভারী মাসিকের ক্ষেত্রে এ রক্তক্ষরণের পরিমাণ ৮০ মিলিলিটার বা তার চেয়েও বেশি হয়ে থাকে।
এখন কীভাবে বুঝবেন আপনার রাজকন্যার ‘হেভি ফ্লো’ হচ্ছে কি না? যদি দেখেন, টানা সাত দিনের বেশি রক্তক্ষরণ বা পিরিয়ড স্থায়ী হচ্ছে। তবে প্রতি এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে এক বা একাধিক প্যাড বা ট্যাম্পন পরিবর্তন করতে হবে। অন্যথায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে কাপড় বা বিছানায় দাগ লেগে যাবে। প্রস্তুতি নিয়ে ঘুমালেও মাঝরাতে প্যাড বদলানোর জন্য ঘুম থেকে জেগে উঠতে হয় জমাট রক্ত বের হলে। তীব্র পেটে ব্যথা, শরীর দুর্বল লাগা, মাথা ঘোরা বা শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা দেখা দিলে।
অধিকাংশ কিশোরী মেয়েদের ক্ষেত্রে হেভি ফ্লো কেন হয়? এর দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, বয়ঃসন্ধিকালের প্রথম কয়েক বছর হরমোনের পরিপক্কতা পুরোপুরি থাকে না। ফলে ডিম্বস্ফোটন বা ওভুলেশন ছাড়াই পিরিয়ড হয়, যা জরায়ুর ভেতরের আস্তরণে পুরুত্ব তৈরি করে। পরে যা ভারী রক্তক্ষরণ ঘটায়। দ্বিতীয়ত, কারও কারও ক্ষেত্রে দেখা যায়, জন্মগত রক্তক্ষরণজনিত রোগ বা প্লালেটিলেটের সমস্যার কারণে হেভি ফ্লো হয়ে থাকে।
এ সমস্যাটিই তখন কিশোরীদের জীবনে বিপজ্জনক অবস্থা তৈরি করে। কারণ টানা কয়েক মাস এ অবস্থা চলতে থাকলে তাদের শরীর সবসময় শরীর ক্লান্ত থাকে, মাথা ব্যথা এবং পড়াশোনা বা যেকোনো কাজে অমনোযোগীতা নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এ বিষয়ে ভারতের পুনের ‘সুরিয়া মাদার অ্যান্ড চাইল্ড সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল’ এর স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিশেষজ্ঞ ডক্টর দীপশিখা দ্বিবেদী বলেছেন, ‘ভারী মাসিকের কারণে শরীরের আয়রন কমে গেলে তা সাধারণত ক্লান্তি ও মাথাব্যথা তৈরি করে। তবে এ সময় অ্যানিমিয়া বা আয়রনের ঘাটতি রোগ পুরোপুরি প্রকাশ পাওয়ার আগেই প্রাথমিক সংকেত হিসেবে মনোযোগহীনতা, পড়াশোনায় ব্যঘাত ও স্মৃতিশক্তিতে প্রভাবিত করে।’
এ অবস্থায় কিশোরীদের শরীরকে অবহেলা না করে অভিভাবকদের সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের শরণাপন্ন হবার জোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। কৈশোর বা বয়ঃসন্ধিকালের পিরিয়ডের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণকে অবহেলা না করে কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করতে পরিবার ও বাবা-মায়েদের সচেতন হওয়া জরুরি। এ সময় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে তাদের একটি সুস্থ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ দেওয়া বাবা মায়ের পক্ষ থেকে একটি অন্যতম সেরা উপহার।
টাইমস অব ইন্ডিয়া অবলম্বনে






