স্বাস্থ্য পরামর্শে এআই, নির্ভরযোগ্য সহকারী নাকি বিপজ্জনক বিকল্প?

সংগৃহীত ছবি
ম্যানচেস্টারের বাসিন্দা অ্যাবি স্বাস্থ্য সমস্যায় এক বছর ধরে ব্যবহার করছেন চ্যাটবট। যেকোনো ছোট-বড় স্বাস্থ্য সমস্যায় সহজেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। বিশেষত চ্যাটজিপিটি, যাকে ধরে নেওয়া যায় অন্যতম উন্নতমানের একটি এআই টুল হিসেবে।
অ্যাবির মতো আরও অনেকেই বর্তমানে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত উপদেশের জন্য ব্যবহার করছেন এআই। নিচ্ছেন হেলথ টিপস। কেন এমন চর্চা দেখা যাচ্ছে, এই প্রশ্নের উত্তর খুবই সরল। অধিকাংশের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে যেকোনো স্বাস্থ্য সংক্রান্ত উপদেশের জন্য ব্যক্তিগত একজন চিকিৎসক রাখা খুবই অর্থসাপেক্ষ ব্যাপার।
এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সব সময়ই আমাদের হাতে থাকে। আমরা যখন ইচ্ছা এটি ব্যবহার করতে পারি। আমরা প্রশ্ন করার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে সক্ষম এআই। এ ছাড়া এআই স্বাচ্ছন্দ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে কিছু ডাক্তারি পরীক্ষায়।
তাহলে আমাদের কি চ্যাটজিপিটি, জেমিনি এবং গ্রকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো শতভাগ বিশ্বাস করা উচিত? এগুলো ব্যবহার করা, চ্যাটবটে জানার জন্য যেকোনো প্রশ্ন করা কি পুরনো দিনের ইন্টারনেট সার্চের চেয়ে আলাদা কিছু? নাকি, যেমনটা কিছু বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা করছেন, মারাত্মক কিছু ভুল করছে চ্যাটবটগুলো? আর সেই ভুলগুলো মানুষের জীবনকে ফেলছে ঝুঁকির মুখে?
অ্যাবির মতো আরও অনেকেই স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত উদ্বেগে ভোগেন। অ্যাবি মনে করেন, ইন্টারনেট সার্চের চেয়ে একটি চ্যাটবটের পরামর্শ অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট হয়। কারণ ইন্টারনেট সার্চ প্রায়ই তাকে সরাসরি সবচেয়ে ভয়ংকর সম্ভাবনাগুলোর দিকে নিয়ে যায়। অন্যদিকে চ্যাটবটের সঙ্গে কথা বলা অনেকটা আপনার ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলার মতো। চ্যাটবট যেন এক ধরনের সম্মিলিত সমস্যা সমাধানের সুযোগ করে দেয়।
স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শের জন্য এআই চ্যাটবট ব্যবহারের ভালো এবং খারাপ উভয় দিকই দেখেছেন অ্যাবি। একদিকে, যখন তিনি ভেবেছিলেন তার মূত্রনালির সংক্রমণ হয়েছে, তখন চ্যাটজিপিটি তার লক্ষণগুলো পড়ে তাকে পরামর্শ দেয় ফার্মাসিস্টের কাছে যাওয়ার। ফার্মাসিস্টের কাছে যাওয়ার পর অ্যাবিকে একটি অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়।
অন্যদিকে জানুয়ারিতে হাইকিং করতে গিয়ে অ্যাবি পা পিছলে সজোরে আছাড় খান। একটি পাথরে তার পিঠ সজোরে ধাক্কা খায় এবং তার পিঠজুড়ে ভীষণ চাপ চাপ ব্যথা সৃষ্টি হয়, যা পরে ছড়িয়ে যায় পেটের দিকে। তাই তিনি স্মার্টফোনে এআইয়ের কাছে পরামর্শ চান।
‘চ্যাটজিপিটি প্রায় নিশ্চিত করে বলেছিল, হয়তো ফুটো হয়ে গেছে আমার একটি অঙ্গ। দ্রুত ইমার্জেন্সি বিভাগে যাওয়ার পরামর্শ চ্যাটজিপিটির,’ বলছিলেন অ্যাবি।
জরুরি বিভাগে গিয়ে তিন ঘণ্টা বসে থাকার পর ব্যথা কমতে শুরু করে। অ্যাবি তখন বুঝতে পারেন তিনি ততটা গুরুতর অসুস্থ নন যতটা চ্যাটজিপিটি ধারণা করেছিল। তাই বাড়ি ফিরে যান তিনি। সে ক্ষেত্রে এআই স্পষ্টতই ভুল তথ্য দেয় অ্যাবিকে।
অ্যাবির মতো আর ঠিক কতজন মানুষ স্বাস্থ্য পরামর্শের জন্য চ্যাটবটের ওপর নির্ভরশীল—এই পরিসংখ্যান জানা কঠিন। তবে এই প্রযুক্তির জনপ্রিয়তা বেড়েছে ব্যাপকভাবে। আপনি সক্রিয়ভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছ থেকে পরামর্শ না চাইলেও, ইন্টারনেট অনুসন্ধানের শীর্ষেই এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার সামনে চলে আসবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দেওয়া পরামর্শের মান নিয়ে উদ্বিগ্ন ইংল্যান্ডের শীর্ষ চিকিৎসকরা।
ইংল্যান্ডের চিফ মেডিকেল অফিসার অধ্যাপক স্যার ক্রিস হুইটি এই বছরের শুরুতে মেডিকেল জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনকে বলেছিলেন, আমরা একটি বিশেষ জটিল পরিস্থিতির মধ্যে আছি। কারণ এগুলো নিজেদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে ব্যবহার করছে মানুষ। কিন্তু চ্যাটবটের পরামর্শ যথেষ্ট ভালো নয়। প্রায়ই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল উত্তর দেয় তারা।
গবেষকরা জনকল্যাণের স্বার্থে বিশ্লেষণ করে দেখছেন চ্যাটবটের শক্তি ও দুর্বলতাগুলো।
কিছু বাস্তবসম্মত পরিস্থিতি তৈরি করিয়েছিলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের 'রিজনিং উইথ মেশিনস ল্যাবরেটরির' একদল চিকিৎসক। যেখানে যেমন ছিল বাড়িতে উপশম করা যায় এমন সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা; তেমনি ছিল ডাক্তারের কাছে নিয়মিত যাওয়া, জরুরি বিভাগে যাওয়া বা অ্যাম্বুলেন্স ডাকার মতো পরিস্থিতিও।
অধ্যাপক অ্যাডাম মাহদির মতে, যখন চ্যাটবটগুলো তৈরি করা পরিস্থিতির বর্ণনা দেওয়া হয়েছিল, তখন তাদের উত্তর ছিল ৯৫ শতাংশ সঠিক। অসাধারণভাবে নিখুঁত ছিল সেগুলো।
মাহদি মনে করেন, মানুষ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মধ্যকার ভুল মিথস্ক্রিয়াই সবকিছুকে এলোমেলো করে দিতে পারে। তখন নির্ভুলতার হার নেমে আসতে পারে প্রায় ৩৫ শতাংশে। অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রেই চ্যাটজিপিটি থেকে মানুষ ভুল রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসা পাচ্ছিল।
গবেষক মাহদি আরও জানান, মানুষ যখন কথা বলে, তখন তারা ধীরে ধীরে তথ্য জানায়। কম প্রয়োজনীয় কিছু বিষয় বাদ দিয়ে যায় মানুষ। অনেক সময় তাদের মনোযোগ চলে যায় অন্যদিকে। একটি পরিস্থিতিতে চ্যাটবটকে স্ট্রোকের কারণে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের লক্ষণ বর্ণনা করা হয়েছিল। এই রোগকে বলা হয় সাবঅ্যারাকনয়েড হেমোরেজ। এটি একটি জীবন হুমকিতে পড়ার মতো জরুরি অবস্থা। এর জন্য প্রয়োজন হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসা। কিন্তু দেখা গেল, মানুষ যেভাবে চ্যাটজিপিটিকে সেই লক্ষণগুলো বর্ণনা করেছিল, তার মধ্যে কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য থাকার ফলে পরামর্শে ব্যাপক ভিন্নতা দেখা দেয়।
এই সপ্তাহে ক্যালিফোর্নিয়ার লান্ডকুইস্ট ইনস্টিটিউট ফর বায়োমেডিকেল ইনোভেশনের একটি পৃথক গবেষণায় দেখা গেছে, এআই চ্যাটবটগুলোও ভুল তথ্য ছড়াতে পারে। এআইগুলো কতটা শক্তিশালী, তা দেখার জন্য গবেষকরা ইচ্ছাকৃতভাবে একটি কঠিন পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন। যেখানে প্রশ্নগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যা ভুল তথ্য ছড়ানোর সুযোগ করে দেয়।
ক্যানসার, ভ্যাকসিন, স্টেম সেল, পুষ্টি এবং ক্রীড়া নৈপুণ্যের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে জেমিনি, ডিপসিক, মেটা এআই, চ্যাটজিপিটি এবং গ্রোক এআই পরীক্ষা করা হয়েছিল। দেখা গেল, অর্ধেকের বেশি উত্তর কোনো না কোনোভাবে সমস্যাযুক্ত। চ্যাটবটকে নির্দিষ্ট কিছু অপশন দিয়ে কোন অপশনটির চিকিৎসা পদ্ধতি সফলভাবে ক্যানসারের চিকিৎসা করতে পারে, এই প্রশ্ন করা হয়। চ্যাটবট ‘কোনোটিই নয়’ না বলে উত্তর দেয়—ন্যাচারোপ্যাথি।
চ্যাটবটটি বলে, ন্যাচারোপ্যাথিক মেডিসিন হলো এমন একটি চিকিৎসা পদ্ধতি, যা রোগের চিকিৎসার জন্য ভেষজ প্রতিকার, পুষ্টি এবং হোমিওপ্যাথির মতো প্রাকৃতিক থেরাপি ব্যবহার গুরুত্ব দেয়।
এই গ্রুপের প্রধান গবেষক ড. নিকোলাস টিলার বিস্তারিতভাবে জানান, এগুলোকে খুব আত্মবিশ্বাসী এবং কর্তৃত্বপূর্ণ উত্তর দেওয়ার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে, যা একটি বিশ্বাসযোগ্যতার অনুভূতি তৈরি করে। ফলে ব্যবহারকারী ধরে নেন যে, এটি যা বলছে সে সম্পর্কে নিশ্চয়ই জানে।
এসব গবেষণার একটি সমস্যা হলো, প্রযুক্তি দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। যার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, গবেষণা প্রকাশিত হওয়ার আগেই চ্যাটবটগুলোকে চালনা করা সফটওয়্যারটি আরও উন্নত হয়ে যায়। তবে ডা. টিলার জানান, এই প্রযুক্তিতে একটি মৌলিক সমস্যা রয়েছে। ভাষার প্যাটার্নের ওপর ভিত্তি করে টেক্সট অনুমান করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে এই প্রযুক্তি।
টিলার মনে করেন, স্বাস্থ্য পরামর্শের জন্য চ্যাটবট এড়িয়ে চলা উচিত। যদি না আপনার সেই দক্ষতা থাকে যা দিয়ে আপনি বুঝতে পারেন কখন এআই ভুল উত্তর দিচ্ছে, আর কখন সঠিক। আপনি যদি রাস্তায় কাউকে কোনো প্রশ্ন করেন এবং সে খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উত্তর দেয়, আপনি কি তাকে সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস করে নেবেন? প্রশ্ন করেন টিলার। বরং আপনি প্রথমে যাচাই করে দেখবেন।
অ্যাবি যে চ্যাটজিপিটি সফটওয়্যারটি ব্যবহার করতেন, তার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান 'ওপেন এআই' একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে, আমরা জানি মানুষ স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্যের জন্য চ্যাটজিপিটির ওপর নির্ভর করছে। আমরা প্রতিনিয়ত গুরুত্বসহকারে দেখছি এই সফটওয়্যারটিকে যথাসম্ভব নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদ করাকে। আমরা আমাদের মডেলগুলোকে উন্নত করার জন্য চিকিৎসকদের সঙ্গে কাজ করছি। আমাদের সফটওয়্যার এখন বাস্তব স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার লক্ষ্যে তুলনামূলক শক্তিশালী ফল দেখাচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নির্মাতা প্রতিষ্ঠান থেকে দাবি করা উন্নতিগুলো সত্ত্বেও চ্যাটজিপিটি শুধু ব্যবহার করা উচিত তথ্য ও শিক্ষার জন্য। পেশাদার চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প হিসেবে নয়।
তথ্যসূত্র : বিবিসি

